WB Assembly Elections 2026

কারখানা বন্ধ, খাদানে সঙ্কট, তাঁতে মন্দা: রুজির সঙ্কটে তিন বিধানসভা

শিয়রে বিধানসভা ভোট। কী পরিস্থিতি জেলায় জেলায়? খোঁজ নিল আনন্দবাজার।

সুব্রত সীট
শেষ আপডেট: ১১ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:১১

— প্রতীকী চিত্র।

নামেই শিল্পাঞ্চল। বাস্তবে একের পর এক কারখানায় ঝাঁপ পড়েছে, কোথাও বা কোনও মতে চলছে উৎপাদন। কর্মসংস্থানের সুযোগ ক্রমশ সঙ্কুচিত। বাঁকুড়ার বড়জোড়া, শালতোড়া আর সোনামুখী— তিন বিধানসভা কেন্দ্র জুড়ে ভোটের আলোচনার কেন্দ্রে এখন শিল্পের মন্দা আর রোজগারের অনিশ্চয়তা। এর মধ্যে বড়জোড়া কেন্দ্র ছিল তৃণমূলের দখলে। শালতোড়া ও সোনামুখী বিজেপির।

বড়জোড়া শিল্পাঞ্চলে প্রায় ৩০-৩৫টি ইস্পাত, ধাতব ও অনুসারী কারখানা রয়েছে। তার মধ্যে বেশ কয়েকটি কার্যত বন্ধ। ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল আয়রন অ্যান্ড স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর সভাপতি শঙ্করলাল আগরওয়াল জানালেন, লৌহ আকরিকের ঘাটতি, বিদ্যুতের মাসুল বৃদ্ধি এবং বাজারের অনিশ্চয়তার জেরে অনেক কারখানাই এখন খাতায়-কলমে চালু। কাজ হারিয়েছেন কয়েক হাজার শ্রমিক।

এলাকায় দু’টি খোলা-মুখ খনি থাকলেও পিডিসিএলের নর্থ কোলিয়ারিতে জমি-জটে উৎপাদন কার্যত থমকে। দুর্গাপুর প্রজেক্টস লিমিটেডের ট্রান্স দামোদর খনিতে কাজ চললেও দু’টি খনি মিলিয়েও স্থানীয় স্তরে কর্মসংস্থান সীমিত। মাত্র হাজারখানেক মানুষ সেখানে ঠিকা শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। মাসিক আয় মাত্র ১৫৮০০ টাকা।

খনির বিস্ফোরণে বাড়িতে ফাটল ধরা নিয়েও ক্ষোভ বাড়ছে। চুনপোড়ার বাউড়িপাড়ায় ১০৩টি পরিবারের প্রায় সব বাড়িতেই ফাটল দেখা দিয়েছে। পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া শুরু হলেও বাসিন্দাদের দাবি, দীর্ঘ আন্দোলনের পরেই তা সম্ভব হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা রঘুনাথ বাউড়ির কথায়, “অনেক লড়াইয়ের পরে পুনর্বাসন মিলেছে। আমাদের পাশে সিপিএম ছিল।” এলাকার প্রাক্তন বিধায়ক তথা এ বারের সিপিএম প্রার্থী সুজিত চক্রবর্তী বলেন, “কারখানা বন্ধ, কাজ নেই। বিকল্প রোজগারেরও সুযোগ নেই। উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতেই হবে।” বিজেপি প্রার্থী বিল্লেশ্বর সিংহের দাবি, তাঁরাও বরাবর এই দাবিতে সরব।

চুনপোড়া গ্রামে প্রায় ১৮২টি পরিবারের বাস। খনি কার্যত বাড়ির পাঁচিল ছুঁয়ে ফেলেছে। দেওয়ালে লম্বা ফাটল, কুয়োর জলস্তর নেমে যাওয়া, বৃষ্টি হলেই জল জমে থাকা— নানা সমস্যায় জর্জরিত বাসিন্দারা। বিশ্বনাথ কাড়া, উত্তম কাড়াদের কথায়, “বিস্ফোরণের সময়ে মনে হয়, বাড়িটাই ভেঙে পড়বে। বর্ষায় জল জমে, সাপ ঢুকে পড়ে ঘরে।” পুনর্বাসনের জন্য ক্ষতিপূরণ নিয়ে সমঝোতা হলেও চাকরির দাবি এখনও পূরণ হয়নি। তৃণমূল প্রার্থী গৌতম মিশ্র ভোটের পরে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন।

শালতোড়ায় কয়েক হাজার পরিবার নির্ভর করে পাথর খাদান ও ক্রাশার (পাথর ভাঙার কল) শিল্পের উপরে। কিন্তু কাঁচামালের অভাবে মাঝেমধ্যে কাজ বন্ধ রাখতে হচ্ছে বলে জানাচ্ছেন একাধিক ক্রাশার মালিক। এলাকায় চারটি বৈধ খাদান থাকলেও তা চাহিদা মেটাতে পারছে না। সেই ঘাটতি পূরণ করছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অবৈধ খাদান। শালতোড়া বাজার থেকে ধোতলা যাওয়ার রাস্তায় তেমনই একটি খাদান ‘সিন্ডিকেট’ গড়ে চালাচ্ছেন এলাকার কিছু যুবক। তাঁদেরই এক জন বললেন, “বিএ পাশ করেও চাকরি পাইনি। হাতে বিকল্প কিছু নেই। সংসার চলে না। কিছু রোজগার হচ্ছে এ ভাবে।’’

‘শালতোড়া ক্রাশার ওনার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন’-এর প্রাক্তন সভাপতি কৈলাস মিশ্র জানালেন, এলাকায় মোট ২২০টি ক্রাশারের মধ্যে চালু রয়েছে প্রায় ১৫০টি। কাঁচামালের অভাবে বহু ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাজ হারিয়ে অনেকেই ভিন্‌ রাজ্যে পাড়ি দিয়েছেন। তাঁর দাবি, “বৈধ খাদান অনেক বাড়াতে হবে। সরকার অবৈধ খাদান বৈধ করার কথা ভাবতে পারে। তাতে রাজস্ব আসবে, কর্মসংস্থানও হবে। ক্রাশারেও কাঁচামালের জোগান বাড়বে।”

এই কেন্দ্রে বিজেপির প্রার্থী, বিদায়ী বিধায়ক চন্দনা বাউড়ির অভিযোগ, তাঁর মেয়াদকালে একাধিক খাদানকে অবৈধ ঘোষণা করে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে, পাথরের জোগান কমে গিয়ে বহু ক্রাশার বন্ধ হয়ে যায় এবং কাজ হারান অনেকে। তাঁর দাবি, তৃণমূল পঞ্চায়েত ও লোকসভা নির্বাচনে খাদান চালুর আশ্বাস দিয়ে ভোট পেলেও বাস্তবে তা হয়নি। ব্লক তৃণমূল সভাপতি সন্তোষ মণ্ডল পাল্টা জানান, ইতিমধ্যেই ১৪টি খাদানের ই-টেন্ডার হয়েছে, যার মধ্যে ছ’টির কাজ শুরু হয়েছে। সব ক’টি চালু হলে কাঁচামালের সমস্যা অনেকটাই কাটবে। সিপিএম প্রার্থী নন্দদুলাল বাউরির মতে, “শালতোড়ার অর্থনীতিতে খাদান ও ক্রাশার গুরুত্বপূর্ণ। রুটি-রুজির প্রশ্নে আমরা মানুষের পাশে আছি।”

অন্য দিকে, সোনামুখীতে বালুচরি শাড়ি শিল্পেও ভাটা পড়েছে। রতনগঞ্জ এলাকার তাঁতি রাজু সু জানান, কাঁচামালের দাম বাড়লেও শাড়ির দাম সেই অনুপাতে বাড়েনি। এক সময়ে ইরান, আফগানিস্তান-সহ নানা দেশে পাগড়ির কাপড় রফতানি হত। এখন তা বন্ধ। তাঁর কথায়, “সরকারি সহযোগিতা তেমন পাই না, বিকল্প রোজগারও নেই।”

অনেকেই তাই তাঁত ছেড়ে অন্য পেশায় যাচ্ছেন। সদানন্দ সু এখন বাড়ি বাড়ি রান্না করা খাবার পৌঁছে দেন। তাঁর স্ত্রী ঝুমা রান্না করেন, আর তিনি তা প্রায় ৪০টি বাড়িতে সরবরাহ করেন। সদানন্দের কথায়, “আগে ক্লাস্টারের মাধ্যমে মেলায় শাড়ি পাঠানো হত, এখন সেটাও বন্ধ।’’

তৃণমূলের সোনামুখী শহর সভাপতি তপনজ্যোতি চট্টোপাধ্যায় দাবি করেন, রাজ্য সরকার সাধ্য মতো তাঁতিদের পাশে রয়েছে, তবে কেন্দ্রের সহযোগিতাও প্রয়োজন। বিজেপির বিদায়ী বিধায়ক দিবাকর ঘরামির অভিযোগ, বিরোধী বিধায়ক হওয়ায় তিনি রাজ্যের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাননি। সিপিএম প্রার্থী অজিত রায়ের দাবি, “তৃণমূল ও বিজেপি—কেউই শ্রমজীবী মানুষের কথা ভাবে না।”

ফলে শুধু উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি নয়, রোজগারের নিশ্চয়তার দাবিতে এ বার ভোট দেবে এই তিন বিধানসভা কেন্দ্র।

আরও পড়ুন