গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
মালদহে অশান্তির ঘটনায় সিবিআই কিংবা এনআইএ-র মতো ‘স্বাধীন’ সংস্থাকে দিয়ে তদন্ত করাতে হবে। বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনকে এমনই নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট। একই সঙ্গে শীর্ষ আদালতের নির্দেশ, যে সংস্থাই তদন্ত করুক, তারা আদালতে একটি প্রাথমিক রিপোর্ট জমা দিতে বাধ্য থাকবে। আগামী সোমবার (৬ এপ্রিল) পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর মামলাটি ফের শুনবে সুপ্রিম কোর্ট। ওই দিনের শুনানিতে ভার্চুয়াল মাধ্যমে হাজিরা দিতে বলা হয়েছে রাজ্যের মুখ্যসচিব, রাজ্যপুলিশের ডিজি, মালদহের জেলাশাসক এবং এসপি-কে।
বস্তুত, মালদহের অশান্তির ঘটনায় দেশের শীর্ষ আদালত যে কতটা ক্ষুব্ধ, তা বোঝা গিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের শুনানিতে। বিচারকদের আটকে রাখা এবং তাঁদের গাড়িতে হামলার ঘটনা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বলেন, “এটি বিচারকদের ভয় দেখানোর একটা স্পষ্ট চেষ্টাই শুধু নয়, এটি আদালতকেও চ্যালেঞ্জ করা। এটি কোনও সাধারণ ঘটনা নয়। বরং মনে হচ্ছে এটি পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপ, যার লক্ষ্য ছিল বিচারকদের মনোবল ভেঙে দেওয়া এবং বাকি থাকা মামলাগুলিতে আপত্তি নিষ্পত্তির গোটা প্রক্রিয়াই বন্ধ করে দেওয়া।”
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার প্রতিবাদে বুধবার দফায় দফায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল মালদহের মোথাবাড়ি, সুজাপুর-সহ বিভিন্ন এলাকা। এসআইআর-এর কাজে নিযুক্ত সাত জন বিচারককে কালিয়াচক-২ ব্লক অফিসের ভিতর রাত পর্যন্ত আটকে রাখে উত্তেজিত জনতা। হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টকে জানান। তার পরেই বৃহস্পতিবার সকালে এসআইআর মামলাটি শুনতে চায় সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ।
এসআইআর-এর কাজে যুক্ত বিচারকদের নিরাপত্তা দিতে না-পারায় রাজ্য প্রশাসনকে সরাসরি ভর্ৎসনা করেন প্রধান বিচারপতি। বলেন, “আমরা আগেই বলেছিলাম, এসআইআর-এ বিবেচনাধীন নামের নিষ্পত্তি করার কাজে নিযুক্ত বিচারকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।” তার পরেই রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশাসনকে ‘কঠোর বার্তা’ দেয় সুপ্রিম কোর্ট। রাজ্যের মুখ্যসচিব, পুলিশের ডিজি, মালদহের জেলাশাসক (ডিএম) এবং পুলিশ সুপার (এসপি)-কে শো-কজ়ও করে শীর্ষ আদালত। প্রধান বিচারপতির বেঞ্চের নির্দেশ, হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতির চিঠির প্রেক্ষিতে কেন তাঁদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হবে না, তা কারণ-সহ জানাতে হবে।
হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতির চিঠি উদ্ধৃত করে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বলেন, “জেলাশাসক এবং পুলিশ সুপার— কেউই ঘটনাস্থলে পৌঁছোননি। পরিস্থিতি সামাল দিতে হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে নিজে থেকেই পুলিশের ডিজি এবং স্বরাষ্ট্রসচিবকে ফোন করতে হয়েছিল।” একই সঙ্গে তিনি বলেন, “মুখ্যসচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি এবং হোয়াট্সঅ্যাপে বার্তা পাঠানোর জন্য তাঁর নম্বরও পাওয়া যায়নি।” উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক আধিকারিকদের কাজে হতাশাপ্রকাশ করে প্রধান বিচারপতি কান্ত বলেন, “এই ঘটনা রাজ্য প্রশাসনের সম্পূর্ণ ব্যর্থতাকে প্রকাশ করে। মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, পুলিশের ডিজি এবং এসপি-র আচরণ অত্যন্ত নিন্দনীয়। বিষয়টি জানানো সত্ত্বেও তাঁরা কোনও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে কেন ব্যর্থ হয়েছেন, তা তাঁদের ব্যাখ্যা করতে হবে।”
সিবিআই বা এনআইএ-র মতো কেন্দ্রীয় সংস্থাকে দিয়ে মালদহের ঘটনার তদন্ত করানোর পাশাপাশি আরও একগুচ্ছ নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। নির্বাচন কমিশনকে বলা হয়েছে, এসআইআর-এর কাজে নিযুক্ত বিচারকদের (বা বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের) পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিতে হবে। নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে হবে তাঁদের বাসভবনেও। নিরাপত্তাগত ঝুঁকি থাকলে তা পর্যালোচনা করে বিচারকদের পরিবারকেও সুরক্ষিত রাখার বন্দোবস্ত করতে বলা হয়েছে কমিশনকে।
সর্বোচ্চ আদালত এ-ও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এসআইআর-এর কাজ যথাবিহিত চলবে। প্রধান বিচারপতি বলেন, “আমরা কাউকেই আইন নিজের হাতে তুলে নিতে বা বিচারকদের মনে ভয় তৈরি করার মাধ্যমে কাজে বাধা দিতে দেব না।” মালদহের ঘটনাটিকে ‘ফৌজদারি অপরাধ’ হিসাবে গণ্য করার কথা বলেন তিনি। কমিশনকে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ, বিচারকেরা যেখানে এসআইআর সংক্রান্ত কাজ করবেন, সেখানে এক সঙ্গে তিন থেকে পাঁচ জনের বেশি ঢুকতে পারবেন না। আপত্তি দাখিল বা শুনানির সময়েও এই নিয়ম মানতে হবে। বিচারকদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করতেও বলা হয়েছে কমিশনকে।