West Bengal Election 2026

অমিত শাহ পেশ করবেন শনিবার, ২৪ ঘণ্টা আগে মমতার বিরুদ্ধে বিজেপি-র ‘চার্জশিট’-এর হদিস পেল আনন্দবাজার ডট কম

বিজেপি সূত্রে জানা গিয়েছে, ৩৫ থেকে ৪০ পাতার ‘চার্জশিট’ প্রকাশ করা হবে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পশ্চিমবঙ্গ সফরসূচি শেষমুহূর্তে বদলে না-গেলে তিনিই পেশ করবেন এই সুদীর্ঘ ‘চার্জশিট’।

Advertisement
ঈশানদেব চট্টোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: ২৭ মার্চ ২০২৬ ০৮:৫৭

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

স্থানীয় সমস্যা এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতি তুলে ধরে বিধানসভা কেন্দ্রভিত্তিক ‘চার্জশিট’ আগেই প্রকাশ করেছিল বিজেপি। রাজ্য স্তরের নেতারা বিভিন্ন বিধানসভা কেন্দ্রে গিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রকাশ করেছিলেন তৃণমূলের বিরুদ্ধে ‘অভিযোগনামা’। হাতে হাতে এবং হোয়াট্‌সঅ্যাপ মারফত ছড়িয়ে গিয়ে সে সব ‘চার্জশিট’ নানা এলাকায় নজর কেড়েছে। এ বার তাই বিজেপি রাজ্য স্তরের ‘চার্জশিট’ পেশ করার পথে। আগামী শনিবার (২৮ মার্চ) আনুষ্ঠানিক ভাবে ওই ‘চার্জশিট’ পেশ করবেন অমিত শাহ।

Advertisement

তিনটি মেয়াদে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মোট ১৫ বছরের শাসনে রাজ্যের ‘অবনতি’র ১৪টি মূল ক্ষেত্র তুলে ধরা হচ্ছে বিজেপির ‘চার্জশিট’-এ। শুধু মমতা নয়, বিজেপির অভিযোগপত্রে একই সঙ্গে কাঠগড়ায় তোলা হচ্ছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেও।

বিজেপি সূত্রে জানা গিয়েছে, ‘চার্জশিট’-টি ৩৫ থেকে ৪০ পাতার। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহের পশ্চিমবঙ্গ সফরসূচি বদলে না-গেলে তাঁর হাত দিয়েই এই ‘চার্জশিট’ পেশ করা হবে। ‘চার্জশিট’-এর মলাটে বা প্রথম পাতায় পশ্চিমবঙ্গের ‘অশান্ত’ ছবির পটভূমিকায় মমতাকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাবে। যা মমতার ‘প্রস্থানের প্রতীক’ বলে রাজ্য বিজেপির একাংশের ব্যাখ্যা। পরের পাতায় যে ভূমিকা বা উপক্রমণিকা থাকছে, সেখানে রাজনৈতিক হিংসা, দুর্নীতি এবং জনবিন্যাস বদলকে সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেই পাতায় মমতার পাশাপাশি অভিষেকের ছবিও থাকছে। ছবিদু’টির চোখের অংশ লাল রঙে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে। তার পরের পাতাগুলিতে একে একে তুলে ধরা হয়েছে বর্তমান শাসকদের ১৪টি ‘অপকীর্তি’ সংক্রান্ত বিষয়। প্রতিটি মূল বিষয়ের অধীনে একগুচ্ছ ঘটনা বা উদাহরণ তুলে ধরা হচ্ছে।

কী কী থাকছে বিজেপির ‘চার্জশিট’-এ?

১. দুর্নীতি এবং কেলেঙ্কারি

ক) ১০ হাজার কোটি টাকার রেশন কেলেঙ্কারি। খ) স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় দুর্নীতির জেরে ২৬ হাজার যুবক-যুবতী কাজ হারিয়েছেন। গ) মহাত্মা গান্ধী গ্রামীণ রোজগার যোজনায় গরিবের প্রাপ্য লুট করতে ২৫ লক্ষ ভুয়ো জব কার্ড তৈরি করা। ঘ) প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনায় গরিব মানুষকে পাকা ঘরের ব্যবস্থা করে দিতে বাড়ি পিছু ২৫ হাজার টাকা করে কাটমানি নেওয়া। ঙ) ৪০০ কোটি টাকার ডিয়ার লটারি দুর্নীতি। চ) স্কুলপড়ুয়াদের মিড-ডে মিল প্রকল্পে ভুয়ো খরচ দেখিয়ে ১০০ কোটি টাকা লুঠ। ছ) ১৭৫২০ কোটি টাকার রোজ়ভ্যালি চিট ফান্ড দুর্নীতি। জ) গ্রামীণ সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে ৩৪৩ কোটি টাকা লুট। ঝ) মালদহ জেলায় বন্যাত্রাণে ১০০ কোটি টাকার দুর্নীতি। ঞ) আমফান সাইক্লোনের ত্রাণ থেকে ১০০০ কোটি টাকা চুরি। ট) মমতার প্রিয় অনুব্রত মণ্ডল দ্বারা গরু পাচার সিন্ডিকেট পরিচালনা।

২. প্রশাসনিক নৈরাজ্য এবং রাজনৈতিক অপশাসন

ক) ২০ লক্ষ সরকারি কর্মীকে মহার্ঘ ভাতা থেকে বঞ্চিত করা। খ) সপ্তম বেতন কমিশন চালু না-করা। গ) এসআইআর প্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়ার চেষ্টা। ঘ) সীমান্তে কাঁটাতার বসানোর জন্য জমি না-দিয়ে অনুপ্রবেশে সহায়তা।

৩. আইনশৃঙ্খলার ধ্বংসস্তূপ

ক) জাতীয় ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোকে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ‘সঠিক তথ্য’ না-দেওয়া সত্ত্বেও মমতা জমানায় পশ্চিমবঙ্গে কতজনকে খুনের চেষ্টা করা হয়েছে, কতজন খুন হয়েছেন, ৬ থেকে ১২ বছর বয়সি কতজন নাবালিকা মাত্র এক বছরে অপহৃত হয়েছে, শিশুদের উপর হওয়া অপরাধমূলক নির্যাতনের সংখ্যা পশ্চিমবঙ্গে কী ভাবে জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেক বেশি— সে সব তথ্য বিশদে তুলে ধরা হয়েছে। খ) ২০২১-’২২ অর্থবর্ষের সিএজি রিপোর্ট অনুযায়ী কী ভাবে কেন্দ্রের কাছ থেকে পাওয়া ২.২৯ লক্ষ কোটি টাকা খরচের হিসাব পশ্চিমবঙ্গ সরকার দেয়নি, কী ভাবে পাড়ায় পাড়ায় বোমা মেলে, কী ভাবে দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত এড়িয়ে যাওয়া হয়, সে সবের বিশদে উল্লেখ।

৪. গণতন্ত্রের উপরে হামলা

ক) ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ১১৪টি রাজনৈতিক খুন, ২০২১ সালে ভয়াবহ ভোট পরবর্তী হিংসা। খ) বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর উপরে হামলা। গ) পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভাকে অপশাসনের যন্ত্রে পরিণত করা।

৫. নারীর নিরাপত্তাহীনতা (এনসিআরবি তথ্য এবং সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী)

ক) মহিলাদের বিরুদ্ধে ঘটা অপরাধের সংখ্যা ৩৫ হাজারের কাছাকাছি। দেশে পশ্চিমবঙ্গ চতুর্থ। খ) গার্হস্থ্য হিংসার ঘটনা প্রায় ২০ হাজার। জাতীয় গড়ের দ্বিগুণ। গ) গোটা দেশে ঘটা অ্যাসিড হামলার ২৭.৫ শতাংশই পশ্চিমবঙ্গে। ঘ) বিপুল সংখ্যক ঝুলে থাকা তদন্ত। ঙ) আরজি কর, সন্দেশখালি, কসবা ল কলেজের ঘটনা। চ) সালিশি সভা বসিয়ে মহিলাদের উপরে নির্যাতন। ছ) পার্ক স্ট্রিট ধর্ষণ কাণ্ডকে আড়াল করার চেষ্টা। জ) হাঁসখালিতে ধর্ষিতাকেই দোষারোপ করা। ঝ) কামদুনি গণধর্ষণ কাণ্ড। ঞ) দুর্গাপুরে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠার পরে রাতে নির্যাতিতার বাইরে বেরোনো নিয়ে প্রশ্ন তোলা।

৬. শিল্পের সমাধিক্ষেত্র

ক) জাতীয় জিডিপি-তে পশ্চিমবঙ্গের অংশীদারি প্রায় অর্ধেক হয়ে যাওয়া। খ) রাজ্যের মাথায় আট লক্ষ কোটি টাকার দেনা চাপানো। গ) রাজস্ব ঘাটতির ভয়াবহ ছবি। ঘ) বরাদ্দ হওয়া টাকা খরচ করতে না-পারা। ঙ) আর্থিক বৃদ্ধির বেহাল দশা, রাজ্যবাসীর মাথাপিছু আয় কমে যাওয়া। চ) প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়া। ছ) শিল্পবিরোধী আইন তৈরি করা। জ) সাড়ে ছ’হাজারেরও বেশি সংস্থার রাজ্য ছেড়ে চলে যাওয়া। ঝ) কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে দিশাহীনতা। ঞ) স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণদের প্রায় অর্ধেকেরই কর্মসংস্থান না-হওয়া। ট) কলকাতায় মেসির অনুষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা।

৭. কৃষির দুর্দশা

ক) ৪৭ শতাংশ কৃষিজমিতে সেচের সুবিধা না-থাকা। খ) আলুচাষিদের আত্মহত্যা।

গ) ১০০ কোটি টাকার সার ও বীজ কেলেঙ্কারি। ঘ) ধান উৎপাদনে প্রথম স্থান থেকে তৃতীয় স্থানে নেমে যাওয়া। ঙ) মৎস্যজীবীদের প্রাপ্য কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধা গায়েব করে দেওয়া। চ) ডেয়ারি ক্ষেত্রের দিকে কোনও নজর না-দেওয়া।

৮. স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্কট

ক) রাজ্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রের নিদারুণ অভাব। খ) বাজেটে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বরাদ্দ না-বাড়ানো। গ) সরকারি হাসপাতালের সংখ্যা বৃদ্ধির বদলে কমে যাওয়া। ঘ) আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প চালু করতে না-দেওয়া। ঙ) রাজ্য সরকারের স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প রাজ্যেরই অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতালে অকেজো।

৯. শিক্ষার সর্বনাশ

ক) শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি। খ) পাঠ্যক্রমের আধুনিকীকরণ না-করা। গ) লক্ষ লক্ষ পড়ুয়া সরকারি স্কুল ছেড়ে বেসরকারি স্কুলমুখী। ঘ) ৩৮০০-র বেশি স্কুল এমন, যেখানে প্রায় ১৮ হাজার শিক্ষক রয়েছেন, কিন্তু ছাত্র বিরল। ঙ) কলকাতা এবং যাদবপুরের মতো নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মানের অবনমন। চ) কেন্দ্র বিপুল টাকা দেওয়া সত্ত্বেও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির মানোন্নয়নে রাজ্যের অনীহা।

১০. সংস্কৃতিকে ধ্বংস করা

ক) জনবিন্যাসে দ্রুত পরিবর্তন পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতিকে বদলে দিচ্ছে। খ) ওবিসি তালিকায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৭৫টি শ্রেণিকে বেআইনি ভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। গ) বাংলাদেশ থেকে ভারতে অনুপ্রবেশ পশ্চিমবঙ্গে সবচেয়ে বেশি। ঘ) ওয়াকফ সম্পত্তি যাচাই করতে গিয়ে বড় সংখ্যায় জালিয়াতি ধরা পড়ছে। ঙ) চিকেন’স নেক বা শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা হচ্ছে। চ) আম এবং রেশমের পরম্পরা ধ্বংস। ছ) পাঠ্যবইয়ে বাংলা শব্দ বদলে দেওয়া হচ্ছে। যেমন, রামধনুকে রংধনু করা হয়েছে। জ) মতুয়া সমাজকে অপমান করা হয়েছে। ঝ) দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদাধিকারী রাষ্ট্রপতিকে পশ্চিমবঙ্গ সরকার অপমান করেছে। ঞ) ওয়াকফ আইন পাশ হওয়ার পরে পশ্চিমবঙ্গের নানা প্রান্তে হিংসা উস্কে দেওয়া হয়েছে।

১১. চা বাগান শ্রমিকদের বঞ্চনা

ক) মজুরি এবং বোনাস নিয়ে স্বচ্ছ নীতির অভাবে ২৫টি চা বাগান বন্ধ হয়েছে। খ) চা বাগান শ্রমিকেরা প্রভিডেন্ড ফান্ডের সুবিধা থেকে এখনও বঞ্চিত। গ) চা-পর্যটনের নামে চালু চা বাগানের ক্ষতি করা হচ্ছে। ঘ) চা বাগানে, ডুয়ার্সের জঙ্গলে, হাতির যাতায়তের পথে প্রভাবশালীরা রিসর্ট বানাচ্ছেন।

১২. উত্তরবঙ্গের বঞ্চনা

উত্তরবঙ্গের উন্নয়নে নজর না-দেওয়া এবং সেখানকার পরিকাঠামো উন্নয়নে কিছুই না-করার অভিযোগ বিশদ খতিয়ান-সহ তুলে ধরা হচ্ছে।

১৩. সিন্ডিকেটের খোলা ময়দান রাঢ়বঙ্গ

ক) রাঢ়বঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় কয়লা এবং বালির মতো প্রাকৃতিক সম্পদকে অবাধে লুট করা হচ্ছে। খ) আদিবাসীদের উচ্ছেদ করে ডেউচা-পাঁচামিতে কয়লাখনি। গ) পুরুলিয়া এবং বাঁকুড়ায় প্রবল জলকষ্ট সত্ত্বেও কেন্দ্রের জলজীবন মিশন চালু হতে না-দেওয়া।

১৪. ক্ষয়িষ্ণু কলকাতা

ক) কলকাতার উন্নয়ন রাজনৈতিক কারণে আটকে রাখা, মেট্রো প্রকল্প এগোতে না-দেওয়া। খ) অজস্র বেআইনি নির্মাণে প্রশ্রয় দিয়ে শহরকে বিপজ্জনক করে তোলা হয়েছে। গ) কলকাতা লাগোয়া দক্ষিণ ২৪ পরগনা থেকে বিপুল সংখ্যায় নাবালিকা ও শিশুপাচার।

বিজেপি এই মোট ১৪ দফা অভিযোগ তৃণমূল তথা মমতার সরকারের বিরুদ্ধে আগে তুলে ধরতে চায়। এই অভিযোগগুলির সমর্থনে বিশদ তথ্য এবং তথ্যসূত্র ‘চার্জশিট’-এ পেশ করা হবে, যাতে অভিযোগগুলিকে ‘ভুয়ো’ বলে নস্যাৎ করা না-যায়। বিজেপির লক্ষ্য, নিজেদের ‘সঙ্কল্পপত্র’ (নির্বাচনী ইস্তেহার) তথা প্রতিশ্রুতির তালিকা পশ্চিমবঙ্গবাসীর সামনে তুলে ধরার আগে তৃণমূলের বিরুদ্ধে তাদের সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলিকে একত্রে এনে আরও একবার সকলের সামনে তুলে ধরা। সেই লক্ষ্যেই এই ‘চার্জশিট’।

Advertisement
আরও পড়ুন