Assembly Election Results 2026

‘নিজের মেয়েকে’ আর চাইলই না বাংলা! ভেঙেচুরে চৌচির হয়ে গেল মমতার মহিলা ভোটব্যাঙ্ক, লক্ষ্মীর ভান্ডারের ম্যাজিক শেষ

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘বাংলার মেয়ে’ হিসাবে তুলে ধরে প্রচার করেছিল তৃণমূল। তার সুফলও পেয়েছিল তারা। পরিসংখ্যান বলছে, সে বার মহিলা ভোটের প্রায় ৫০ শতাংশ নিজেদের ঝুলিয়ে পুরেছিল তৃণমূল।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ০৪ মে ২০২৬ ২২:৪৭
‘লক্ষ্মী’ না, ‘অন্নপূর্ণা’ ভান্ডারেই আস্থা রাখলেন রাজ্যের মহিলা ভোটাররা।

‘লক্ষ্মী’ না, ‘অন্নপূর্ণা’ ভান্ডারেই আস্থা রাখলেন রাজ্যের মহিলা ভোটাররা। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

‘লক্ষ্মী’ না ‘অন্নপূর্ণা’— রাজ্যের মহিলারা শেষমেশ কোন ভান্ডারের উপর আস্থা রাখবেন, তা নিয়ে কৌতূহল ছিল। অবশেষে তার আভাস মিলল। ভোটের ফল বলছে, মহিলা ভোটের একটি বড় অংশ এ বার বিজেপির ঝুলিতে গিয়েছে। পুরুষ ভোটের পাশাপাশি মহিলা ভোটের বড় অংশকে নিজেদের দিকে টেনে এনে কার্যত চমক দেখিয়েছে বিজেপি। গত বার তৃণমূলের প্রাপ্ত আসনের (২১৫) প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে তারা (২০৮)। তৃণমূল পেয়েছে মোটে ৭৯টি আসন।

Advertisement

২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের পর পশ্চিমবঙ্গে যতগুলি নির্বাচন হয়েছে, তার প্রতিটিতেই মহিলা ভোট মোটের উপর তৃণমূলের সঙ্গে থেকেছে। এ বার সেই ভোট তাদের কাছছাড়া হল। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘বাংলার মেয়ে’ হিসাবে তুলে ধরে প্রচার করেছিল তৃণমূল। তার সুফলও পেয়েছিল তারা। পরিসংখ্যান বলছে, সে বার মহিলা ভোটের প্রায় ৫০ শতাংশ নিজেদের ঝুলিয়ে পুরেছিল তৃণমূল। বিজেপির দিকে গিয়েছিল ৩৫ শতাংশ ভোট।

সেই ভোটে জেতার পর ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এর মতো মহিলাদের নগদ অর্থপ্রদানের প্রকল্প চালু করে মহিলা ভোটব্যাঙ্ককে আরও সুসংহত করে তৃণমূল। ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও মহিলা ভোট তৃণমূলের সঙ্গেই থেকেছে। অনেকে মনে করেন, তৃণমূলের নির্বাচনী সাফল্যের নেপথ্যে এই ভোটব্যাঙ্কের সবিশেষ ভূমিকা রয়েছে।

২০২৪ সালের অগস্টে আরজি কর হাসপাতালে ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনা রাজ্য রাজনীতিকে আলোড়িত করেছিল। ওই ঘটনার প্রতিবাদে এবং বিচারের দাবিতে রাজ্যের নানা প্রান্তে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। সেই আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন মহিলারা। ওই ঘটনা অস্বস্তিতে ফেলেছিল তৃণমূলকে। তবে আরজি করের ঘটনার পর রাজ্যে কয়েকটি উপনির্বাচন হয়। প্রত্যেকটিতেই জয়ী হয় তৃণমূল। ফলাফল বিশ্লেষণ করে অনেকে অভিমত দিয়েছিলেন, আরজি কর পরবর্তী পর্বেও মহিলা ভোট তৃণমূলের কাছছাড়া হয়নি। অনেকের আবার পাল্টা বক্তব্য ছিল, উপনির্বাচনে সাধারণত শাসকদলই জিতে থাকে। তাই এই নির্বাচনগুলি থেকে জনমতের সঠিক প্রতিফলন ধরা পড়ে না।

উপনির্বাচন বাদ দিলে আরজি কর পর্বের পর রাজ্যে এটিই ছিল প্রথম বড় কোনও ভোট। তাই মহিলা ভোট ‘বাংলার মেয়ের’ সঙ্গে রয়েছে কি না, তা পরখ করে নেওয়ার একটা সুযোগ ছিল।

তৃণমূলের মহিলা ভোটব্যাঙ্কে ভাঙন ধরাতে উদ্যোগী হয়েছিল বিজেপিও। ভোটের আগে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এর ধাঁচেই রাজ্যে ‘অন্নপূর্ণা ভান্ডার’ প্রকল্প চালু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তারা। ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্পে মহিলারা মাসে ১,৫০০ টাকা পান (তফসিলি জাতি এবং জনজাতিভুক্ত মহিলারা ১,৭০০ টাকা)। বিজেপি তার পরিমাণ দ্বিগুণ করে মাসে ৩,০০০ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। ক্ষমতায় এলে সরকারি বাসে মহিলাদের ভাড়া দিতে হবে না বলেও ঘোষণা করা হয়। ভোটের ফল বলছে, এই আশ্বাসে ভরসা রেখেছেন রাজ্যের মহিলা ভোটারদের একটি বড় অংশ।

বিজেপি ক্ষমতায় এলে রাজ্যে নারীসুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল পদ্মশিবির। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং‌ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ প্রায় প্রতিটি সভা থেকে রাজ্যে মহিলাদের উপর অত্যাচারের অভিযোগ তুলে তৃণমূল সরকারকে তোপ দেগেছিলেন। এ-ও জানিয়েছিলেন, বিজেপি সরকার গড়লে রাতেও নিরাপদে রাস্তায় বেরোতে পারবেন মহিলারা। বস্তুত, মহিলা ভোটারদের বার্তা দিতে পানিহাটি কেন্দ্রে আরজি করের নির্যাতিতার মা-কে প্রার্থী করে বিজেপি। পানিহাটিতে জনসভা করে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, “৪ তারিখের পর মহিলাদের উপর অত্যাচারের সব ফাইল খোলা হবে।” তৃণমূল অবশ্য পাল্টা বিহার, উত্তরপ্রদেশ-সহ বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোয় নারীসুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিজেপিকে বিঁধেছিল।

পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোটের অব্যবহিত আগে লোকসভার আসন বাড়িয়ে মহিলা সংরক্ষণ চূ়ড়ান্ত করে ফেলতে চেয়েছিল বিজেপি। তবে সংবিধান সংশোধনী বিলটি লোকসভায় ভোটাভুটিতে পাশ করাতে পারেনি মোদী সরকার। বিরোধীরা ওই বিলের বিপক্ষে ভোট দেয়। তার পরেই কংগ্রেস, তৃণমূল, ডিএমকে-র মতো দলগুলিকে ‘মহিলাবিরোধী’ বলে তোপ দাগেন প্রধানমন্ত্রী। পাল্টা তৃণমূল জানায়, মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব সুনিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে তৃণমূলই ‘অগ্রণী ভূমিকা’ পালন করে থাকে। পরিসংখ্যান দিয়ে জানানো হয় যে, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোটে তারা যেখানে ৫৩ জন মহিলা প্রার্থীকে মনোনীত করেছে, সেখানে বিজেপি প্রার্থী করেছে মাত্র ৩৫ জন মহিলাকে।

প্রথম দফায় রাজ্যের ১৫২টি আসনে ভোটদানের চূড়ান্ত হার ছিল ৯৩.১৯ শতাংশ। সংখ্যার নিরিখে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা বেশি হলেও শতাংশের নিরিখে মহিলাদের মধ্যে ভোটদানের হার তুলনায় বেশি ছিল। কমিশনের প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, মোট ভোটারের মধ্যে প্রথম দফায় ভোট দেন ১ কোটি ৭০ লক্ষ ৮১ হাজার ৮৪৯ জন পুরুষ (৯২.৩৩ শতাংশ) এবং ১ কোটি ৬৫ লক্ষ ৪০ হাজার ৬৫ জন মহিলা (৯৪.০৯ শতাংশ)। এই পরিসংখ্যানের সূত্রে তৃণমূল এবং বিজেপি— দুই পক্ষই দাবি করেছিল মহিলা ভোট তাদের ঝুলিতে গিয়েছে। কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল এই ভোটের সিংহভাগ গিয়েছে বিজেপির পক্ষেই।

Advertisement
আরও পড়ুন