(বাঁ দিকে) দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে নন্দীগ্রামের তৃণমূল প্রার্থী পবিত্র কর। এবং নিজের কেন্দ্র নন্দীগ্রামে বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী। (ডান দিকে)। —নিজস্ব চিত্র।
ভৌগোলিক ইতিহাস বলে, ষোড়শ শতকে এই তল্লাটৈ বয়ে যেত সাগরের জল। বঙ্গোপসাগরের তলদেশ থেকে চর জেগে ওঠার পরে সেখানে বসতি গড়ে উঠেছিল এক সময়ে। লোককথায় আছে, নন্দী বা শিবের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনও মন্দিরের সূত্রে জনপদের নাম হয়েছিল নন্দীগ্রাম।
একুশ শতকে সেই জনপদে গিয়ে দাঁড়ালে প্রথমেই মনে হবে, নামকরণ সার্থক ছিল! মহাদেব, রামচন্দ্র, হনুমান— নানা দেবতার নানা মন্দিরে ছেয়ে গিয়েছে এলাকা। কোথাও কোথাও আকাশ প্রায় ঢাকা পড়েছে হিন্দুত্ববাদী বিভিন্ন সংগঠনের ধ্বজায়। পাঁচ বছর আগে ভোটের দিনে বয়ালের মাঠের আলে দাঁড়িয়ে দু’ধারে মহিলাদের ভিড়ে যে ভাগাভাগি চোখে পড়েছিল, এখন আর সে সব খুঁজতে লাগে না। সে দিন বয়ালে বুথের ভিতরে হুইল চেয়ারে ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মুখ্যমন্ত্রী আর ফেরেননি। তবে ভাগাভাগির দাগ জমিতে আরও স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। শাসক দলের সভা-মিছিলে দেখা যাচ্ছে সংখ্যালঘু মুখ, আর বিরোধী দল বিজেপির কর্মসূচি মানে হিন্দু জমায়েত।
রেয়াপাড়া, বিরুলিয়া, খোদামবাড়ি, আমদাবাদ বা মহম্মদপুর, সোনাচূড়া, গড় চক্রবেড়িয়া, গোকুলনগরের নানা মহল্লায় কম-বেশি একই ছবি। শেখ সুলেমান, শেখ সামাদ, সাইদুল হোসেনেরা তৃণমূলের কথা বলছেন। গুরুপদ মাইতি, সুব্রত জানা, অমিত গিরিরা বিজেপির কথা। প্রার্থী হিসেবে সিপিআইয়ের শান্তি গিরি, কংগ্রেসের শেখ জারিয়াতুল হোসেন, আইএসএফের মহম্মদ সবে মিরাজ আলি খান, আম জনতা উন্নয়ন পার্টির সাহিদুল হকেরা দেওয়ালে-পোস্টারে আছেন। ওই পর্যন্তই!
প্রথমে জমি আন্দোলনের ফসল এবং পরে ‘জাহাজ-বাড়ি’ তুলে চর্চায় আসা তৃণমূল নেতা শেখ সুফিয়ান বলছেন, ‘‘পাপ! পাপ! এই নন্দীগ্রামের মাটিতে শুধু হিন্দু-মুসলিমের বিষ ছড়িয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। এই পাপের শাস্তি ওঁকে পেতে হবে!’’
পাপ ধুয়ে ‘অপবিত্র’ নন্দীগ্রামের কৌলীন্য ফেরানোর ডাক দিয়ে তৃণমূল এ বার ময়দানে নামিয়েছে পবিত্র করকে। বিজেপি ছেড়ে দুপুরে তৃণমূলে যোগ দিয়ে বিকালে যিনি শাসক দলের প্রার্থী ঘোষিত হয়েছেন। ভোট ঘোষণার সময় পর্যন্ত শুভেন্দুর সঙ্গী পবিত্র এখন মঞ্চ থেকে বলছেন, ‘‘এই নির্বাচনের প্রস্তুতি-পদ্ধতি আলাদা। আমাদের বিপক্ষ প্রার্থী নন্দীগ্রামের মাটিকে কলঙ্কিত করেছেন, সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়িয়েছেন। সেই বিষবৃক্ষ তুলে ফেলার লড়াই এ বার!’’ সঙ্গে ‘গদ্দার’, ‘মির জ়াফর’-সহ নানা বিশেষণ। প্রার্থী ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে বিজেপি থেকে এসে তিনি পারবেন শুভেন্দুর সঙ্গে টক্কর নিতে? স্বয়ং মমতা পাঁচ বছর আগে যা পারেননি, তিনি করে দেখাবেন? শামসাবাদের রাস্তায় তৃণমূলের ব্যস্ত প্রার্থী ঝটিতি আলাপচারিতায় বলে গেলেন, ‘‘এই যে অন্য দল থেকে নিয়ে এসে সঙ্গে সঙ্গে প্রার্থী করা, এটাই তো ঐতিহাসিক ঘটনা! তৃণমূল নেতৃত্ব যে ভরসা রেখেছেন আমার উপরে, তার মর্যাদা দিয়ে দায়িত্ব পালন করব।’’
নন্দীগ্রাম পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে পবিত্র এক অসামান্য স্বপ্ন ফেরি করছেন। তিনি জিতে এলে এবং রাজ্যে মমতার সরকার ফের হলে ৭ দিনের মধ্যে হলদি নদীর উপরে সেতুর শিলান্যাস হবে! এই প্রতিশ্রুতি ‘প্রতিজ্ঞা ফলকে’, পোস্টারে-ব্যানারে লিখে এবং পবিত্রের মুখের কথায় অকাতরে বিলি হচ্ছে। এবং তিনি একা নন! পিছনে আছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। নন্দীগ্রামে এসে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক বলে গিয়েছেন, ‘‘পবিত্র ১০ দিন বলেছে। আমি ৫০ দিন সময় চেয়ে নিচ্ছি। হলদি নদীর সেতুর শিলান্যাস হবে। আমি কথা দিলে কথা রাখি!’’
ডায়মন্ড হারবারের পরে তাঁর ‘সেবাশ্রয়’ প্রকল্পের জন্য দ্বিতীয় জায়গা হিসেবে অভিষেক যখন নন্দীগ্রামকে বেছে নিয়েছিলেন, তখনই বোঝা গিয়েছিল তাঁর নজর আছে পূর্ব মেদিনীপুরের এই তালুকে। নিজে দাঁড়াননি বটে, তবে হাবে-ভাবে বোঝা যাচ্ছে পবিত্রকে ঘোড়া করে মেঘের আড়ালে সেনাপতি তিনিই! অভিষেক বলেও দিচ্ছেন, ‘‘নন্দীগ্রামে এক দিকে পবিত্র, অন্য দিকে অপবিত্র! নন্দীগ্রামকে পবিত্রময় করতে হবে। জিতলে উন্নয়নের স্টিয়ারিং হাতে থাকবে। পরিবারের মতো আগলে রাখব নন্দীগ্রামকে, যেমন ডায়মন্ড হারবারকে রাখি!’’ বিজেপিতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ এবং শুভেন্দুকে জড়িয়ে তাঁর মন্তব্য, ‘‘দিল্লির নেড়ি কুত্তা হয়ে থাকার চেয়ে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার হয়ে মরাও ভাল!’’
এত সব সংলাপের বাজারে তিনি কোথায়? আগের রাতে তাঁকে ভবানীপুরের চেতলায় দেখা যাচ্ছে, তো পরের সকালে পূর্ব মেদিনীপুরের সমুদ্র-প্রান্তে। দিনের বেলা নন্দীগ্রামে জনসংযোগ সেরে বিকালে ভবানীপুরে রোড-শো! নিজের বিধানসভা কেন্দ্রে হাতে করে প্রচার-পত্র বিলি করছেন, পথের ধারে শিশুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। আক্রমণ গায়ে মাখতেই রাজি নন বিজেপির প্রার্থী। যাতায়াতের ভয়ঙ্কর সূচির ফাঁকে শুভেন্দু বলছেন, ‘‘ওরা বলছে, বলুক। নন্দীগ্রামের মানুষকে আমি চিনি, ওঁরা আমাকে চেনেন। এ সবের জবাব দিয়ে কী হবে?’’ হলদি নদীর সেতুর যে প্রতিশ্রুতি ভাসছে, তার প্রেক্ষিতে বিদায়ী বিধানসভার বিরোধী দলনেতা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ‘‘কেন্দ্রীয় জলপথের মধ্যে যেটা পড়ে, সেখানে কিছু করতে গেলে কেন্দ্রীয় সরকারের সম্মতি ও ভূমিকা লাগবে। আমাদের ‘সঙ্কল্প পত্র’টা একটু পড়ে নিলেই সব জানা যাবে।’’
মুখে তাঁর হিন্দুত্ববাদী নানা হুঙ্কার সাম্প্রতিক কালে যা-ই বিতর্ক তৈরি করুক, নন্দীগ্রামে তাঁকে এ বার কিন্তু দেখা যাচ্ছে মুসলিম মহল্লাতেও। শুভেন্দুর অবশ্য ব্যাখ্যা, ‘‘মুসলিমদের সমর্থন আমরা চাই, তবে পাই না! আর ভারতীয় মুসলিমদের সঙ্গে আমাদের কোনও বিরোধ নেই। তাঁদের কোনও বিপদ নেই, চিন্তাও নেই। আমরা যা বলেছি, সব বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী আর রোহিঙ্গা নিয়ে।’’ তথ্যের খাতিরে মনে রাখতে হয়, নন্দীগ্রাম বিধানসভা এলাকায় ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) পরে ১১ হাজার ৭৯৭ জন ভোটার কমেছে এবং বাদ যাওয়াদের অন্তত ৯০%-ই সংখ্যালঘু। তার ফায়দা কে পাবে? শুভেন্দু হেসে পাল্টা বলছেন, ‘‘নন্দীগ্রামের জন্য এসআইআর-এর হিসেব করতে লাগে আমাদের?’’
দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে নন্দীগ্রামের তৃণমূল প্রার্থী পবিত্র কর। —নিজস্ব চিত্র।
‘পবিত্র’ আর ‘পাপে’র নানা কিস্সার মাইক-গর্জন শুনতে শুনতে বাজারে ছোট দোকানের মালিক শেখ রাজেশ বলছিলেন, ‘‘দিদি বলেন, লোডশেডিং করে ওঁকে হারিয়ে দিয়েছিল। তা হলে আর এক বার এখানে লড়ে দেখিয়ে দিতেন। আমাদের দাদার কিন্তু হিম্মত আছে! নন্দীগ্রামের সঙ্গে উনিই ভবানীপুরে লড়তে গিয়েছেন।’’
ঠিক সেই কথাই তুলছেন প্রার্থী শুভেন্দুও। ‘‘আমি তো এ বারও চ্যালেঞ্জ করেছিলাম। নিলেন না!’’
যুদ্ধটা আসলে ভবানীপুরে হচ্ছে। নন্দীগ্রামে ছায়া-যুদ্ধ!