Death Of Rahul Arunodoy

‘অনুমতি নিতে গেলে প্রশাসন ওখানে শুটিং করতে দিত না, সিস্টেমে প্রচুর গলদ! কিছু ঘটলেই ফাঁকফোকর বেরিয়ে পড়ে’

“আপনি-আমি হয়তো ভুলে যাব। রাহুলের মা, ছেলে সহজ তো ভুলবে না। ওঁদের তো জানা দরকার, কী করে চলে গেল ও!”

Advertisement
সোহিনী সরকার
শেষ আপডেট: ০৪ এপ্রিল ২০২৬ ২০:৩০
সোহিনী সরকার।

সোহিনী সরকার। ছবি: ফেসবুক।

আমরা যে জায়গায় থাকি, সেখানে একটা কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে প্রচুর ফাঁকফোকর বেরিয়ে পড়ে। আমরা তার উপরে কার্পেট বিছিয়ে গর্তগুলো ঢেকে রাখার চেষ্টা করি। যেন দেখানোর চেষ্টা করি, আমরা খুব ভাল আছি। আসলে, প্রচুর প্রচুর গলদ তো!

Advertisement

আগের বারও যেটা হয়েছিল। তিলোত্তমার সময়ে কেউ বলছেন বাথরুমের কথা। কেউ এটা চাইছেন। কেউ ওটা চাইছেন। পকসো আইন নিয়ে কথা হচ্ছে। মহিলাদের রাতের নিরাপত্তা নিয়ে কথা হচ্ছে। যাতে বাসের ব্যবস্থা থাকে। কারণ, দরকারে ওলা-উবর পাওয়া যায় না। সবার পক্ষে ওলা-উবর চড়া সম্ভবও নয়।

আমিও পথে নেমেছিলাম। সেখান থেকে উপলব্ধি, আমাদের সবারই যে আন্দোলন করার খুব অভিজ্ঞতা আছে, এমন তো নয়! আমরা আবেগতাড়িত হয়ে পথে নেমেছিলাম। তাই একটা সময়ের পরে মনে হয়েছিল, আমরা আসল উদ্দেশ্য থেকে সরে গিয়েছি। যাঁরা দোষী, তাঁদের শাস্তি না চেয়ে আমরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবিত হয়ে পড়েছিলাম। এটাই বা অস্বীকার করি কী করে যে, আমাদেরও নিরাপত্তা দরকার।

এই পরিস্থিতি বুঝিয়ে দিল, আমাদের সিস্টেমে প্রচুর গন্ডগোল। সবার আগে প্রয়োজন সেই সিস্টেম ঠিক করা। কিন্তু একটা করে তো ধাপ পেরোতে হয়। যেমন, আমরা প্রথমে নীচের তলা থেকে একতলায় উঠি। তার পর দোতলায়। একটানা ২০ তলায় কি ওঠা সম্ভব? উঠতে গেলে পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ব। এ বারেও তাই। এ বারেও অনেক গলদ চোখে পড়ছে। অনেক ফাঁকফোকর নজরে আসছে।

একটা কথা বলি, আমরা অভিনেতারা শুটিং করতে গিয়ে কমবেশি প্রায় সকলেই দুর্ঘটনার মুখোমুখি হয়েছি। বিশেষ করে আউটডোর শুটিংয়ে। এ বার দুর্ঘটনা এড়ানো গেল না। হওয়ার পরে আমরা আবার নড়েচড়ে বসলাম। হয়তো ভুলেও যাব। কারণ, আমাদের চারপাশে এত ঘটনা! সহজ কিন্তু ভুলতে পারবে না। রাহুলের মা-ও ভুলতে পারবেন না, প্রিয়াঙ্কাও। ওঁদের জন্য উত্তরগুলো তো চাই।

কেন একজন অভিনেতার মৃত্যুর পর এত রকমের কথা? এক জন বলছেন, শুটিং প্যাকআপ হয়ে গিয়েছিল। কেউ বলছেন, রাহুল নিজেই গভীর জলে চলে গিয়েছিল। কেউ বলছেন, ও নাকি মদ্যপ অবস্থায় ছিল। আমরা যাঁরা রাহুলের কাছাকাছি থাকি, আমরা জানি, রাহুল অনেক বছর হল মদ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল। সকলের ‘ক্যালাসনেস’ রাহুলের মৃত্যুর জন্য দায়ী। আমি জানি, পুলিশের থেকে অনুমতি নিতে গেলে কিছুতেই প্রশাসন ওখানে শুটিং করতে দিত না। কারণ, জায়গাটা ভয়ঙ্কর। মন্দারমণি, তাজপুরে দেখেছি, প্রশাসন জলে নামতেই দেয় না! দরকারে ধমকধামক দিয়ে জল থেকে তুলে নিয়ে আসে। সেখানে তাঁদের আড়াল করতে গিয়ে কত বড় অঘটন ঘটে গেল!

রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য পথে টলিউড।

রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য পথে টলিউড। নিজস্ব চিত্র।

প্রত্যেকটা ঘটনা আসলে প্রত্যেকের সঙ্গে জড়িয়ে। রাহুলের কথা বলতে গিয়ে দক্ষিণ ভারতীয় একটি ছায়াছবির কথা মনে পড়ছে। বৃষ্টিতে জল জমেছিল রাস্তায়। ঝড়বৃষ্টিতে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে গর্তের মধ্যে পড়েছিল। সেই গর্তে পড়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গিয়েছিল একটি শিশু। স্কুলের ছোট্ট ভ্যানগাড়িতে করে যাতায়াত করত সে। শিশুটি মারা যেতেই পুরসভা থেকে স্কুল কর্তৃপক্ষ হয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ সংস্থা— সবাই কাঠগড়ায়। কারণ, সকলেই যে সকলের ঘাড়ে দোষ ঠেলে দেয়!

আমাদেরও সেই একই দশা! প্রকৃত কারণ খুঁজতে গিয়ে একে অন্যকে ঠেলছি।

রইল বাকি ক্ষতিপূরণের কথা। আনন্দবাজার ডট কম-এর তরফে জানতে চাওয়া হয়েছিল, ক্ষতিপূরণ নিলে কি রাহুলের মৃত্যু ধামাচাপা পড়ে যাবে?

আমার সেটা মনে হয় না। কারণ, রাহুলের মায়ের জীবনযাপনের জন্য বা সহজকে বড় করতে গেলে অর্থের তো প্রয়োজন আছেই। প্রিয়াঙ্কাই বা একা কী করে সব সামলাবে? এটাও ঠিক, ‘ক্ষতিপূরণ’ শব্দটা বড্ড কানে বাজে। টাকার বিনিময়ে কোনও মানুষের অসময়ে চলে যাওয়ার মতো ‘ক্ষতি’ কি সত্যিই মেটানো যায়?

Advertisement
আরও পড়ুন