রায়গঞ্জের জনসভায় কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। ছবি: সংগৃহীত।
রাহুল বলেন, “বিজেপি হিংসা ছড়ায়। ওদের প্রধানমন্ত্রী ‘কম্প্রোমাইজ়ড’। ওদের নিয়ে তো কথাই বলব না। অন্য দিকে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জন্য পথ খুলে দিচ্ছে তৃণমূল। কারণ, তৃণমূল নিজের কাজ করলে, আপনাদের আয়ের ব্যবস্থা করলে, হিংসা না ছড়ালে এখানে বিজেপি-কে দেখাই যেত না।”
রায়গঞ্জের সভা থেকে প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সির কথা উল্লেখ করেন রাহুল। তিনি বলেন, “এটা প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সির কর্মভূমি। তিনি পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের সবচেয়ে বড় নেতা ছিলেন। আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, তাঁর মৃত্যু না হলে আজ পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের সরকার হত এবং প্রিয়রঞ্জনজি মুখ্যমন্ত্রী হতেন।”
রাহুল বলেন, “পশ্চিমবঙ্গ আগে শিল্পের কেন্দ্র ছিল। বামপন্থীরা এবং তার পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের পুরো শিল্পকে নষ্ট করে দিয়েছেন। আমরা যদি হিংসার কথা বলি, মহিলাদের উপর অত্যাচারের কথা বলি, তা হলে আরজি করে ধর্ষণ এবং খুনের কথাও বলতে হবে। পশ্চিমবঙ্গে কোনও দায়বদ্ধতা নেই। তৃণমূলের গুন্ডারা যা করতে চায়, তা-ই করতে পারে। এখানকার কংগ্রেস নেতা তপন কুন্ডুকে খুন করেছে। বিজেপি এবং তৃণমূল উভয়েই হিংসা ছড়ায়। কংগ্রেস হিংসার বিরুদ্ধে। আমরা হিংসা ছড়াই না। আমরা জাতপাতের ভিত্তিতে, ধর্মের ভিত্তিতে কখনও অশান্তি পাকাই না।”
রাহুল বলেন, “২০২১ সালে তৃণমূল পশ্চিমবঙ্গবাসীকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ৫ লক্ষ লোকের রোজগারের ব্যবস্থা করবে। কত জনের রোজগারের ব্যবস্থা হয়েছে? কত সংস্থা বন্ধ হয়েছে? কত কারখানা বন্ধ হয়েছে? এখন ৮৪ লক্ষ যুবক বেকার ভাতার জন্য আবেদন করেছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ৫ লক্ষ যুবকের রোজগারের ব্যবস্থা করবেন। আর ৮৪ লক্ষ যুবক বেকার ভাতার আবেদন করছে।”
রাহুল বলেন, “নরেন্দ্র মোদী দুর্নীতিগ্রস্ত হলে তৃণমূল কংগ্রেসও দুর্নীতির দৌড়ে পিছিয়ে নেই। সারদা চিটফান্ড কেলেঙ্কারিতে ১৭ লক্ষ বিনিয়োগকারীর ১৯০০ কোটি টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি। রোজ়ভ্যালি চিট ফান্ড কেলেঙ্কারিতে ৩১ লক্ষ বিনিয়োগকারীর ৬৬০০ কোটি টাকা এখনও ফেরত দেওয়া হয়নি। কয়লাপাচার দুর্নীতি, বেআইনি খাদান চলে। ‘গুন্ডা ট্যাক্স’ তোলা হয় এখানে। এতে পশ্চিমবঙ্গবাসীর কোনও লাভ হয় না। এতে শুধু তৃণমূলের সিন্ডিকেট পয়সা পেতে থাকে।”
রায়গঞ্জের সভা থেকে তৃণমূলকেও নিশানা করেন রাহুল। তিনি বলেন, “পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিকে সুযোগ কে দিচ্ছে? তৃণমূল কংগ্রস সুযোগ দিচ্ছে। বিজেপি পশ্চিমবঙ্গকে টাকা দেয় না। পশ্চিমবঙ্গকে ২ লক্ষ কোটি দেয়নি বিজেপি। ১০০ দিনের কাজের টাকা কেটে দিয়েছে। কেন্দ্রীয় বাজেটে এ রাজ্যের জন্য কোনও প্রকল্প দেয়নি। তার পরে এসআইআর-এর মাধ্যমে গণতন্ত্রের উপর আক্রমণ করছে। কিন্তু তৃণমূলও নিজের কাজে ব্যস্ত। তারাও এ রাজ্যের জন্য কাজ করছে না।”
বিজেপিকে নিশানা করে রাহুল বলেন, “পশ্চিমবঙ্গে ভোট চুরির চেষ্টা করে। মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, হরিয়ানায় চুরি করেছে। এমনি এমনি ওরা ভোট জিতে যায় না। কংগ্রেস এবং বিরোধীদের ভোট চুরি করে, ভোট কেটে ওরা জেতে।”
রাহুল বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর বিষয়ে ট্রাম্প বলেছেন, তিনি চাইলে দু’মিনিটের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক কেরিয়ার শেষ করে দিতে পারেন। মোদী গিয়ে তাঁকে আলিঙ্গন করেন। ট্রাম্প তাঁকে নিয়ে মজা করেন।” তিনি আরও বলেন, “মহাত্মা গান্ধী, অম্বেডকর, জওহরলাল নেহরু, সর্দার পটেল, ইন্দিরা গান্ধীরা কোনওদিন মাথানত করেননি। আর কোথায় আজকের প্রধানমন্ত্রী।”
শিল্প ও কারখানা নিয়ে মোদীকে তোপ দাগার সময়ে মমতাকেও খোঁচা দেন রাহুল। কংগ্রেস নেতা রাজ্যবাসীর উদ্দেশে বলেন, “আপনারা বলবেন, আমাদের এখানে তো ছোট-মাঝারি কারখানা মমতাজিই বন্ধ করিয়ে দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে আপনাদের ‘ডবল ক্ষতি’ হবে। পশ্চিমবঙ্গে মমতাজি আপনাদের শিল্পকে শেষ করে দিয়েছেন। দেশে নরেন্দ্র মোদী শিল্পকে শেষ করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন।”
রাহুল বলেন, “ভারতের পুরো ডেটা আমেরিকার হাতে তুলে দিয়েছেন। আমেরিকা এই ডেটা যেখানে খুশি রাখতে পারে। ভারতের বাইরে রাখতে চাইলে, আমেরিকায় রাখতে চাইলে, তা-ও রাখতে পারে। এটা জাতীয় নিরাপত্তার পরিপন্থী। মোদী আমাদের ডেটা দিয়ে দিয়েছেন (আমেরিকাকে)। দেশের নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করছেন।”
তিনি আরও বলেন, “মোদী আমেরিকাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, প্রতি বছর আমেরিকার কাছ থেকে সাড়ে ৯ লক্ষ কোটি টাকার পণ্য কিনবে। তা হলে আপনারাই ভাবুন, তা হলে আমাদের এখানকার ছোট কারখানাগুলি কী করবে! আমেরিকার পণ্য সুনামির মতো এ দেশে এলে আমাদের দেশের ছোট এবং মাঝারি কারখানাগুলি বন্ধ হয়ে যাবে।”
রাহুল বলেন, “সবচেয়ে লজ্জার বিষয়, নরেন্দ্র মোদী আমেরিকাকে বলেছেন, আমরা সেখান থেকেই তেল কিনব, যেখান থেকে আপনারা চান। আজ যদি ভারত ইরান, রাশিয়া, সৌদি, ভেনেজ়ুয়েলা থেকে তেল কিনতে চায়, তবে আমেরিকাকে জিজ্ঞাসা না করে তা করতে পারে না। আমাদের (জ্বালানি) শক্তি সুরক্ষা আমেরিকার হাতে তুলে দিয়েছেন।”
রাহুল বলেন, “দেশের কৃষিক্ষেত্রকে আমেরিকার কৃষকদের জন্য খুলে দিয়েছেন। এই চুক্তির পরে আমেরিকার কৃষকেরা নিজেদের ডাল, সয়াবিন, কার্পাস, বাদাম, ফল ভারতে বিক্রি করতে পারবে।”
রাহুল বলেন, “ভারতকে ভয়ঙ্কর ধোঁকা দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদী। আমেরিকার সঙ্গে তিনি যে সমঝোতা করেছেন, তার জন্য বিজেপির ক্ষতি হবে না। এর ফলে ক্ষতি হবে আপনার, দেশের শ্রমিকদের, দেশের সাধারণ জনতার, পশ্চিমবঙ্গবাসীর, ছোট ব্যবসায়ীদের। দেশকে বিক্রি করে দিয়েছেন।”
রাহুল বলেন, “নরেন্দ্র মোদীর পুরো কন্ট্রোল ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে আছে। মোদী দেশবাসীকে বলেন, তাঁর বুকের ছাতি ৫৬ ইঞ্চির। আমি সংসদে এপস্টিন, আদানি নিয়ে বলা শুরু করেছিলাম। মোদীর হাওয়া বেরিয়ে গিয়েছিল। অমিত শাহকে বলেন, ওঁকে চুপ করাও, ওঁকে চুপ করাও। কিন্তু আমি থামিনি। তার পরে মোদী উঠে লোকসভা থেকে বেরিয়ে যান। ৫৬ ইঞ্চির ছাতি হতে পারে, কিন্তু চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারেন না।”
কংগ্রেস নেতা বলেন, “নরেন্দ্র মোদী একটা নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা শুরু করেছিলেন। তা হল, দলের পুরো অর্থ এক জায়গায় রেখে দেওয়া— আদানি গোষ্ঠীর কাছে। তিনি বিজেপি-কে আদানি গোষ্ঠীর সঙ্গে জুড়ে দিলেন। আদানির জন্য বিজেপি কাজ করায়। আদানি পয়সা, সাপোর্ট-সহ বিজেপি-কে দেয়। এটা আদানি সংস্থা নয়, এর নাম হওয়া উচিত মোদানি সংস্থা। এটা অর্ধেক আদানির, অর্ধেক মোদীর।”
রাহুল বলেন, “আমেরিকার সঙ্গে ভারতের যে চুক্তি মোদী করেছেন, তা নিয়ে সংসদে আলোচনা চলছিল। আচ্ছা আপনারা এপস্টিনের কথা শুনেছেন? আপনারা জানেন এপস্টিন কে? এপস্টিন ফাইল্স-এর কথা শুনেছেন? আমেরিকায় ৩৫ লক্ষ ফাইল বন্ধ হয়ে রয়েছে। তাতে ভারতের মন্ত্রীদের নাম, বিজেপির নেতাদের নাম এবং নরেন্দ্র মোদীজিও তাতে ফেঁসে রয়েছেন। এপস্টিন ফাইল্সের চাবি ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে রয়েছে। এই জন্য যখন ট্রাম্প মোদীকে বলেন, মোদীজি লাফান। তিনি লাফ দেন। মোদীকে বলেন, আপনি ওখানে গিয়ে বসুন। তিনি সেখানে গিয়ে বসে পড়েন। কারণ, কন্ট্রোলার ট্রাম্পের হাতে রয়েছে।”
রাহুল বলেন, “ আজকাল আপনারা নরেন্দ্র মোদীর চেহারা দেখেছেন? হাওয়া বেরিয়ে গিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ঘুরছেন। তাঁর চেহারা দেখুন ভাল করে। উনি আমার চোখে চোখ রাখতে পারেন না।”
কংগ্রেস নেতা বলেন,“দেশে আমাদের লড়াই আরএসএস এবং বিজেপির ঘৃণাভরা চিন্তাধারার বিরুদ্ধে। ভারত জোড়ো যাত্রায় আমি ৪০০০ কিলোমিটার হেঁটেছি। আমি একটাই কথা বলেছি, ঘৃণার বাজারে ভালবাসার দোকান খুলতে হবে। এই দেশ ঘৃণা শেখায় না। ভালবাসতে শেখায়। আমি দেশকে একটাই বার্তা দিয়েছি, ঘৃণা, হিংসা, ভাগাভাগি দিয়ে কিচ্ছু হয় না। ভালবাসা এবং একতা দিয়েই দেশের প্রগতি হয়।”
রাহুল বলেন, “সরাসরি সামনে এসে সংবিধানকে আক্রমণ করতে পারে না। কিন্তু যখনই সুযোগ পায় সংবিধানের উপর আক্রমণ করে। প্রতিষ্ঠানগুলিতে নিজেদের লোককে বসায়। ভোট চুরি করে। গণতন্ত্রকে ধ্বংস করার চেষ্টা করে।”
রাহুল বলেন, “দেশে কী চলছে, তা আপনারা ভালই বোঝেন। আজ বিজেপি, আরএসএস-এর ঘৃণা ছড়ানোর চিন্তাধারা সংবিধানকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে।”