অধীর চৌধুরী। — ফাইল চিত্র।
নববর্ষের সকালে পাঁঠার মাংসের দোকানে জমেছে মধ্যবিত্ত ভিড়। একটু দূরেই চলছে সকালের নির্বাচনী পথসভা। ব্যাগ হাতে প্রৌঢ় তাঁর পড়শিকে বলছেন, ‘‘একুশে একটা ফুল নিলি, চব্বিশে জোড়া ফুল নিলি। এ বার কী করবি?’’ সদ্য মন্দিরে পয়লার প্রণাম সেরে আসা বই-খাতার দোকানের মালিক কথার খেই ধরে বলে বসলেন, ‘‘এ বার ফুল (পূর্ণ) পরিবর্তন চাই!’’
জব্বর গেরোটা এইখানেই! প্রাচীন নবাব-ভূমের অধুনা সদর শহরে সব পক্ষই পরিবর্তন চায়। পুরসভা ও লোকসভা জয় করার পরে শাসক তৃণমূল কংগ্রেস বিধানসভা কেন্দ্রেও পরিবর্তনের দাবিদার। পাঁচ বছর বিধায়ক যে দলের, সেই বিজেপি গোটা রাজ্যেই পরিবর্তনের স্বপ্নে মগ্ন। আবার পরপর দুই ভোটে হেরে পুরনো ঘাঁটিতে দুই ফুলের পরিবর্তন ঘটিয়ে কংগ্রেস ঘুরে দাঁড়াতে চায়।
এই বদলের আশা ঘিরে আছে অঙ্ক এবং আবেগের লড়াই। অঙ্কটা এই রকম যে, চৌবাচ্চা থেকে দুই ফুটো দিয়ে জল বেরোচ্ছে আর এক নল দিয়ে জল ভরা হচ্ছে। হিসেব চলছে , চৌবাচ্চা আগে খালি হবে, না ভর্তি হবে! আর এ সব অঙ্কের উল্টো দিকে আছে একটা চিনচিনে ব্যথার মতো আবেগ। অধীর চৌধুরীকে তাঁর বহরমপুর ফের খালি হাতে ফিরিয়ে দেবে? ধারে-ভারে-উচ্চতায় বাকিদের সঙ্গে তাঁর তুলনা কঠিন। কিন্তু মাঝে আছে অঙ্ক!
শহরের পুরনো বাসিন্দাদের বড় অংশ এখনও প্রাক্তন সাংসদের জন্য অধীর। পুরসভাকে কাজে লাগিয়ে শহরে তাঁর পুরনো কাজ, মেয়ে ও মায়েদের নিরাপত্তায় ডাকাবুকো হয়ে দাঁড়ানো— সে সব পুরনো দিন তাঁরা ভোলেননি। লোকসভায় টানা পাঁচ বার সাংসদ হওয়ার পরে ২০২৪ সালে গুজরাত থেকে আসা ক্রিকেটার ইউসুফ পাঠানের কাছে ম্যাচ হেরেছেন অধীর। তারও তিন বছর আগে এই বহরমপুরে কংগ্রেসকে তৃতীয় স্থানে নামিয়ে বিধানসভা আসন জিতেছেন বিজেপির সুব্রত (কাঞ্চন) মৈত্র। দলের দুঃসময়ে তিরিশ বছর পরে বিধানসভার লড়াইয়ে ফিরে এসে অধীর যখন পাড়ায় পাড়ায় ঘুরছেন, পুরনো, বর্ষীয়ান বাসিন্দাদের সাড়া দেখা যাচ্ছে। কিন্তু পুরনো আমানতের সঙ্গে নতুন পুঁজি যোগ করার জন্য যে সংগঠন লাগে, কংগ্রেসের জন্য সে এখন নবাব আমলের মতোই অতীত!
প্রচারের ধকলে ভেঙে যাওয়া গলা ঠিক রাখতে ওষুধ খেতে খেতে অধীর বলছেন, ‘‘কঠিন! কঠিন লড়াই! চলে তো গিয়েছে অনেকেই। যারা আছে, তাদের নিয়েই নেমে গিয়েছি। আগের মতো মেরুকরণের হাওয়া এ বার তুলতে পারছে না ওরা। তৃণমূলকে মানুষ ভোট দিয়েছেন, বিজেপিকেও দিয়েছেন। রাজ্যে ও গোটা দেশে দু’টো দল কী করছে, তাঁরা দেখছেন। ওই পথ থেকে মানুষ সরে আসবেন, সেটাই আবেদন করছি।’’ শুধু বহরমপুরে প্রার্থী হয়ে লড়ছেন না প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি, জেলার ২২টা কেন্দ্রই তাঁর কাঁধে। সকালে নিজের এলাকায় প্রচার, বিকেলে অন্য কেন্দ্রে, রাতে ফিরে সময় থাকলে আবার নিজের কেন্দ্রে কর্মসূচি— এই ভাবেই এগিয়েছে রুটিন। প্রাক্তন সাংসদের কথায়, ‘‘আগে লোকসভার মধ্যে ৭টা বিধানসভা অঞ্চলে যেতে হত। এখন বিধানসভা বলে পাড়ায় পাড়ায় যাওয়ার চেষ্টা করেছি। খুব বেশি কিছু বদলায়নি।’’ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বহরমপুরে রোড-শো করে গিয়েছেন, তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দু’বার জেলায় এসে কংগ্রেস নেতাকে ‘বিজেপির এজেন্ট’ বলে গিয়েছেন ফের! অধীরের মতে, ‘‘পুরনো খেলা! ভোট এলেই আমাকে বিজেপি বানাতে হবে! তবে বারবার এক অস্ত্র চলে না।’’
নববর্ষের প্রভাতী প্রচার সেরে মিষ্টি খেতে খেতে তৃণমূলের প্রার্থী নাড়ুগোপাল মুখোপাধ্যায় সেই কথাই বলছেন। তবে ভিন্ন আঙ্গিকে। বহরমপুরের পুর-প্রধানের কথায়, ‘‘অধীর চৌধুরীর নাম নিশ্চয়ই একটা ব্যাপার। কিন্তু নতুন আর কী দেবেন? ওঁর কংগ্রেসের ভোট থেকে আমরা কেটেছি, পরে বিজেপি কাটছে। লোকসভা নির্বাচনে যে বহরমপুর বিধানসভা থেকে ৭৫-৮০ হাজার লিড পেতেন, সেটা গত বার হয়েছে ৭ হাজার। চৌবাচ্চা থেকে জল তুলতে থাকলে উনি সেটা আর ভরাবেন কোথা থেকে!’’ পাঁচ বছর আগে বিজেপির সুব্রতের কাছে বিধানসভায় হেরেছিলেন নাড়ুগোপাল। তার পরের চার বছর তাঁর হাতে পুরসভা। তাঁর বক্তব্য, ‘‘রাজ্য সরকারের জনকল্যাণ মূলক প্রকল্প আছেই। যে প্রকল্পে আগে শহরের ৩০ হাজার মানুষ সুবিধা পেতেন, সেখানে এখন ৪৬ হাজার মানুষ পান। পুরসভা হাতে থাকায় পরিষেবা ছাড়াও সরকারি প্রকল্পের কাজে সুবিধা হয়েছে। এই কাজের জোরেই আমরা ভোট চাইছি।’’
চাইছেন বটে, তবে ইতিহাস বলছে, ১৯৯১ সালের পর থেকে বহরমপুর বিধানসভা কেন্দ্রের রায় সব সময় প্রতিষ্ঠান-বিরোধী হয়েছে। নাড়ুগোপাল সেই ইতিহাস মাথায় রেখেই বলছেন, ‘‘লড়াই হবে!’’
বিধায়ক কী বলেন? সুব্রতের মতে, ‘‘পাঁচ বছর আগের চেয়ে এ বারের পরিস্থিতি আমাদের জন্য ভাল। মানুষ সরকার পরিবর্তন চাইছেন, শুধু ভোটের দিনটার জন্য অপেক্ষা করে আছেন!’’ তাঁর বাবা-মা এসেছিলেন ও’পার বাংলা থেকে। বিধায়কের হিসেবে, এখনও ৪০-৪৫ হাজার মানুষ আছেন সে রকম। কিন্তু ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) তো ও’পার বাংলার যোগ-জনিত ভাবাবেগে কোপ মেরে দিয়েছে? সুব্রত বলেন, ‘‘একটু ব্যথা আছে। তবে সামলে নেওয়ার মতো। আমিও ব্যথা নিয়েই রাজনীতিতে এসেছিলাম।’’
প্রার্থী অধীর কি তাঁকে চাপে ফেলে দিলেন? বিধায়ক পাল্টা প্রশ্ন তোলেন, ‘‘ধরা যাক যদি হেরে যাই, লিখতে পারবেন ‘অধীর ফ্যাক্টর’-এর কারণে। কিন্তু ওঁর কী হবে? হেরে গেলে আর কোথায় যাবেন? আর একা জিতলে করবেনই বা কী?’’
অধীর মনে করাচ্ছেন, ‘‘মমতাও এক সময়ে তাঁর দলের একা সাংসদ ছিলেন। দুনিয়ায় কোনও কিছুতেই সব সময় সমান যায় না। বহরমপুরের মানুষের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হতে চাই, তাতে একা হলেও কী আসে যায়!’’
এখন প্রশ্ন হল, বহরমপুর তার কণ্ঠের ভার দেবে কাকে? উত্তর ডুবে আছে চৌবাচ্চার জলে আর খানিকটা আবেগের ঝুলিতে! জটায়ু থাকলে বলতেন, বেরহামপুরের বিদঘুটে!