Raidighi

বেহাল রাস্তা এবং আবাস যোজনা নিয়ে অভিযোগই কি ফলাফলের নির্ণায়ক

রায়দিঘি বিধানসভা কেন্দ্রে এ বার ত্রিমুখী লড়াই দেখছে রাজনৈতিক মহল। তৃণমূল, বিজেপির পাশাপাশি থাকছে সিপিএম। ২০১১ সাল থেকে কেন্দ্রটি শাসকদল তৃণমূলের দখলে রয়েছে। অর্থাৎ, প্রায় ১৫ বছর রায়দিঘি বিধানসভা কেন্দ্র শাসকদলের অধীনে।

শুভাশিস ঘটক
শেষ আপডেট: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৩৮

— প্রতীকী চিত্র।

দক্ষিণ ২৪ পরগনার রায়দিঘি কেন্দ্রের অন্তর্গত বিভিন্ন পঞ্চায়েত এলাকায় ঘোরাঘুরির সময়ে চোখ আটকে গেল ছোট্ট প্লাস্টিক ঘেরা একটি ঘরে। গ্রামের বেশির ভাগ ঘরের থেকে যা একেবারেই আলাদা। ভরদুপুরের কড়া রোদেও দড়ি দিয়ে প্লাস্টিক বাঁধার চেষ্টা করছিলেন এক বৃদ্ধ। কাছে গিয়ে নাম জানতে চাওয়ায় বললেন, ‘‘হাসিবুর গায়েন।’’ রায়দিঘি পঞ্চায়েতের তিন নম্বর চোদ্দো-সি গ্রামের ওই বাসিন্দা হাসিবুরের কথায়, ‘‘একমাত্র ছেলে মানসিক রোগী। দিনমজুরি করি। ঘরে স্ত্রী, ছেলের বৌ আর নাতি রয়েছে। গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দা কেন্দ্রীয় আবাস যোজনায় ঘর পেয়েছেন। ফলে তাঁদের বাড়ি অনেকটাই ভাল। পঞ্চায়েত-কর্তা ও সদস্যেরা কথা দিলেও আমি আবাস যোজনায় ঘর পাইনি।’’

শুধু তিনিই নন, রায়দিঘি বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত ১৭টি পঞ্চায়েত এলাকায় খুঁজে পাওয়া যাবে এমন অনেক হাসিবুরকে। আবাস যোজনায় ঘর পাওয়া নিয়ে অভিযোগ উঠছেও একাধিক। যেমন, যোগ্যেরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঘর পাননি। স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য ও শাসকদলের কর্মীদের ঘর থাকা সত্ত্বেও বরং তাঁরাই যোজনার ঘর পেয়েছেন। আবার শাসকদলের ঘনিষ্ঠ হয়েও ঘর মেলেনি, এমন উদাহরণও রয়েছে। এ বার প্রার্থী বদল করেছে তৃণমূল। বিদায়ী বিধায়ক অলোক জলদারের পরিবর্তে প্রার্থী করা হয়েছে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক তাপস মণ্ডলকে।

রায়দিঘি বিধানসভা কেন্দ্রে এ বার ত্রিমুখী লড়াই দেখছে রাজনৈতিক মহল। তৃণমূল, বিজেপির পাশাপাশি থাকছে সিপিএম। ২০১১ সাল থেকে কেন্দ্রটি শাসকদল তৃণমূলের দখলে রয়েছে। অর্থাৎ, প্রায় ১৫ বছর রায়দিঘি বিধানসভা কেন্দ্র শাসকদলের অধীনে। ২০০১ এবং ২০০৬ সালে রায়দিঘি থেকে বিধায়ক হয়েছিলেন বাম নেতা তথা প্রাক্তন সুন্দরবন উন্নয়ন মন্ত্রী কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়। এ বার সিপিএম এবং আইএসএফের জোটপ্রার্থী, প্রাক্তন ওই মন্ত্রীর ছেলে সাম্য গঙ্গোপাধ্যায়।

তৃণমূলের প্রার্থী বদলের পিছনে অনেকেই অবশ্য অন্য কারণ খুঁজছেন। তা হল, বেহাল রাস্তা। বিদায়ী বিধায়ককে প্রার্থী করে নির্বাচনে লড়লে শুধু ওই কারণেই পরাজয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছিল। তাই এই বদল বলে দলের অন্দরে গুঞ্জন। সূত্রের খবর, কঙ্কণদিঘি ও নগেন্দ্রপুর পঞ্চায়েত এলাকায় প্রায় ১৬ কিলোমিটার একটি রাস্তার দুর্বিষহ অবস্থা। প্রধানমন্ত্রী সড়ক যোজনা এবং জেলা পরিষদের যৌথ বরাদ্দে ওই রাস্তা তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু তিন বছরেও সংস্কার হয়নি। কারণ হিসাবে দেখানো হয়েছে, রাস্তা সংস্কারের বরাদ্দ অর্থ পর্যাপ্ত নয় বলে ঠিকাদার কাজে সম্মত হননি। ওই রাস্তাটি ঘিরে রয়েছেন প্রায় ২০-২৫টি গ্রামের কয়েক হাজার ভোটার। পাশাপাশি, একাধিক পঞ্চায়েত এলাকার রাস্তারও ভয়াবহ অবস্থা।

যদিও রাস্তা সংস্কারে তাঁর গাফিলতির কথা স্বীকার করেননি বিদায়ী বিধায়ক। তিনি বলেন, ‘‘দীর্ঘ কয়েক বছর কেন্দ্রীয় প্রকল্পের টাকা আটকে রয়েছে। সেই কারণেই সংস্কার হয়নি। চিঠি দিয়েছিলাম। নির্বাচনের পরে রাস্তা সংস্কার হবে।’’ তবে, এই আশ্বাসে চিঁড়ে ভিজছে না। বাসিন্দাদের অভিযোগ, ‘‘লোকসভা নির্বাচনের সময়ে রাস্তার সংস্কার নিয়ে একই আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। পরে ফিরেও তাকানো হয়নি। রাস্তার এমনই খন্দে ভরা অবস্থা যে, রোগীকে নিয়ে গেলে গাড়িতেই মারা যেতে পারেন।’’

আবাস যোজনার ঘর না পাওয়ার বিষয়ে তৃণমূল প্রার্থী তাপস বলছেন, ‘‘এটা বৃহত্তর সংসার। সব সমস্যার একসঙ্গে সমাধান করা যায় না। আবাস যোজনার অভিযোগও ঠিক তেমনই। তবে ধীরে ধীরে সবাই আবাস যোজনায় ঘর পাবেন। মানুষ আমাদের নির্বাচিত করবেন বলেই নিশ্চিত।’’

অন্য দিকে, বিজেপি প্রার্থী পলাশ রানার দাবি, ‘‘তৃণমূলের দুর্নীতি ও উন্নয়নবিমুখ আচরণের জন্যই মানুষ বিজেপিকে বিপুল ভোটে জয়ী করবেন।’’ রায়দিঘিতে নিজের পেট্রল পাম্পের নির্বাচনী কার্যালয়ে বসে ৩৯ বছর বয়সি পলাশের বক্তব্য, সংসারে আর্থিক অনটন থাকায় ন’বছর বয়স থেকেই ব্যবসা করছেন। হিরে থেকে জিরে— সব ব্যবসাই তিনি করেন। তাঁর সঙ্গে সব সময়ে মানুষের যোগাযোগ আছে। নির্বাচনে মানুষ তাঁর পাশেই থাকবেন।

সুন্দরবনের কাজের মানুষ, কাছের মানুষ বলে পরিচিত কান্তি গঙ্গোপাধ্যায় ২০১১ সালে হাজারখানেক ভোটে পরাজিত হন তৃণমূল প্রার্থী দেবশ্রী রায়ের কাছে। ২০১৬ সালেও ফের অল্প ভোটে দেবশ্রীর কাছে পরাজিত হয়েছিলেন কান্তি। ২০২১ সালে তিনি ছিলেন তৃতীয় স্থানে। প্রথম স্থানে তৃণমূল। আর দ্বিতীয় স্থানে বিজেপি।

কান্তির প্রতি রায়দিঘির মানুষের সহানুভূতি ও ভালবাসাকে পুঁজি করেছেন বাম নেতৃত্ব। প্রায় ৮০ বছর বয়সি মন্ত্রীর মুখ বদল করে তাই তাঁর ছেলেকে প্রার্থী করেছে সিপিএম। আইনের স্নাতক সাম্য গত ২৫ বছর ধরে বাবার ছায়াসঙ্গী। ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে রায়দিঘির ভাঙা বাঁধ মেরামতিতে বাবার সঙ্গে থাকতেন। এ বারে ছেলের হয়ে নির্বাচনী প্রচারে সব সময়েই রয়েছেন অশীতিপর প্রাক্তন মন্ত্রী। রাজনৈতিক মহলের দাবি, তরুণ সাম্য প্রায় সব ক’টি পঞ্চায়েত এলাকায় তৃণমূল এবং বিজেপির থেকে জনসংযোগে এগিয়ে গিয়ে গত বিধানসভা নির্বাচনে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানে থাকা দুই দলকে টক্কর দিচ্ছেন। যা ওই কেন্দ্রে ত্রিমুখী লড়াইয়ের আবহ তৈরি করেছে।

কান্তি বলেন, ‘‘বর্তমান পরিস্থিতিতে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ২০২১ সাল থেকে ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি শুরু। এখন মেরুকরণ জমাট বেঁধে পাথর হয়ে গিয়েছে।’’ ফলাফল নিয়ে অনেকটাই আশ্বস্ত সাম্যের কথায়, ‘‘প্রচারের সময়ে মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছেন। মানুষ যদি সঙ্গে থাকেন, মেরুকরণ না-ও টিকতে পারে।’’

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনে এই রায়দিঘি কেন্দ্র থেকে প্রায় ২০-২৫ হাজার নাম বাদ গিয়েছে বলে সূত্রের খবর। অতএব, ত্রিমুখী লড়াইয়ের ফল স্পষ্ট হতে অপেক্ষা ৪ মে পর্যন্ত।

আরও পড়ুন