Modi Road Show

প্রচারের শেষতম বিন্দুতে মোদী রাখলেন ব্যারাকপুর! রোডশো বা সভা করলেন না ভবানীপুর বা ‘মমতাদুর্গ’ দক্ষিণ কলকাতায়

রাজ্য বিজেপির একাধিক প্রথম সারির নেতার ব্যাখ্যা, ‘‘এমন কোনও বিধানসভা কেন্দ্র নেই বা এমন কোনও সাংগঠনিক জেলা নেই, যেখানে নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহ দু’জনেই গিয়েছেন।’’ তা ছাড়া, নিরাপত্তার বিষয়টিও জরুরি ছিল।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ ২০:১৩
Why Bowanipore did not get a Modi Road Show? BJP Explains unofficially

(বাঁ দিকে) নরেন্দ্র মোদী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।(ডান দিকে)। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

শেষ হয়ে গেল ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারাভিযান। নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ এবং যোগী আদিত্যনাথ— বিজেপির তিন ‘মহাতারকা প্রচারক’ একযোগে প্রচারের ময়দানে থাকলেন অন্তিম দিনে। কিন্তু দক্ষিণ কলকাতা তথা ভবানীপুর ছুঁয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদী প্রচারাভিযান শেষ করবেন বলে যে কথা বিজেপি সূত্রে মাসখানেক আগে জানা গিয়েছিল, তা ঘটল না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দুর্গ’ হিসাবে পরিচিত দক্ষিণ কলকাতায় মোদীর কোনও কর্মসূচি হল না। যেমন হল না সেই ভবানীপুরেও, যেখানে প্রার্থী বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী।

Advertisement

এ বারের প্রচারাভিযানে মোদীর শেষ কর্মসূচি হবে দক্ষিণ কলকাতায় রোডশো, এমন পরিকল্পনার কথা বিজেপি সূত্রেই বলা হয়েছিল মার্চের শেষ সপ্তাহ নাগাদ। বিজেপির তরফে সে বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা বিবৃতি ছিল না। কিন্তু ভবানীপুর এবং রাসবিহারী বিধানসভা কেন্দ্র ছুঁয়ে মোদী প্রচার শেষ করবেন, এমন সম্ভাবনার কথা একাধিক বিজেপি সূত্র জানিয়েছিল। এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ নাগাদ শোনা যায়, সে পরিকল্পনা বাতিল হচ্ছে। ‘নিরাপত্তাজনিত কারণে’ এসপিজি (প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তারক্ষী বাহিনী) দক্ষিণ কলকাতায় মোদীর রোডশোয়ের অনুমতি দিচ্ছে না বলে বিজেপি সূত্র দাবি করেছিল। প্রাথমিক ভাবে শিলিগুড়ি শহরেও প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে রোডশো করানোর ভাবনা ছিল বিজেপির। কিন্তু সেটির ক্ষেত্রেও অনুমতি মেলেনি। তাই শিলিগুড়িতে মোদী জনসভা করেন। আর তার আগের সন্ধ্যায় মাটিগাড়ায় রোডশো করেন। দক্ষিণ কলকাতার ক্ষেত্রে রোডশো বা জনসভা কিছুই হল না। যদিও বিজেপির একাংশের যুক্তি, ব্রিগেড ময়দান দক্ষিণ কলকাতার অন্তর্গত। ফলে মোদী দক্ষিণ কলকাতায় সবচেয়ে বড় সমাবেশটিই করেছেন। যদিও সে সমাবেশ হয়েছিল ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণারও আগে। এবং সেটি ছিল বিজেপির ‘পরিবর্তন যাত্রা’র আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির সভা। সে সভায় ভিড়ের বহর বিজেপিকে খুশিই করেছিল।

তৃণমূলের ‘দুর্গ’ বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘খাসতালুক’ হিসাবেই দক্ষিণ কলকাতা পরিচিত। যেখানে এ বারের ভোটে বিজেপি একাধিক ‘ওজনদার’ প্রার্থী নামিয়েছে। ভবানীপুরে মুখ্যমন্ত্রী মমতার বিরুদ্ধে প্রার্থী খোদ বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু, যাঁর মনোনয়নে শামিল হয়েছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ স্বয়ং। হাজরা মোড় থেকে মমতার বাড়ির গলির সামনে দিয়ে মিছিল করে শুভেন্দুর সঙ্গে শাহ গিয়েছিলেন আলিপুর সার্ভে বিল্ডিংয়ে। সেই দিনই মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন রাসবিহারী বিধানসভা কেন্দ্রে প্রার্থী প্রাক্তন রাজ্যসভা সাংসদ এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ‘বিশেষ আস্থাভাজন’ হিসাবে পরিচিত স্বপন দাশগুপ্ত। ঘটনাচক্রে, রাসবিহারীতে স্বপনের নাম ঘোষিত হওয়ার পর থেকেই তাঁর প্রতিপক্ষ তথা তৃণমূল প্রার্থী দেবাশিস কুমার ইডি, আয়কর হানা এবং তলবে জেরবার। অনেকেই একে নিছক ‘সমাপতন’ হিসাবে দেখতে রাজি নন। ফলে ভবানীপুর এবং রাসবিহারী বিধানসভা কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী রোডশো করবেন বলে স্থানীয় বিজেপি কর্মীদের আশা ছিল। কিন্তু সে আশা পূরণ হয়নি। মোদী কলকাতায় রোডশো করেছেন। তবে দক্ষিণে নয়, উত্তরে।

ভোট ঘোষণার পর থেকে জনসভা এবং রোডশো মিলিয়ে মোট ১৯টি কর্মসূচি করেছেন মোদী। পরিকল্পনামাফিক ২৭ তারিখে ছিল তাঁর শেষ কর্মসূচি। উত্তর ২৪ পরগনার ব্যারাকপুরে জনসভা করে প্রচারে ইতি টেনেছেন প্রধানমন্ত্রী।

ভবানীপুরে মোদীর না-যাওয়া নিয়ে তৃণমূল প্রত্যাশিত ভাবেই কটাক্ষ ছুড়েছে। দলের রাজ্য সহ-সভাপতি জয়প্রকাশ মজুমদারের কথায়, ‘‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির শোচনীয় পরাজয়ের আগের দিন পর্যন্ত হিটলার নিজের ঘনিষ্ঠদের বলেছিলেন, জয় আমাদেরই হবে। সেটা যেমন হয়নি, মোদী-শাহেরা প্রচারের শেষ দিন পর্যন্ত যা বলছেন, সে বঙ্গবিজয়ও হবে না। সে কথা তাঁরা নিজেরাও বুঝতে পেরেছেন। তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দক্ষিণ কলকাতায় না-এসে নিজেকে বিড়ম্বনার হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন।’’

তৃণমূলের কটাক্ষের কোনও জবাব বিজেপি নেতৃত্ব দিতে চাননি। কেন দক্ষিণ কলকাতায় মোদীকে কোনও কর্মসূচিতে দেখা গেল না, সে বিষয়েও বিজেপি নেতারা কোনও প্রকাশ্য মন্তব্য করতে চাননি। তবে রাজ্য বিজেপির একাধিক প্রথম সারির নেতার ব্যাখ্যা, ‘‘এমন কোনও বিধানসভা কেন্দ্র নেই বা এমন কোনও সাংগঠনিক জেলা নেই, যেখানে নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহ দু’জনেই গিয়েছেন। শুভেন্দু অধিকারীর জন্য ভবানীপুর তথা দক্ষিণ কলকাতায় শাহ রোডশো করেছিলেন। তাই প্রধানমন্ত্রীর কোনও কর্মসূচি ভবানীপুর বা দক্ষিণ কলকাতা পায়নি।’’

গত ২ এপ্রিল শুভেন্দুর মনোনয়নের দিন মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ির গলির মুখে তৃণমূল কর্মীদের জমায়েত এবং স্লোগানের জেরে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। পুলিশকে টপকে বিজেপি কর্মীরা তৃণমূলের জমায়েতের দিকে তেড়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। দফায় দফায় পুলিশ-বিজেপি ধস্তাধস্তি হয়। তাই শাহ পুরো পথ রোডশোয়ের জন্য নির্মিত ‘রথ’-এ চেপে যাননি। মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ির গলির কিছু আগেই তিনি নেমে পড়ে কনভয় নিয়ে সার্ভে বিল্ডিং-এর দিকে চলে যান। রাজ্য বিজেপির একাংশের দাবি, শাহের কর্মসূচি ঘিরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা মাথায় রেখেই দক্ষিণে মোদীর কর্মসূচির ভাবনা বিজেপি বাতিল করেছে। মোদীর কর্মসূচি ঘিরেও ওই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে এবং তার জেরে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে তৃণমূল তার ফায়দা নিতে পারত বলেই বিজেপির ওই অংশের ব্যাখ্যা। প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে শাহের রোডশো চলাকালীন উত্তর কলকাতায় বিদ্যাসাগর কলেজের সামনে বিজেপি-তৃণমূল সংঘর্ষ বিজেপির জন্য বিড়ম্বনার কারণ হয়েছিল। বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙচুরের দায় পুরোপুরি বিজেপির উপরে চাপিয়ে দিয়েছিলেন মমতা। রাজ্য বিজেপির একাংশের বক্তব্য, এ বার আর তেমন ‘সুযোগ’ মমতাকে বিজেপি দিতে চায়নি।

Advertisement
আরও পড়ুন