তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। —ফাইল চিত্র।
মমতা বলেন, “এখানে বিজেপির বড় নেতা, জ়েড প্লাস নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। হরিদাস। এক এক জন ২০-২৫টা সেন্ট্রাল ফোর্স নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। বাড়ি থেকে বেরোলে কেউ তাকিয়েও দেখে না। গুন্ডামি করছে সেন্ট্রাল ফোর্সকে সাথে নিয়ে। তাদের নিরাপত্তা প্রত্যাহার করে না, শুধু তৃণমূলের। ক’টা বিজেপির (নেতার) বাড়ি তল্লাশি হয়েছে আমি জানতে চাই।”
মমতা বলেন, “সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে লড়াই করে আমি ৩২ লক্ষ নাম তুলেছিলাম। গতকাল কোর্ট অর্ডার দিয়েছে, বাকিগুলো ট্রাইবুনালে বিচার হবে। যাদের নাম উঠে যাবে, তারা যেন ভোটার লিস্ট পায়— ওই দিন রাতে নজর রেখো। ভোটার স্লিপ এক্সট্রা করে রেখো।”
মমতা বলেন, “গণনায় এই সাত-আটদিন যাঁদের পাহারা দিতে বসাবেন, তাঁরা যেন টাকায় বিক্রি না হন। অনেক টাকা নিয়ে নেমেছে। কাউকে হয়তো ৫-১০ লক্ষ টাকাও দিচ্ছে।”
দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে মমতা বলেন, “ভোটের দিন আমাদের শক্ত ঘাঁটিগুলিতে পুনর্নির্বাচন করার জন্য ওরা অনেক বদমায়েশি করবে। রিপোলের জন্যও রেডি থাকতে হবে। ভাল করে ভোট করবেন। রিপোল করলে করবেন। যে মানুষ আমাকে আজ ভোট দিয়েছেন, কালও দেবেন।”
বিজেপি-কে বিঁধে মমতা বলেন, “পোলিং এজেন্ট নেই। এজেন্সি দিয়ে ভয় দেখাচ্ছ।” এর পরে দলের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, “ওরা যে অবস্থায় গিয়েছে, ওরা পার্টি অফিসও চেক করতে পারে। মানে শেষ মরণকামড়। ওই মরণকামড়ের বিষটা ভেঙে দিতে হবে। ওর কোনও ভ্যালু নেই। ভোটের পরে জ়িরো। এখন সব দেখাচ্ছে। ভোটের আগে ইডি-টিডি, সিবিআই-টিবিআই করে। তার পরে আজ পর্যন্ত কোনও কেস ফয়সলা করতে পারে না। নির্লজ্জ। ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। আমি যদি ভয় না পাই, আপনারা কেন ভয় পাবেন!”
মমতা বলেন, “দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না-থাকলে সংবিধান সংশোধন বিল পাশ করানো যায় না। আরে তুমি মেয়েদের ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণের সঙ্গে ডিলিমিটেশন ঢুকিয়ে দিয়েছ ? আমার পার্টির তো ৩৭ শতাংশ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি আছে। করে দেখাও। তোমার পার্টির মেয়েদের আগে জিতিয়ে দেখাও। টিকিট দিয়ে দেখাও।”
মমতা বলেন, “ইলেকশন আসলেই ভোট দাও, ভোট দাও। ইডি আছে, সিবিআই আছে, ইনকাম ট্যাক্স আছে, সেন্ট্রাল ফোর্স আছে। সকলকে একপক্ষ করে দিয়েছে। কোনও দিন এ জিনিস আমি দেশে দেখিনি।” তৃণমূলনেত্রী আরও বলেন, “দিল্লি থেকে এল গাই, সাথে এল মোটা ভাই, নিয়ে এল ইডি-সিবিআই।”
বিজেপি-কে বিঁধে মমতা বলেন, “পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে দেখে দেখে ভোট কাটেন। রাজবংশীদের ভোটও কেটেছেন। মতুয়াদেরও ভোট কেটেছেন। এনআরসি-র নোটিস পাঠিয়েছে আমার রাজবংশী ভাইবোনেদের।”
মমতা বলেন, “গণতন্ত্র বুলেট নয়, ব্যালট। এটা মাথায় রাখবেন। গণতন্ত্রে বন্দুক নয়, ভোট হচ্ছে আসল ক্ষমতা। ভারতের সংবিধান বলেছে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা, সকলের সমান অধিকারের কথা।”
মমতা বলেন, “ভোটার তালিকা থেকে কোচবিহারে প্রায় দুই-আড়াই লক্ষ নাম বাদ দিয়েছে। ওরা জানে মানুষের ভোটে জেতার ক্ষমতা নেই। তাই সেন্ট্রাল ফোর্স, ইনকাম ট্যাক্স, ইডি, সিবিআই, পুরো ভারত সরকার, বিজেপির সব রাজ্যের সকলে এসে বসে গিয়েছে। তা-ও দেখুন লড়াই করছি একা। কিন্তু আমি একা নই। আমার সঙ্গে ১০০ ভাগ মানুষ আছে।”
বিজেপি-কে বিঁধে মমতা বলেন, “তোমরা মাছেভাতে বাঙালির মাছ খাওয়া বন্ধ করে দিচ্ছ। মাংস, ডিম খাওয়াও বন্ধ করে দিচ্ছ। তা হলে মানুষ কী খাবে! আমার মাথা না তোমার মাথা? মাথা চিবিয়ে খাবে?”
মমতা বলেন, “ফর্ম ফিলআপের নাম করে বাইরের সংস্থাকে ভাড়া করেছে। তারা আপনার বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফর্ম ফিলআপ করছে। বলছে টাকা পাবেন। আপনার নাম, পরিবারের নাম, ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট নম্বর নিচ্ছে। ওদের কথায় বিশ্বাস করবেন না। মতুয়াদের এই ভাবে সর্বনাশ করেছিল। কী করেছিল জানেন? ওদের একটা ফর্ম লিখিয়েছিল। ভোটাধিকার কোথা থেকে নাগরিকত্ব এসে গেল? এটা সিএএ-র নাম আরেকটা ভাঁওতা।”
মমতা বলেন, “বিজেপি সব জায়গায় কিছু নির্দল প্রার্থী দাঁড় করিয়েছে টাকা দিয়ে দিয়ে। এদের চিনে রাখুন। বিজেপির সঙ্গে এরা আরেকটা করে গদ্দার।”
মমতা বলেন, “সবাই মাথানত করে, আমরা করি না। আমাদের উপর অনেক অত্যাচার, জুলুম চলছে। আমি এমন নির্বাচন কোনও দিন দেখিনি। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের সব ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে বাইরের ফোর্সকে দিয়ে… মনে আছে আপনাদের শীতলখুচিতে গুলি চালিয়ে দিয়েছিল ভোটের সময়? চার জনকে হত্যা করেছিল। আমি তার পরে ছুটে এসেছিলাম। সেই সব করার ধান্দাবাজি।”
কেন্দ্রের নতুন বিল নিয়ে মমতা বলেন, “মহিলাটা (মহিলাদের বিষয়টি) সামনে। মিথ্যা কথা। দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাগে পাশ করতে। পুনর্বিন্যাস বিল নিয়ে এসেছে। এর জন্য আমাকে ২১ জন সাংসদকে পাঠাতে হয়েছে লোকসভায়। নিজেরা জানে হারবে। ৫৪১ আসন আছে। ওটা ৮৫০-র কাছাকাছি নিয়ে যাবে বলে টুকরো টুকরো করছে আবার দেশটাকে। একদিন দেখবেন কোচবিহার, উত্তর দিনাজপুর, দার্জিলিং, শিলিগুড়ি হারিয়ে গিয়েছে। এদের লজ্জা, ঘৃণা, ভয় নেই।”
মমতা বলেন, “আজ কালো টাকার হুন্ডি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে বসে আছেন। আর তৃণমূল কংগ্রেসের পার্টি অফিসে হানা দিচ্ছেন। প্রার্থীর বাড়িতে গিয়ে হানা দিচ্ছেন। আমার প্লেনে হানা করছেন। আমার নিরাপত্তাকর্মীদের উপর হানা দিচ্ছেন। নির্লজ্জ বেহায়া একটা রাজনৈতিক দল। সামনাসামনি লড়াই করতে পারেনা। ভিতু। কাপুরুষ। ওদের বিসর্জন দিন।”
মোদীকে বিঁধে মমতা বলেন, “একটা কথা বলার আগে বার বার করে ক্রসচেক করবেন। পার্টি যা শিখিয়ে দিচ্ছে, ইলেকশনের স্বার্থে সেটাই বলে দিচ্ছেন! এত মিথ্যের ফুলঝুরি মানুষ সহ্য করবে না।”
মোদীকে আক্রমণ করে মমতা বলেন, “কিছুদিন আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মিটিং করে বলে গেলেন, উত্তরবঙ্গ উন্নয়নে কিছু হয়নি। আমি বলি আপনি প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসে আছেন। বেশিদিন থাকবেন না। কিন্তু যে ক’দিন আছেন দয়া করে মিথ্যা কথা কম বলুন। উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দফতর একটা ছোট্ট দফতর। এটার সঙ্গে উন্নয়নের সম্পর্ক সীমাবদ্ধ জায়গায়। আমরা উত্তরবঙ্গের জন্য ১ লক্ষ ৭২ হাজার কোটি টাকা খরচ করেছি। আপনার মুখের উপর জবাব দিয়ে যাচ্ছি।”
কোচবিহারের সভাস্থলে পৌঁছোলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
শুক্রবার কোচবিহার উত্তরের তৃণমূল প্রার্থী পার্থপ্রতিম রায় এবং কোচবিহার দক্ষিণের প্রার্থী অভিজিৎ দে ভৌমিকের সমর্থনে জনসভা করবেন মমতা। তৃণমূলনেত্রী সভাস্থলে পৌঁছোনোর আগে থেকেই কোচবিহারের রাসমেলা ময়দানে ভিড় জমতে শুরু করেছে তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকদের।