‘ব্যক্তি’ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের গল্পে সুমন মুখোপাধ্যায়। ছবি: ফেসবুক।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে যখন প্রস্তাব দেওয়া হয় ‘কিং লিয়র’ করার জন্য, তখন উনিই বলেন, “সুমন যদি নির্দেশনা দেয় তবেই করব।” আমাকেও একই অনুরোধ জানিয়েছিলেন। আমি রাজি হলাম। শুরু হল কাজ।
আগেও আমার সঙ্গে সৌমিত্রবাবুর পরিচয় ছিল। কিন্তু সেই পরিচয় ‘কেজো’ পরিচয় নয়। আমি ওঁর সঙ্গে তাঁর আগে কোনও কাজ করিনি। প্রথম দিনের মহড়ায় স্বাভাবিক ভাবেই একটু আশঙ্কিত, উনি কী ভাবে কাজ করবেন। তার উপরে মিনার্ভা রেপরেটরিতে এক ঝাঁক তরুণ অভিনেতা। তাঁদের সঙ্গে মিলেমিশে একজন ওঁর মতো খ্যাতনামী কি কাজ করতে পারবেন? এই দ্বিধা নিয়েই গিয়েছিলাম সে দিন। প্রথম দিনেই সমস্ত আশঙ্কা ধূলিসাৎ। সৌমিত্রবাবু নিজেই যেন মাটিতে নেমে এলেন! দেখলাম, ‘মাটির মানুষ’-এর ভিতরে প্রচুর প্রতিভা। আর শিশুর সারল্য। বহু অভিনয়ের পরেও তাঁর ভিতরের সেই সবুজ, অবুঝ কাঁচা মন লালন করেছিলেন। সেই কারণেই তরুণ অভিনেতাদের সঙ্গে মিশে যেতে একটুও সমস্যা হয়নি।
আর একটা ঘটনাও ঘটেছিল। মহড়া চলাকালীন ওঁকে দেখে সবাই আকৃষ্ট! শুধু নারী কেন, পুরুষও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্য পাগল। আমিই মুগ্ধ হয়ে দেখতাম!
শুধু ওঁকে দেখে নয়, ওঁর কাজ দেখেও আমরা মুগ্ধ ওঁর প্রতি। কিংবদন্তি অভিনেতা। অথচ রাগ, ট্যানট্রাম কিচ্ছু দেখাননি! বরং উনিই আশঙ্কিত ছিলেন। কারণ, তখন সৌমিত্রবাবু একটু একটু ভুলতে শুরু করেছেন। এ দিকে রাজা লিয়রের মুখে অনেক সংলাপ। মুখস্ত রাখতে পারবেন কি না, এই ভয় কাজ করত তাঁর মধ্যে। বারে বারে সংলাপ ঝালিয়ে নেওয়া। প্রয়োজনে আমার অনুমতি নিয়ে সংলাপের কিছু ভাষা বা শব্দ বদলানো। শুরুতে ভেবেছিলাম, ওঁর একজন ‘ডামি’ নেব। তাঁকে দিয়ে কোরিওগ্রাফি করব। সৌমিত্রবাবুকে বলব, দেখে নিন। তার পর আপনি করুন। প্রচুর মহড়া দিতে হয়। সৌমিত্রবাবু শুনেই তা তৎক্ষণাৎ নাকচ করে দিলেন। বললেন, “ও রকম কোনও দরকার নেই। তুমি যে রকম ভাবে করতে চাও, যত বার করতে চাও তত বার করব।”
আরও একটা বিষয় মহড়া দিতে গিয়ে ঘটেছিল। সিংহভাগ অভিনেতা তরুণ। তাঁদের মহড়ার পরে নোট দিই। ওঁকে তাঁদের সঙ্গে দেব কী করে! তাই বলেছিলাম, আপনার নোটটা ব্যক্তিগত ভাবে দেব। রাজি হননি সৌমিত্রবাবু। জানিয়েছিলেন, বাকিদের মতোই বাকিদের সঙ্গে যেন তাঁকেও নোট দিই। এই আচরণগুলোই বুঝিয়ে দিয়েছিল, সমস্ত অহং ত্যাগ করে কী ভাবে সকলের সঙ্গে ‘এক’ হয়ে গিয়েছিলেন ওঁর মতো অভিনেতা। বহু বিদেশি পরিচালকের লেখায় পড়েছি, তাঁরা তারকাদের দিয়ে কী ভাবে কাজ করিয়েছেন। আমার জীবনে সেই উদাহরণ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় স্বয়ং।
আর একটা কথা না বললেই নয়। আমি ওঁর থেকে বয়সে নবীন। কিন্তু পরিচালক। সৌমিত্রবাবু অনায়াসে সেই মর্যাদা দিয়েছেন। আমি যখন তরুণ অভিনেতাদের কিছু বলছি বা পরামর্শ দিচ্ছি, তিনি মাঝে ঢুকে পড়ে কখনও কোনও দিন কথা বলেননি। কেউ ওঁর থেকে পরামর্শ চাইলে তখন দিতেন। কিন্তু সেটাও আমার কথাশেষের পর। কখনও সীমারেখা লঙ্ঘন করেননি। পরামর্শ দিয়েও বলতেন, “যা করবে, সুমনকে জিজ্ঞাসা করে করবে।”
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় যাঁকে যা সম্মান দেওয়ার সেটা জানাতে একটুও কুণ্ঠিত হতেন না।
রইল বাকি অমানুষিক পরিশ্রম। সৌমিত্রবাবুর সঙ্গে একসঙ্গে যাতায়াত করতে করতে অনেক আড্ডা দিতাম আমরা। কখনও ওঁর ফেলে আসা দিন নিয়ে। কখনও আমাদের নাটক নিয়ে। কখনও ক্লান্ত হতে দেখিনি। আর এই পরিশ্রম সৌমিত্রবাবু করতেন কারণ, তিনি প্রকৃত শিল্পী ছিলেন। নিজের সেরা উজাড় করে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা ছিল ওঁর মধ্যে। সেই তাড়নাই ওঁকে দিয়ে পরিশ্রম করিয়ে নিত। কেবল দুপুরে খাওয়ার পর আধ ঘণ্টা বিশ্রাম নিতেন। খুব আন্তরিক ভাবে অনুরোধ জানিয়েছিলেন, “সুমন, এই অবকাশটুকু যদি আমায় দাও।”