West Bengal Assembly Election 2026

মাস্টার প্ল্যান থেকে স্বর্ণ হাব, ঘাটাল থেকে যায় অবহেলিত

শিয়রে ভোট। কী পরিস্থিতি জেলায় জেলায়? খোঁজ নিল আনন্দবাজার।

নীলোৎপল বিশ্বাস
শেষ আপডেট: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:৪৪
তৈরি হওয়ার পর থেকে বন্ধই দাসপুরের স্বর্ণ হাব।

তৈরি হওয়ার পর থেকে বন্ধই দাসপুরের স্বর্ণ হাব। — নিজস্ব চিত্র।

বর্ষা আসতে ক’দিন? ভোটের ফল প্রকাশের দিন নয়, ঘোর নির্বাচনী হাওয়াতেও বর্ষার অপেক্ষায় এ তল্লাটের বেশির ভাগ মানুষ। আশ্বাস পূরণ না হওয়ার রোজনামচায় ভোটের প্রশ্ন শুনলেই রেগে উঠছেন কেউ কেউ। বলছেন, ‘‘ভোট তো কয়েক দিনের ব্যাপার। মাস্টার প্ল্যানের স্বপ্ন দেখিয়ে আমাদের নিয়ে বছরভর শুধু রাজনীতিই হয়। বর্ষা এলেই দেখা যাবে, জল-যন্ত্রণা কাটল না!’’

ঘাটাল শহরের কুশপাতা মোড়ের কাছে যেখানে কথা হচ্ছিল, সেখানেই কিছু ক্ষণ আগে ঘুরে গিয়েছেন তৃণমূলের তারকা প্রচারক,ঘাটালের সাংসদ দীপক অধিকারী (দেব)। মিছিলের মাঝে তিনি বলেছেন, ‘‘ঘাটালের জন্য লড়াই করে টাকা বরাদ্দ করিয়েছি আমি। যাঁরা টাকা বরাদ্দ করালেন, যাঁরালড়াই করে ঘাটালের মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়িত করালেন, দেখবেন, তাঁরা যেন হেরে না যান। তাঁরা হেরে গেলে কিন্তু রাজনীতি জিতে যাবে।’’ কুশপাতা মোড়ের চায়েরদোকানদার রতন ঘড়াইয়ের প্রশ্ন, ‘‘রাজনীতি ছাড়া আর কী হচ্ছে? মাস্টার প্ল্যানের জন্য টাকা বরাদ্দের ঘোষণা হল। কিন্তু দেওয়ার বেলা টাকা দেওয়া হচ্ছে কোথায়? নবান্নে তো ফাইল পড়েই থাকছে। ঘাটালের মূল সমস্যা সেই উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে।’’

এই তল্লাটে ঘুরলেই শোনা যায়, ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের কাজের নামে নদী-খালের ড্রেজ়িং (পলি তোলা) শুরু করা ছাড়া কিছুই হয়নি। পলি তোলার সেই কাজেও গতি নেই। এর মধ্যেই তৈরি হয়ে গিয়েছেএকাধিক জটিলতা। অভিযোগ, বাহুবল কাজে লাগিয়ে নদীর পাড়ে জবরদখল করে চাষ শুরু হয়ে গিয়েছে। সামনে আসছে ড্রেজ়িংয়ের সময়ে মাটি চুরির অভিযোগও। মাটি নিয়ে আসা লরির ভারে রাস্তা ভেঙে যাওয়ার ঘটনার প্রতিবাদে আবারইতিমধ্যেই পথে নেমেছেন এই এলাকার মানুষ। তা ছাড়া, একাধিক প্রস্তাবিত প্রকল্প রিপোর্ট (ডিটেলড প্রজেক্ট রিপোর্ট) অনুমোদনের জন্য জমা পড়লেও কাজ শুরুর সবুজ সঙ্কেত আসেনি। মঞ্জুর হয়নি অর্থ। তার জেরে থমকে প্রথম দফার প্রস্তাবিত যাবতীয় কাজ। পাম্প হাউস তৈরির কথা থাকলেও সে জন্য জমি কেনা যাচ্ছে না। শিলাবতী নদীর পশ্চিম পাড়ে দীর্ঘ ডোয়ার্ফ বাঁধ, ৩১টি স্লুস গেট নির্মাণ-সহ একাধিক প্রস্তাবিত কাজও থমকে।

রতন কোলে নামে ওই এলাকার এক বাসিন্দার মন্তব্য, ‘‘পলি তোলা তো নো কস্টিং কাজ। সরকারের কোনও টাকা খরচ হয় না, বরাতপাওয়া সংস্থা মাটি তুলবে, বিক্রি করে টাকা নেবে। প্রথম দফায় বরাদ্দ ৫০০ কোটি টাকার মধ্যে ৩০ কোটিও খরচ হয়েছে কিনা সন্দেহ। এর মধ্যেই আর টাকা দিতে পারছে না। মাস্টার প্ল্যান হবে কিসে? বরাদ্দ হওয়া বাকি ৪৭০ কোটি টাকারই বা কী হল?’’

স্থানীয়দের অভিযোগ, একই রকম ভাবে ভোটে উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে ঘাটালের রেলপথ। ২০০৯ সালে পাঁশকুড়া-ঘাটাল এবং ২০১০-১১ সালে আরামবাগ-ইড়পালা-ঘাটাল রেলপথ তৈরির ঘোষণা হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এ নিয়ে আন্দোলনে নামা ফোরাম ‘বিদ্যাসাগর রেলপথ মিশন’-এর সভাপতি প্রসেনজিৎ কাপাসের দাবি, ‘‘ট্রেন ধরতে ঘাটালের মানুষকে হয় ৩৪ কিলোমিটার দূরের পাঁশকুড়া, নয়তো ৩৫ কিলোমিটার দূরের চন্দ্রকোনা রোডে যেতে হয়। অথচ রেলপথ হলে শুধু এই মহকুমা এলাকার মানুষই নয়, উপকৃত হবেন পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ৭টি ব্লক— ঘাটাল, দাসপুর-১ ও ২, চন্দ্রকোনা-১ ও ২, কেশপুর এবং ডেবরার মানুষ। এ ছাড়াও পূর্ব মেদিনীপুরের ৪টি ব্লক— পাঁশকুড়া-১, কোলাঘাট, ময়না এবং তমলুকের মানুষেরও সুবিধা হবে। কিন্তু রেল ভবনে খোঁজ করে জেনেছি, রেলের এই প্রকল্প ঠান্ডা ঘরে চলে গিয়েছে। ঠান্ডা ঘর থেকে প্রকল্প বাইরে আসবে কী করলে, সেই উত্তরও দিতে পারছেন না ভোট চাইতে আসা লোকজন।’’

অভিযোগ, জীবন বদলের আশ্বাস বাস্তবায়িত হয়নি দাসপুরের স্বর্ণশিল্পীদের ক্ষেত্রেও। সোনার অলঙ্কারের হাব তৈরির ঘোষণা হয়ে যাওয়ার পরে তিন বছরকেটে গিয়েছে। এক বছর আগে হাবের ভবনও উদ্বোধন হয়ে গিয়েছে। সেই সময়ে তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে প্রচার করা হয়েছিল, ভিন্‌ রাজ্যে কাজে গিয়ে শুধু বাঙালি বলে এই এলাকার স্বর্ণশিল্পীরা আক্রান্ত হচ্ছেন। অত্যাচারের দিন শেষ হবে।তাঁরা যাতে রাজ্যে ফিরে আসতে পারেন, সেই কারণেই প্রায় আট কোটি টাকা খরচ করে এই হাব তৈরির উদ্যোগ।

কিন্তু উদ্বোধনই সার, তালাবন্ধই পড়ে রয়েছে সেই ভবন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, বন্ধ পড়ে থাকা এই ভবনের সামনেই সভা-সমাবেশ চলছে। সব পক্ষই এইসোনার অলঙ্কারের হাব সামনে রেখে রাজনীতি করছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, ভবন খুললেও কি লাভ হবে? এখানে সোনার অলঙ্কার তৈরি হলেও বিক্রি করার মতো বাজার কোথায়? এই ভবনে বসে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় স্বর্ণশিল্পীদের নিরাপত্তাই বা কোথায়?

এই এলাকার বাসিন্দা বৃদ্ধ বিমল ঘোষের মন্তব্য, ‘‘পরিযায়ী শ্রমিক স্বর্ণশিল্পীদের ঘরে ফেরানোর স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। কিন্তু তাঁরা ফিরতে পারেননি। ফিরেই বাকী হবে? এখানে সোনার নিরাপত্তা কোথায়? গয়না তৈরি হলেও বিক্রির বাজার কোথায়? আমার ছেলেকেও ফিরে আসতে বলতে পারিনি। বাচ্চা-বাচ্চা ছেলেগুলোকে দেখছি, সোনার হাতে এখন টোটো চালাচ্ছে!’’

আরও পড়ুন