গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
শুভেন্দু অধিকারীর মনোনয়ন পর্বে হাজির ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনোনয়নে দেওয়া হবে বহুত্ববাদের বার্তা। মনোনয়ন পর্ব থেকেই ‘সঙ্কেত’ স্পষ্ট। ভবানীপুরে রাজনীতির পাশাপাশিই লড়াইযে থাকবে ‘মেরুকরণ’ বনাম ‘বহুত্ববাদ’।
ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে মূল যুদ্ধে অবতীর্ণ মুখ্যমন্ত্রী মমতা এবং বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু। স্বভাবতই দু’জনের মনোনয়ন পর্ব ঘিরেও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। শুভেন্দুর মনোনয়নে শাহের উপস্থিতি যেমন ঘটনাপ্রবাহকে ‘বিশেষ তাৎপর্য’ দিয়েছিল, তেমনই মমতার মনোনয়ন ঘিরেও আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
সবকিছু পরিকল্পনামাফিক এগোলে বুধবার আলিপুরের সার্ভে বিল্ডিংয়ে মনোনয়ন জমা দেবেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। প্রত্যআশিত ভাবেই তাঁর সঙ্গে থাকবেন দলের ‘ওজনদার’ নেতারা। তবে এ বারের মনোনয়নে একটি বিশেষ রাজনৈতিক বার্তা দিতে চলেছেন তৃণমূলের সর্ব্বোচ নেত্রী। ভবানীপুর কেন্দ্রে ‘কসমোপলিটান’ বা ‘বহুত্ববাদী’ চরিত্রকে সামনে রেখে তাঁর মনোনয়নপত্রে প্রস্তাবকদের তালিকায় প্রতিফলিত হবে ভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের বার্তা পৌঁছে দিতে চাইছেন মমতা।
তৃণমূল সূত্রের খবর, প্রস্তাবকদের তালিকায় থাকতে পারেন কলকাতার মেয়র তথা রাজ্যের মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমের স্ত্রী রুবি হাকিম। পাশাপাশিই থাকার কথা ৭১ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল ব্লক সভাপতি বাবলু সিংহ এবং ভবানীপুর এডুকেশন সোসাইটির মীরজ শাহের। অর্থাৎ, বিভিন্ন ভাষাভাষী ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের একত্রিত করেই মনোনয়নপত্র তৈরি করার পরিকল্পনা নিয়েছে তৃণমূল।
ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রটি কলকাতা পুরসভার আটটি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। এই কেন্দ্রে একদিকে যেমন রয়েছে ৭২ এবং ৮২ নম্বর ওয়ার্ডের মতো বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা, তেমনই ৬৩, ৭০, ৭১, ৭৩ এবং ৭৪ নম্বর ওয়ার্ডে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন গুজরাতি, পঞ্জাবি ও মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের মানুষ। ভবানীপুরে জৈন ধর্মাবলম্বীদের উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য। আবার ৭৭ নম্বর ওয়ার্ডে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যাধিক্য। এ ছাড়াও বিহার, ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ড থেকে আসা বহু মানুষের বাস এই কেন্দ্রে। ফলে সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত বৈচিত্র্যে ভরপুর ভবানীপুরকে অনেকে ‘মিনি ইন্ডিয়া’ বলে উল্লেখ করেন। সেই বাস্তবতাকেই এবার রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসাবে তুলে ধরতে চাইছেন মমতা।
তৃণমূল সূত্রের খবর, মনোনয়নের দিন একটি বড় মিছিল করে আলিপুরের সার্ভে বিল্ডিংয়ে পৌঁছোবেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর সঙ্গে থাকবেন তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সী, ফিরহাদ, দক্ষিণ কলকাতা জেলা তৃণমূল সভাপতি তথা রাসবিহারী কেন্দ্রের প্রার্থী দেবাশিস কুমার-সহ ওই এলাকার সমস্ত কাউন্সিলর তথা নেতারা। মিছিলেও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত করার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। লক্ষ্য একটিই, ভোটের আগে ঐক্য ও সম্প্রীতির বার্তা জোরালো ভাবে তুলে ধরা। প্রশ্নের জবাবে মমতার মনোনয়নে তাঁর প্রস্তাবক হওয়ার কথা জানিয়েছেন ৭১ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূলের ব্লক সভাপতি বাবলু। মঙ্গলবার তিনি বলেন, ‘‘আমাদের মুখ্যমন্ত্রী সব ধর্ম-বর্ণ-ভাষার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে চলতে ভালবাসেন। তাই তাঁর মনোনয়নে সেই ছবি দেখা যাবে এটাই প্রত্যাশিত। আমাকে দল নির্দেশ দিয়েছে, মুখ্যমন্ত্রীর প্রস্তাবক হিসেবে মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষর করার। এটা আমার কাছে বিশেষ সম্মানের। আমাদের দল যে লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিয়েছে তাঁর জয়ের জন্য, তা পূরণ করাই আমাদের প্রধান কাজ।’’
তৃণমূলের সর্বোচ্চ নেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতার মনোনয়নে ভবানীপুরে এই প্রতীকী বার্তা ‘তাৎপর্যপূর্ণ’। এই কেন্দ্রের ভোটারদের মধ্যে ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের সংখ্যা বেশি। তাঁদের আবেগ ও পরিচয়কে ছুঁয়েই প্রার্থী হিসাবে নিজের মনোনয়ন জমা দিতে চাইছেন মমতা। অনেকেই মনে করছেন, ভবানীপুরের নির্বাচনে রাজনৈতিক লড়াইয়ের পাশাপাশি বহুত্ববাদ বনাম মেরুকরণও বড় ‘ফ্যাক্টর’ হয়ে উঠছে। মমতার মনোনয়ন সেই বার্তাকেই আরও একবার স্পষ্ট করে তুলে ধরতে চলেছে।