WB Elections 2026

দাবি

নারী নিরাপত্তার অভাব, স্কুলছুট ছাত্রছাত্রী, কলেজগুলিতে শূন্য আসন, নাবালিকা-বিবাহ এবং প্রসূতিমৃত্যুর লজ্জাজনক হার, অসংগঠিত ক্ষেত্রে মজুরিতে ঘাটতি, পরিযায়ী শ্রমিকের নিরাপত্তার অভাব— এমন নানা কঠিন সঙ্কটের মুখোমুখি হবে নবগঠিত সরকার।

শেষ আপডেট: ২২ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:০৯

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন (২০২৬) আগামী কাল শুরু। প্রতি বারের মতোই এ বারের ভোটপূর্ব-যাত্রা রাজ্যকে উত্তেজনার শিখরে তুলেছে, যদিও এক দিক দিয়ে এ বারটি বিশেষ রকম আলাদা। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনে ৯১ লক্ষ ভোটার নাম বাতিলের ধাক্কায় এই রাজ্য রীতিমতো বিপর্যস্ত। নাম-বাতিলপর্ব পুরোপুরি সমাপ্ত হয়নি, এখনও বহু ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বাকি। যাঁরা বাদ পড়লেন, তাঁদের জন্যে ভবিষ্যৎ সঙ্কটের স্বরূপটিও এখনও অস্পষ্ট। সুতরাং, এ বারের ভোটপর্ব মিটলে, যে পক্ষই জিতুক, মানুষের অসহায়তা ও অনিশ্চয়তার দ্রুত নিষ্পত্তি হবে, মানবিক ও আইনি পথে তাঁদের রাজনৈতিক-সামাজিক অবস্থান নির্ধারিত হবে— এই সম্পাদকীয় স্তম্ভের পক্ষ থেকে এমন দাবি রইল। নির্বাচনে জয়-পরাজয় আছেই, গণতন্ত্রে শাসক-বিরোধী উভয়ের স্থানই অত্যন্ত জরুরি, সে কথা মনে রেখে সাধারণ মানুষের অধিকার-সংক্রান্ত প্রশ্ন নিরসনে যেন কোনও রাজনৈতিক দল বাধা না হয়ে দাঁড়ায়— ঐকান্তিক আর্জি রইল। ভারতের মতো দরিদ্র দেশে বহু মানুষের নথিপত্রঠিকমতো থাকে না, কিন্তু তা তাঁদের দোষ নয়, বরং রাষ্ট্রেরই অক্ষমতা। সর্বোচ্চ আদালতও জানিয়েছে— এক বারের ভোট দিতে না-পারা মানেই ভোটার অধিকার চলে যাওয়া নয়। সুতরাং নতুন ভাবে সিদ্ধান্তগ্রহণ অতি আবশ্যক। ভোটপর্ব নির্বিঘ্নে, শান্তিতে মিটুক, রাজ্যে শান্তি ও শৃঙ্খলার আবহ ফিরে আসুক। পশ্চিমবঙ্গবাসী আধা-সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধানে দিনযাপনে অভ্যস্ত নন। সবচেয়ে বড় কথা, এ বার প্রাক্-ভোটপর্বে ধর্মীয় সংখ্যাগুরুর হুঙ্কার-হুমকি যে ভাবে পশ্চিমবঙ্গকে বিপন্ন করে তুলেছিল, তার অবসান ঘটা অত্যন্ত জরুরি। দেশভাগের পর আর কখনও ধর্মীয় মেরুকরণ এত তীব্র সঙ্কটময়তায় পৌঁছয়নি। রাজনৈতিক দলগুলির উস্কানিতেই এই বিষাক্ত আবহের সৃষ্টি, ফলে ভোট মিটলে তাদেরই দায়িত্ব নিয়ে এই বিষপরিবেশের নিরাময় করতে হবে। সহনশীল, গণতান্ত্রিক আবহ ফিরিয়ে দিতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থে।

নির্বাচনে জয়ী হয়ে যে দলই ক্ষমতাসীন হোক, তার দায়িত্ব হবে রাজ্যের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের পুনরুদ্ধার। বর্তমান সরকারের শাসনকালে যে সব ক্ষেত্রে অর্থব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে— যেমন, রাজ্যের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের অনুপাতে ঋণের পরিমাণ কমেছে, মূলধনি খাতে বিনিয়োগ আগের তুলনায় বেড়েছে— তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সঙ্গে যে সব ক্ষেত্রে রাজ্য পিছিয়ে আছে, নজর দিতে হবে সে দিকেও। মাথাপিছু আয়ের নিরিখে এ রাজ্য পশ্চাদ্‌বর্তী। তার থেকে রাজ্যকে উদ্ধার করতেশিল্পায়ন প্রয়োজন। এ জন্য সর্বদা অতি বৃহৎ পুঁজির আবাহনই হয়তো জরুরি নয়, তবু রাজ্যকে শিল্পবান্ধব করে তোলা দরকার। দুর্নীতির সর্বব্যাপী নেটওয়ার্ককে সমূলে উৎপাটন করা জরুরি। রাজ্যে কর্মসংস্থানের তীব্র অভাব মেটানো দরকার। অন্য দিকে, সরকারকে মনোযোগী হতে হবে বাহ্যিক ও সামাজিকপরিকাঠামো গড়তে, পরিবেশের পক্ষে সুস্থায়ী উন্নয়নের কথা মাথায় রেখে।

নারী নিরাপত্তার অভাব, স্কুলছুট ছাত্রছাত্রী, কলেজগুলিতে শূন্য আসন, নাবালিকা-বিবাহ এবং প্রসূতিমৃত্যুর লজ্জাজনক হার, অসংগঠিত ক্ষেত্রে মজুরিতে ঘাটতি, পরিযায়ী শ্রমিকের নিরাপত্তার অভাব— এমন নানা কঠিন সঙ্কটের মুখোমুখি হবে নবগঠিত সরকার। উত্তরণের সূচনা হওয়া চাই এই নম্র স্বীকৃতিতে যে, এই ব্যর্থতার দায়ের সিংহভাগ শাসকের তো বটেই, দায় রয়েছে কেন্দ্রেরও। ভোটের উত্তেজনা যতই গ্রাস করুক রাজ্যকে, ভোটের ফলে মানুষের মুক্তি নেই। নতুন সরকারের কাজ হবে নতুন ভাবে রাজনীতিকে উদ্দীপিত করা, যাতে রাজ্য প্রশাসন নির্বাচন-চক্রের দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে জনকল্যাণে নিয়োজিত হতে পারে, আইনের শাসন নিশ্চিত করতে পারে— পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থে।

আরও পড়ুন