গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
তৃণমূল নামক দলটির কাছে পশ্চিমবাংলা নামক রাজ্যটি একটি ‘কোষ’ হলে অবশ্যই দক্ষিণবঙ্গ সেই কোষের নিউক্লিয়াস। দ্বিতীয় দফায় বুধবার তৃণমূলের সেই নিউক্লিয়াসেই নির্বাচন।
শাসক তৃণমূলের তুলনায় বিজেপির কাছে দক্ষিণবঙ্গ ‘বন্ধ্যা’। তবে পদ্মফুল ফোটাতে বিজেপি-ও নানা ভাবে গত কয়েক বছর ধরে সার-জল দিয়েছে। তারাও জানে, দ্বিতীয় দফায় অনুষ্ঠিতব্য ১৪২টি আসনে ছাপ না-ফেলতে পারলে ইপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছোনো মুশকিল।
বুধবার মোট সাতটি জেলায় ভোটগ্রহণ। এর মধ্যে নদিয়া এবং উত্তর ২৪ পরগনার মতুয়াগড় বাদ দিলে সেই অর্থে বিজেপির শক্তি নেই। বরং তৃণমূলই এ সব জেলায় ‘শেষ কথা’। ২০২১ সালের নির্বাচনে এই সাতটি জেলার মধ্যে পূর্ব বর্ধমান, হাওড়া, কলকাতা এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনায় বিজেপি ছিল শূন্য। তবে গত ভোটেই হুগলিতে প্রথমবার চারটি আসন জিতে নিয়েছিল বিজেপি। নদিয়া এবং উত্তর ২৪ পরগনার মতুয়া অধ্যুষিত আসনগুলিতে যে সাফল্য পদ্মশিবির ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে পেয়েছিল, তাকে মোটামুটি সংহত রাখতে পেরেছিল ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে। ধারা পাল্টায়নি ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটেও। গত বিধানসভা ভোটের হিসাব বলছে, এই সাতটি জেলার ১৪২টি আসনের মধ্যে তৃণমূল জিতেছিল ১২৩টি আসনে, বিজেপির দখলে ছিল ১৮টি এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়ে জিতেছিলেন আইএসএফ-এর নওশাদ সিদ্দিকি। তিনিই ছিলেন বিজেপি ছাড়া বিদায়ী বিধানসভার একমাত্র বিরোধী বিধায়ক।
তবে গত লোকসভা ভোটে তৃণমূলের নিউক্লিয়াসে অল্প হলেও শক্তিবৃদ্ধি হয়েছিল বিজেপির। লোকসভার ফলকে বিধানসভা ওয়াড়ি হিসাবে ফেললে দেখা যাচ্ছে, ১৮ থেকে বেড়ে বিজেপির এগিয়ে থাকা কেন্দ্রের সংখ্যা ছিল ২৭টি। বাকিটা তৃণমূল। এমনকি, শূন্য থাকা কলকাতাতেও জোড়াসাঁকো, শ্যামপুকুরের মতো দু’টি বিধানসভা কেন্দ্রে এগিয়ে ছিল বিজেপি।
সাতটি জেলাতেই নানা সমীকরণ রয়েছে। নদিয়া এবং উত্তর ২৪ পরগনায় যেমন গোটা ১৫ আসনে মতুয়া ভোট গুরুত্বপূর্ণ, তেমন সাতটি জেলাতেই সংখ্যালঘু ভোট বহু কেন্দ্রের ‘নিয়ন্ত্রক’। কলকাতা, উত্তর ২৪ পরগনা, হুগলি, হাওড়া এবং কলকাতা লাগোয়া দক্ষিণ ২৪ পরগনায় অবাঙালি হিন্দু ভোটও রয়েছে। এই সব অংশের মধ্যে ধর্মীয় মেরুকরণের পাশাপাশি ভাষার মেরুকরণের রাজনীতি, বাংলা এবং বাঙালি গরিমার ভাষ্যও রয়েছে। ফলে দ্বিতীয় দফার ভোটে সমীকরণের মধ্যেও বৈচিত্র রয়েছে।
ওজনদারদের লড়াই
শীর্ষে অবশ্যই ভবানীপুর। ২০২৬ সালের ‘নন্দীগ্রাম’ হয়ে উঠেছে ভবানীপুর বিধানসভা। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। পাশের কেন্দ্র রাসবিহারীতেও লড়াই জমজমাট। তৃণমূলের দেবাশিস কুমারের বিরুদ্ধে বিজেপির স্বপন দাশগুপ্ত। রাসবিহারী আসন নিয়ে ভোট ঘোষণার সময় তেমন কোনও তাপ-উত্তাপ ছিল না। কিন্তু তৃণমূল প্রার্থী দেবাশিসের বাড়িতে ইডির হানা, তাঁকে ডেকে পাঠিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা, সোনা পাপ্পুর নাম নিয়ে আলোচনা রাসবিহারীকে গত এক মাসে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। পাশাপাশিই দ্বিতীয় দফায় দুই অভিনেত্রীর লড়াই দেখবে সোনারপুর দক্ষিণ। তৃণমূলের লাভলি মৈত্রের বিরুদ্ধে সেখানে বিজেপি প্রার্থী রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। যুযুধান দুই শিবিরেরই একাধিক তারকা প্রার্থী লড়ছেন দ্বিতীয় দফার বিভিন্ন আসনে। রয়েছেন তৃণমূলের অদিতি মুন্সি, রাজ চক্রবর্তী, সোহম চক্রবর্তী, বিজেপির শর্বরী মুখোপাধ্যায়, পাপিয়া আধিকারীরা। অরূপ বিশ্বাস, ফিরহাদ হাকিম, ব্রাত্য বসু, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, বেচারাম মান্না, ইন্দ্রনীল সেন, পুলক রায়, অরূপ রায়, সিদ্দিকুল্লা চৌধুরীর মতো মন্ত্রীদের কেন্দ্রেও ভোট বুধবারই। বামেদের উল্লেখযোগ্য মুখ বলতে উত্তর দমদমে দীপ্সিতা ধর এবং উত্তরপাড়ায় মিনাক্ষী মুখোপাধ্যায়। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার লড়ছেন হুগলির শ্রীরামপুর আসন থেকে।
এসআইআর
প্রথম দফায় ১৫২টি আসনে ভোটগ্রহণ হয়েছিল। ১৬টি জেলায় বিস্তৃত সেই ১৫২টি আসনে এসআইআর-এর ফলে নাম বাদ গিয়েছে ৪০ লক্ষ ৪৬ হাজার। দ্বিতীয় দফায় জেলার সংখ্যা ৭টি। আসন সংখ্যা ১৪২। অর্থাৎ প্রথম দফার থেকে ১০টি কম। কিন্তু এই ১৪২ কেন্দ্রে এসআইআর-এর ফলে নাম বাদ পড়েছে ৫০ লক্ষ ৩৬ হাজার। তার মধ্যে দুই ২৪ পরগনার ৬৪টি আসনেই নাম বাদ প়ড়েছে প্রায় ২৩ লক্ষ। এ বারের ভোটে এসআইআর-এর ফলে নাম বাদ যাওয়া ফলাফলের ক্ষেত্রে অন্যতম সূচক হতে চলেছে বলে অনেকেরই অভিমত। সে দিক থেকে দ্বিতীয় দফার ভোট প্রথম দফার থেকেও তৃণমূলের কাছে বেশি ‘তাৎপর্যপূর্ণ’।
মতুয়া ভোট
২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচন থেকেই বনগাঁ এবং রানাঘাট আসন বিজেপির দখলে। বিধানসভা ভোটেও তার অন্যথা হয়নি। বিজেপির কাছে যেমন এ বারও মতুয়াগড় ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তেমনই তৃণমূলও বাগদা, বনগাঁ, রানাঘাট, হরিণঘাটা, চাকদহ-সহ বিভিন্ন এলাকায় পা জমাতে মরিয়া। শাসকদলের প্রার্থী চয়নেও সেই অভিমুখ স্পষ্ট। মতুয়া অধ্যুষিত এলাকায় বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলির প্রভাব রয়েছে। তেমনই এসআইআরের ফলে বহু লোকের নাম বাদও গিয়েছে। নাগরিকত্ব-সহ একাধিক বিষয়ে বিজেপির প্রতিশ্রুতি পূরণ না করার আখ্যান তুলে ধরে প্রচার করেছে তৃণমূল। মতুয়া রাজনীতির আঁতুড়ঘর ঠাকুরবাড়িতেও দুই ফুলের আড়াআড়ি বিভাজন রয়েছে। বিজেপির দিকে শান্তনু ঠাকুর, সুব্রত ঠাকুরেরা। আবার তৃণমূলের দিকে রয়েছেন মমতাবালা ঠাকুর, মধুপর্ণা ঠাকুর। তবে ভোটারকুলের মধ্যে গত তিনটি বড় ভোটেই বিজেপির প্রভাব ছিল।
সংখ্যালঘু ভোট এবং নওশাদ
দ্বিতীয় দফায় ভোট হতে চলা সাতটি জেলাতেই মুসলিম ভোট গুরুত্বপূর্ণ। এই ১৪২টি আসনের এক-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে সংখ্যালঘু ভোট নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা নিয়ে থাকে। ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচন থেকে গত ১৭ বছর ধরে যে ভোটে তৃণমূলের একচেটিয়া আধিপত্য। এই সাত জেলায় যেমন বাংলাভাষী সংখ্যালঘুদের বিন্যাস রয়েছে, তেমনই অবাংলাভাষী মুসলিমের সংখ্যাও কম নয়। কলকাতা, হাওড়া, হুগলি এবং ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলেও বিপুল সংখ্যক অবাংলাভাষী মুসলিম ভোট রয়েছে। তবে পূর্ব বর্ধমান, দুই ২৪ পরগনা, হাওড়া এবং হুগলির বহু কেন্দ্রে বাঙালি মুসলিমদের মধ্যে নওশাদ সিদ্দিকির দল আইএসএফ-এর প্রচারে ভিড় হয়েছে চোখে প়ড়ার মতো। ২০২১ সালের নির্বাচনের ঠিক আগেই তৈরি হয়েছিল আইএসএফ। ফুরফুরা শরিফের পিরজাদাদের দলের সেই কর্মসূচিতে ভিড় হলেও তা ভোটবাক্সে প্রতিফলিত হয়নি। তবে পাঁচ বছর পরে পরিস্থিতি বদলেছে। ভাঙড়ের বিধায়ক হিসাবে নওশাদ যে রাজনৈতিক ভাষ্য নির্মাণ করেছেন, তাতে ধর্মের থেকে সবসময়ই এগিয়ে থেকেছে রুটি-রুজি-কর্মসংস্থানের প্রসঙ্গ। এ বারেও বামেদের সঙ্গে জোট করে লড়ছেন নওশাদ। উত্তর দমদম, মধ্যমগ্রাম, খড়দহ, বাদুড়িয়া, স্বরূনগর, কুলতলি, রায়দিঘীর মতো এলাকায় সাত সকাল হোক বা মধ্যরাত— ভাইজানের কর্মসূচিতে উপচে পড়েছে ভিড়। যদিও তৃণমূলের প্রথম সারির নেতারা মনে করছেন, বিজেপি সংখ্যালঘুদের যে বিপন্ন জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে, সে কথা মাথায় রেখেই ভোট দেবেন তাঁরা। ভোট ভাগের বিলাসিতা দেখাবেন না। অন্য শিবিরে লোক হলেও মুসলিম ভোট দিদির বাক্সে পড়বে বলেই মনে করছে শাসকদল।
শহর-শহরতলির নাগরিক আন্দোলন
এই সাত জেলায় ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে জয়ের ধারা মোটামুটি ধরে রাখতে পেরেছিল তৃণমূল। কিন্তু দেখা গিয়েছিল, শহরাঞ্চলে জনসমর্থন কিছুটা আলগা হয়েছে তাদের। গত লোকসভায় রাজ্যের ৭৭টি পুর এলাকায় বিজেপির থেকে পিছিয়ে ছিল তৃণমূল। আবার ভোট মেটার দু’মাসের মধ্যেই আরজি কর-কাণ্ডের অভিঘাতে শহর এবং শহরতলি দেখেছিল অভূতপূর্ব নাগরিক আন্দোলন। যেখানে মহিলাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল দেখার মতো। ঘটনাচক্রে, আরজি করের নির্যাতিতার মা বিজেপির টিকিটে পানিহাটি থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। যদিও নাগরিক আন্দোলনের সঙ্গে বিজেপির খুব একটা যোগ ছিল না। বরং নেপথ্যে থেকে অনেক বেশি সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিল বামেরা। তৃণমূলের অভিমত, সেই আন্দোলন ছিল নির্দিষ্ট ঘটনার প্রতিবাদ। তাতে সরকার-বিরোধিতা ছিল না। যদিও অনেকের বক্তব্য, আরজি কর আন্দোলনের সময়েই প্রশাসক মমতাকে প্রথম স্থিতাবস্থা-বিরোধিতার তীব্রতার আঁচ পেতে হয়েছিল। তবে এ-ও ঠিক যে, মাস দুয়েকের মধ্যেই সেই আন্দোলন ধীরে ধীরে স্তিমিত হতে শুরু করেছিল। সেই আগুন কি এখনও ধিকিধিকি জ্বলছে? সে জবাবও মিলতে পারে দ্বিতীয় দফার ভোটে।