—প্রতীকী চিত্র।
ফেলুদার ঢঙে যদি প্রশ্ন করা হয়, ‘যাদবপুর বললে প্রথমেই কী মাথায় আসে?’ বড় অংশের লোকের উত্তর, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। কিছু লোকের কাছে এইট বি বাস স্ট্যান্ড, ই-ওয়ানে নিশ্চিত বসার জায়গা পাওয়ার সুখ-স্মৃতি। কারও উত্তর, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের একদা নির্বাচনী ক্ষেত্র, লাল-রোমান্টিকতা। তবে নির্বাচনী অঙ্কে, তা অতীতের ছায়া। রাজ্যের বাকি বিধানসভার তুলনায় ভোট শতাংশ কিছুটা চোখে পড়ার মতো হলেও এই বিধানসভা কেন্দ্রে বামেদের ধরে রাখা দ্বিতীয় স্থান লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে তৃতীয় স্থানে নেমে গিয়েছে। তবে এ বারের লড়াই যেন কিছুটা আলাদা। পশ্চিমবঙ্গের যে কয়েকটি কেন্দ্র আছে, যেখানে মূল তিন প্রতিপক্ষই জেতার দাবি করতে পারে, তার অন্যতম যাদবপুর।
কলকাতা পুরসভার ৯৬, ৯৯, ১০১ থেকে ১০৬, ১০৯, ১১০ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে এই বিধানসভা। উচ্চবিত্ত এলাকার পাশাপাশি মূলত উদ্বাস্তু কলোনি নিয়ে গড়ে উঠেছে এই যাদবপুর। উদ্বাস্তু-আন্দোলন, বাস্তুহারা পরিষদ গঠন, ভূমিহীনদের পাট্টা দেওয়া, মাথার ছাদ দেওয়ার আন্দোলনে প্রথম সারিতে ছিলেন বামপন্থীরা। ঐতিহাসিক ভাবে এই সব এলাকায় বামপন্থীদের দাপট ছিল। কিন্তু ২০১১-য় পরিবর্তনের ভোটে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব যাদবপুরে পরাজিত হন তৃণমূল কংগ্রেসের মণীশ গুপ্তের কাছে। পরের বিধানসভা নির্বাচনে তা পুনরুদ্ধার করেছিলেন সিপিএমের সুজন চক্রবর্তী। কিন্তু ২০১৯-এর লোকসভা ভোট থেকে বামের সেই ভোটে ভাগ বসানো শুরু বিজেপির। আর সেই থেকে টানা তৃণমূলের এগিয়ে থাকা এই বিধানসভায়।
তৃণমূলের বিদায়ী বিধায়ক তথা এ বারেও প্রার্থী দেবব্রত মজুমদার (মলয়) ২০১০ থেকে কলকাতা পুরসভার পুর-প্রতিনিধি এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দফতরের মেয়র পারিষদ। সিপিএম প্রার্থী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য শুধু রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ নন, তিনি কলকাতা পুরসভার প্রাক্তন মেয়র এবং ১০০ নম্বর ওয়ার্ডের পুর-প্রতিনিধিও ছিলেন। এই পরিস্থিতিতে বিধানসভা নির্বাচন হলেও ঘুরে ফিরে আসছে পুর-পরিষেবার প্রসঙ্গ।
এলাকাবাসী জানাচ্ছেন, পানীয় জল ও নিকাশি নিয়েই যাদবপুরের সব চেয়ে বড় সমস্যা। সামান্য বৃষ্টিতে বেশির ভাগ এলাকায় জল জমে। তাই ভোট-প্রচারে নেমে তৃণমূল প্রার্থী দেবব্রত পুর-পরিষেবার কথা বলছেন। বলছেন, “আমরা তিনটি জলপ্রকল্প তৈরি করেছি। আরও ন’টির কাজ চলছে। জল জমার সমস্যা মেটাতে কালিকাপুরে পাম্পিং স্টেশন করা হয়েছে। আরও একটা করা হবে। গোটা কলকাতায় কোথাও খোলামুখ ভ্যাট নেই। একদা যাদবপুরে আবর্জনা আর দুর্গন্ধে মানুষের অসুবিধা হত। এখন সেই সমস্যা মিটেছে।” তাঁর সংযোজন, “আমি ২৪ ঘণ্টা নিজের এলাকায় সময় দিই। তার জোরেই জিতব।” বস্তুত, রিকশা, অটো থেকে বাড়ির দেওয়াল, পতাকা টাঙানো— প্রচারে কয়েক যোজন এগিয়ে তৃণমূল প্রার্থী। এরই মধ্যে তৃণমূলের ওয়ার্ড অফিস থেকে দলীয় পতাকা বিলি হতে দেখে এক জন বললেন, “এই সব দেখে কিছু বলা যায় না। মানুষের মনে কী চলছে, বোঝা মুশকিল!”
বোধহয় সেই ‘মনে’রই সন্ধানে পাটুলি টাউনশিপে প্রচার করছিলেন বিজেপি প্রার্থী শর্বরী মুখোপাধ্যায়। বৃদ্ধ জগদ্বন্ধু দাস অশক্ত শরীরে, ওয়াকার নিয়ে বিজেপি প্রার্থীকে দেখতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। প্রার্থী এসে বৃদ্ধের হাত দু’টো চেপে ধরতেই জগদ্বন্ধুর চোখে জল। এক প্রৌঢ় বধূ পাশ থেকে বললেন, “মনে মনে সব আছে। এ বার ভালই হবে।” বিজেপি প্রার্থী হাত নাড়তে নাড়তে বলে চলেন, “পরিবর্তন চাই।”
তৃণমূল প্রার্থী বলছিলেন, “সিপিএমের এখানে কিছুটা সংগঠন থাকলেও, তা ক্ষয়িষ্ণু।” গত তিন নির্বাচনে সিপিএমের প্রাপ্ত ভোট শতাংশও সেই সাক্ষ্য দিচ্ছে। সিপিএম নিজে অবশ্য ২০১৬-র ভোটে যাদবপুর-পুনরুদ্ধার স্মরণ করে এ বার আশাবাদী। স্থানীয় সিপিএম নেতা সুব্রত দাশগুপ্ত তাই বলছেন, “কলোনি এলাকায় প্রচারে ভাল সাড়া মিলছে। আবাসনগুলিতে ‘মিট দ্য ক্যান্ডিডেট’ কর্মসূচি ভাল হয়েছে। উচ্চবিত্তদেরবড় অংশেরই আর জি কর আন্দোলনের সময় থেকে বিজেপির প্রতি মোহভঙ্গ হয়েছে। তৃণমূলের অবস্থা খুব খারাপ।” বামেদের আশা জোগাচ্ছে শহিদ স্মৃতি কলোনিও। ১০৯ নম্বর ওয়ার্ডের পঞ্চসায়র এলাকার এই অঞ্চলে গত তিনটি নির্বাচনে ‘সন্ত্রাসে’র কারণে প্রচার করতে পারেননি বাম প্রার্থী। এ বার বর্ষীয়ান নেতা কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে প্রার্থী বিকাশকে নিয়ে প্রচার হয়েছে। দাবি, সাড়াও মিলেছে।
সরকারি-বিরোধী হাওয়ার কথা মানছেন এলাকার তৃণমূল কর্মীদের একাংশও। সেই সঙ্গে তাঁদের আশঙ্কায় রয়েছে, বিজেপির ‘পক্ষে’ রাজ্য জুড়ে ‘তৈরি হওয়া চোরাস্রোত’ নিয়েও। তাতে ভরসা রেখেই বোধহয় তৃণমূলের পাশাপাশি সিপিএমকে আক্রমণ করেন বিজেপি প্রার্থী শর্বরী। তিনি বলছেন, “গত ভোটে সৃজন ভট্টাচার্য এখানে ৫৯ হাজার ভোট পেয়েছিলেন। কোথায় গেলেন সৃজন, মানুষ এই প্রশ্ন করছেন। ব্যক্তি বিকাশ বিষয় নয়। যাঁরা ভোট কাটতে চাইবেন, মানুষ তাঁদের প্রত্যাখ্যান করবেন।” সিপিএমের সুব্রতের অবশ্য দাবি, “মানুষ তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে বুঝছেন, তৃণমূল পারবে না। বিজেপিকে দিয়ে তৃণমূলকে হারানো যাবে না। তাই বিকল্প বামপন্থীরাই।” সিপিএম প্রার্থী বিকাশের বক্তব্য, “মানুষের সঙ্গে কথা বলে মনে হচ্ছে, তাঁরা পরিবর্তন চাইছেন। আর সেই পরিবর্তন আমাদের পক্ষে।”
কিন্তু বিকাশের আশায় জল ঢালতে মেয়র হিসেবে তাঁর ভূমিকার কথা প্রচারে আনছে তৃণমূল ও বিজেপি। তৃণমূল প্রার্থী দেবব্রতের অভিযোগ, “উনি মেয়র থাকার সময়ে একের পর এক কারখানা বন্ধ করে সেই জমি বেসরকারি মালিকানার হাতে তুলে দিয়েছেন। সরকারি জমিতে বেসরকারি হাসপাতাল, শপিং মল হয়েছে।”
বিজেপির শর্বরীরও অভিযোগ, “যাদবপুরের পানীয় জলের সমস্যা সমাধান না-করে বিকাশ গার্ডেনরিচ থেকে পাম্প বসিয়ে নিজের ঘরে জলের লাইন করে নিয়েছিলেন।” অভিযোগ উড়িয়ে বিকাশের বক্তব্য, “জমি পড়ে থাকলে দালাল লুট করত। আমরা জমি দিয়েছিলাম বলে পুরসভার আয় বেড়েছে। সুব্রতবাবুর (প্রয়াত প্রাক্তন মেয়র সুব্রত মুখোপাধ্যায়) আমলের দেনা মিটিয়ে আমি লাভজনক অবস্থায় রেখে এসেছিলাম কলকাতা পুরসভাকে।”
এমন তরজার ভিড়ে আশাবাদী তিন পক্ষই। শাসকের চেষ্টা সরকার-বিরোধিতার ‘চোরাস্রোত’কে পরিষেবার বাঁধ দিয়ে রোখার। বিজেপির লক্ষ্য, মানুষের মনে থাকা সরকার-বিরোধিতাকে ভোট বাক্সে নিয়ে যাওয়া। আর সিপিএম মুখিয়ে আছে যাদবপুরে ‘বিকাশে’র অপেক্ষায়।