West Bengal Elections 2026

দ্বিমুখী লড়াই ভেঙে পথ দেখাবে কি উত্তরপাড়া

সিপিএমের রাজ্য কমিটির হিসাবে, উত্তরপাড়া আসনটি ‘সম্ভাবনাময়’। তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে আসনটি ‘নিশ্চিত’ বলে চিহ্নিত। বিজেপি, কংগ্রেসও উত্তরপাড়া নিয়ে আশাবাদী।

রাজীব চট্টোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:০০

—প্রতীকী চিত্র।

বছর সাতেক আগের কথা। সামনের সারিতে থাকতে পছন্দ করা, এক দলীয় নেতাকে মিছিলের শেষে দাঁড় করিয়েছিলেন সিপিএমের তৎকালীন জেলা সম্পাদক সুদর্শন রায়চৌধুরী। বলেছিলেন, ‘‘এখন আমাদের সামনের সারিতে দেখলে, মানুষ বিরক্ত হন। বাচ্চাগুলোকে সামনে দাও।’’ সুদর্শনবাবুর সে বার্তা দলের নিচুতলায় গড়াতে সময় লাগেনি। চায়ের দোকানের আড্ডায় শোনা যাচ্ছে, বামেদের নবীন প্রজন্ম ভোটের আগে উত্তরপাড়ায় দ্বিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনায় জল ঢেলেছেন।

সিপিএমের রাজ্য কমিটির হিসাবে, উত্তরপাড়া আসনটি ‘সম্ভাবনাময়’। তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে আসনটি ‘নিশ্চিত’ বলে চিহ্নিত। বিজেপি, কংগ্রেসও উত্তরপাড়া নিয়ে আশাবাদী। সোমবার প্রচার শেষে সিপিএম প্রার্থী মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের আশা, ‘‘প্রত্যাবর্তনের লড়াইয়ে পথ দেখাবে উত্তরপাড়া।’’

তৃণমূল প্রার্থী শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায়কে লড়তে হচ্ছে স্থিতাবস্থা-বিরোধী হাওয়ার প্রতিকূলে। তাঁর বাবা তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘সিপিএমকে পাঁচ মিনিটে শেষ করে দেব’ আর পুলিশকে ‘ছাগল’ সম্বোধন করে নতুন বিতর্কে জড়িয়েছেন কল্যাণ। কল্যাণ অবশ্য বিতর্ককে গুরুত্ব দিতে নারাজ। বলেছেন, ‘‘যা বাস্তব, তা-ই বলেছি। উত্তরপাড়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের।’’ সোমবার পুত্রের প্রচারে উদ্বাহু হয়ে নাচেনও তিনি।

কী বুঝছেন এ বার? ধাড়সা-উত্তরপাড়া রুটের টোটোয় চড়ে বসা এক যাত্রীর উত্তর, ‘‘হাওয়া ভাল নয়।’’ কার জন্য ভাল নয়, ভাঙেননি। লোকসভা নির্বাচনে এই বিধানসভায় বিজেপির থেকে হাজার দশেক ও সিপিএমের থেকে প্রায় ২৫ হাজার ভোটে এগিয়ে তৃণমূল। যদিও একাধিক তৃণমূল নেতার কথায়, ‘‘১৫ বছরে যে তিন জন বিধায়ক ছিলেন, তাঁরা এলাকাবাসীর প্রত্যাশার ধারেকাছে আসতে পারেননি। লড়াই কঠিন হওয়ার এটাই মূল কারণ।’’ তবে আরও এক কারণ রয়েছে, প্রকাশ্যে যা মানতে নারাজ তৃণমূল নেতৃত্ব। ভোটের ঠিক আগে, কানাইপুরের প্রাক্তন পঞ্চায়েত প্রধান, তৃণমূল নেতা আচ্ছালাল যাদব দলবল নিয়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। হিন্দিভাষী এলাকায় তাঁর প্রভাবও যথেষ্ট। তিনি আবার উত্তরপাড়ার পুরপ্রধান, তৃণমূলের প্রাক্তন জেলা সভাপতি দিলীপ যাদবের দাদা। ভোটে তার প্রভাব নিয়ে জল্পনা চলছে।

উত্তরপাড়া এলাকায় বন্ধ কারখানার তালিকায় শেষ সংযোজন হিন্দুস্তান মোটরস। সম্প্রতি কোন্নগরে এসে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এড়িয়ে গিয়েছেন হিন্দমোটর প্রসঙ্গ। দাবি করেছেন, ওই কারখানা চত্বরেই টিটাগড় ওয়াগন লিমিটেডকে ৪০ একর জমি দেওয়া হয়েছে। দিয়েছেন কর্মসংস্থানের আশ্বাস। কোন্নগরের বাসিন্দা, কলেজ শিক্ষক সৌরভ রায় বলেন, ‘‘হিন্দমোটর কারখানার পড়ে থাকা জমিতে অধিগ্রহণের বোর্ড ঝোলাল রাজ্য সরকার। সে বোর্ড উধাও। পড়ে থাকা জমিতে কেন শিল্প হবে না?’’ মীনাক্ষী বলছেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী টিটাগড় ওয়াগন লিমিটেড কারখানাকে জমি দিতে বাধ্য হয়েছেন। টিটাগড় ওয়াগনের সম্প্রসারণ শেষ হলে, বন্ধ হিন্দমোটর এবং লাগোয়া এলাকায় বন্ধ কারখানার শ্রমিক পরিবারগুলিকে চাকরিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে।’’

উত্তরপাড়ায় ‘গুন্ডারাজ’ চেনা শব্দ। মীনাক্ষী ও বিজেপি প্রার্থী দীপাঞ্জন চক্রবর্তী প্রচারে নিয়ম করে তুলছেন সে প্রসঙ্গ। ‘পাল্টানোর’ ডাক দিয়ে প্রচারে নেমে দীপাঞ্জন বলেছেন, ‘‘লাল চুল আর কানে দুল পরে গুন্ডামি চলবে না। এক মাস সময় দেব। বদল না হলে, আইনের শাসন চলবে।’’ ‘এনএসজি’ (ন্যাশনাল সিকিয়োরিটি গার্ড) লেখা পোশাক পরে প্রচারে বেরিয়ে বিতর্কে জড়িয়েছেন দীপাঞ্জন। আদৌ তিনি এনএসজি-তে কাজ করেছেন কি না, প্রশ্ন তুলেছে বিরোধীরা। দীপাঞ্জনের দাবি, ‘‘এনএসজি-তে ছিলাম কি না, তা যাঁরা বলতে পারবেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম লালকৃষ্ণ আডবাণী। তাঁর সিকিয়োরিটি লিয়াজ়োঁ অফিসার ছিলাম।’’ কংগ্রেস প্রার্থী সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের প্রশ্ন, ‘‘উত্তরপাড়ার লেভেল ক্রসিংয়ে উড়ালপুল, কাঁঠালবাগানে আন্ডারপাস, জিটি রোডে যানজট, এ সব নিয়ে ওঁরা প্রশ্ন তুলছেন না কেন!’’ তবে সব ছাপিয়ে নজর কাড়ে তৃণমূল প্রার্থী শীর্ষণ্যর দাবি, ‘‘বিজেপির সঙ্গে বামেদের বোঝাপড়া রয়েছে।’’ (সহ প্রতিবেদন: গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়)

আরও পড়ুন