Deepali Sahay Interview

‘কেরিয়ার শেষ, গাইতে পারবেন না!’ ‘ইন্ডিয়ান আইডল’ থেকে এআর রহমানের গায়িকা, কেমন ছিল দীপালীর সফর?

বিহারের মেয়ে। ‘ইন্ডিয়ান আইডল সিজ়ন ৩’-এর প্রতিযোগী। করেছেন সঞ্চালনাও। প্রায় ১৯ বছর পরে খ্যাতি পেলেন দীপালী সহায়। ইমতিয়াজ় আলির ছবিতে গান গেয়ে সাড়া ফেলেছেন। আনন্দবাজার ডট কম-এর মুখোমুখি গায়িকা।

Advertisement
সম্পিতা দাস
শেষ আপডেট: ২৯ জুন ২০২৬ ০৮:৫৬
রহমানের সুর ইমতিয়াজ়ের ছবি কেমন অভিজ্ঞতা গায়িকা দীপালী সহায়ের?

রহমানের সুর ইমতিয়াজ়ের ছবি কেমন অভিজ্ঞতা গায়িকা দীপালী সহায়ের? গ্র্যাফিক্স: আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক।

বক্সঅফিসে সাফল্য লাভ করেছে ইমতিয়াজ় আলির নতুন ছবি ‘ম্যায় ওয়াপস আয়ুঙ্গা’। লোকমুখে ছবির প্রশংসা। প্রেক্ষাগৃহমুখী দর্শক। একই সঙ্গে ছবির অন্যতম গানও জনপ্রিয়, ‘তেরে পাস ম্যায়’। ইরশাদ কামিলের লেখা, এআর রহমানের সুরে গানটি গেয়েছেন দীপালী সহায়। ‘ইন্ডিয়ান আইডল সিজ়ন ৩’-এর প্রতিযোগী ছিলেন দীপালী। ২০০৭ সাল। এর পরে দীর্ঘদিন প্রচারের আলোর বাইরে ছিলেন। যদিও ভোজপুরি গান, গজ়ল-সহ নানাবিধ ঘরানার গান প্রতিনিয়ত চর্চা করে গিয়েছেন। ১৯ বছরের অপেক্ষার পরে রহমানের গায়িকা তিনি। সঙ্গে সাফল্যের স্বাদ। এই আবহে আনন্দবাজার ডট কম-এর মুখোমুখি দীপালী সহায়।

Advertisement

প্রশ্ন: সাফল্য কেমন উপভোগ করছেন?

দীপালী: দর্শকের থেকে এত ভালবাসা পাচ্ছি। সকলে রিল তৈরি করছেন, গান গেয়ে পাঠাচ্ছেন— এ সব মুহূর্তের সবটা চেটেপুটে উপভোগ করে নিতে চাইছি। আমি আপ্লুত। ইমতিয়াজ় আলির ছবি, এআর রহমানের সুর, ইরশাদ কামিলের কথায় আমার কণ্ঠ, এ যেন স্বপ্নপূরণের মতো। যে ভাবে সকলের ভালবাসা পাচ্ছি, নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছে।

প্রশ্ন: এই সুযোগটা পেতে ১৯টা বছর সময় লাগল। ধৈর্য্য ও নিজের উপর বিশ্বাস রাখাটা কতটা কঠিন ছিল?

দীপালী: সত্যি বলতে, আমি কখনওই কোনও কিছুর অপেক্ষায় ছিলাম না। আমি প্রতিদিন আনন্দে কাটাই। আমার জীবন নিয়ে এতটাই সন্তুষ্ট ছিলাম যে, আমার কখনও মনেই হয়নি যে পিছিয়ে পড়েছি। আমার কোথাও পৌঁছোনোর তাড়াও ছিল না। সেই কারণেই হয়তো ১৯ বছর লেগে গেল। সে দিক থেকে দেখলে, আমি নিজেকে ভাগ্যবান বলব। কারণ, আমি যে ভাবে জীবনটা বাঁচতে চেয়েছি, সে ভাবেই বাঁচছি। লোকে হয়তো বলবে ১৯ বছরের ‘স্ট্রাগল’! কিন্তু আমি এই শব্দটাই ব্যবহার করতে চাই না। আমি শুধু একজন ভাল গায়িকা হতে চেয়েছি। যে শিখে-বুঝে-জেনে গানটা গাইতে পারে। আমি মনে করি, এই সুযোগটা আমার কাছে সঠিক সময়ে এসেছে। কারণ, এই গানটার যা ব্যপ্তি বা গভীরতা, সেটা ১৮ বছরের দীপালী গাইতে পারত না।

প্রশ্ন: আপনি যখন ‘ইন্ডিয়ান আইডল’-এর প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে যান, তখন আপনার বন্ধুরা কাঁদছিলেন। কিন্তু আপনি তো নেচে নেচে গাইছিলেনব্যক্তিজীবনেও কি এতটাই প্রাণবন্ত?

দীপালী: হ্যাঁ, প্রাণবন্ত তো বটেই। একই সঙ্গে আমি কষ্ট নিজের মনে লুকিয়ে রেখে হাসতে পারি। গোটা পৃথিবীর লোকের সামনে কাঁদতে অস্বস্তি হয়। যত ক্ষণ না আমি বলছি, আমার মনের কথা কেউ বুঝতে পারে না।

‘ইন্ডিয়ান আইডল’-এর সময় দীপালী।

‘ইন্ডিয়ান আইডল’-এর সময় দীপালী।

প্রশ্ন: গানের প্রতি আগ্রহ কি ছোটবেলা থেকেই?

দীপালী: আমি বিহারের পটনার মেয়ে। ওই প্রতিযোগিতার জন্য উত্তরপ্রদেশে গিয়ে অডিশন দিই। ফলে ২০০৭ সাল থেকে ওই রিয়্যালিটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই কর্মজীবনের শুরু বলা যায়। এমনিতে বাড়িতে ছোটবেলা থেকেই গান শেখানো হত। ছোটবেলা থেকে কোনও প্রতিযোগিতায় সে ভাবে কখনও হারিনি। কিন্তু, এই গানই আমাকে ছাড়তে হয়। তখন অভিনয় শুরু করি। ‘ইন্ডিয়ান আইডল’-এর একটি সিজ়নে সঞ্চালনা করতে গিয়ে এত কথা বলতে হয়েছিল যে, আমার স্বরযন্ত্র ছিঁড়ে যায়। চিকিৎসকেরা বলে দিয়েছিলেন, গান তো দূর অস্ত্, কথাও বলতে পারব না। তখন টানা ছ’বছর গান থেকে দূরে ছিলাম।

প্রশ্ন: আবার গানে ফেরা কী ভাবে?

দীপালী: তখন ধারাবাহিকে অভিনয় করতাম। সেখান থেকে পরিচালনার প্রতি ঝোঁক বাড়ে। এর পরে আমি এফটিআইতে পরিচালনা নিয়ে পড়াশোনা শুরু করি। ভেবেছিলাম গানের কেরিয়ার শেষ। ২০১৪ সালে আমার সঙ্গে চিত্রগ্রাহক বাবা আজ়মির আলাপ হয়, যিনি অভিনেত্রী শাবানা আজ়মির ভাই। ওঁর বাবা কইফি আজ়মির জন্মবার্ষিকীতে আমাকে গাইতে শোনেন। উনিই বলেন, ‘‘খুব ভুল করছ। গানটা গাওয়া শুরু করো!’’ এর পরে দু’বছর ধরে অল্প অল্প করে রেওয়াজ শুরু করি। নিজের গলাটা ফের তৈরি করতে অনেকটা সময় লাগে। কিন্তু, ওই যে বললাম, আমার জীবনে কখনও কোনও কিছুর তাড়া নেই। সেই জন্যই হয়তো পেরেছি।

প্রশ্ন: গান ছাড়ার কথা যখন বলা হয়, তখন কত বয়স আপনার?

দীপালী: আমাকে যখন গান ছাড়ার কথা বলা হয়, তখন বয়স ছিল ১৮ বছর। একজন নামী চিকিৎসক সতর্ক করেছিলেন, আর গাইলে, কখনও কথাও বলতে পারব না। সেটা শুনে ভয়ই পেয়েছিলাম। তবে গানটা পুরোপুরি ছাড়িনি। মঞ্চের নানা অনুষ্ঠান করতাম। মঞ্চানুষ্ঠানের জন্য যে খুব সুরে গাইতে হয়, তেমন নয়। তবে বেসুরো কখনওই ছিলাম না। তখন ওটাই উপার্জনের একটা রাস্তা হল। এ ছাড়াও অভিনয়টা চলছিল। গানটা তখন গৌণ হয়ে যায়।

প্রশ্ন: গোটা সফরে পরিবারকে পাশে পেয়েছেন?

দীপালী: ভীষণ পেয়েছি। আমার বাবা-ঠাকুরদা, সকলেই পুলিশে চাকরি করতেন। মা ছিলেন গৃহবধূ। ছোটবেলা থেকে স্কুলে সকলে প্রশংসা করতেন, তখনই তাঁরা বুঝেছিলেন যে মেয়ের কণ্ঠস্বর অন্যদের থেকে আলাদা। ছোটবেলা থেকেই খুব জেদি ছিলাম, সব কিছু করতে চাইতাম। তাই খুব স্বাধীন ভাবেই মানুষ করা হয়েছে আমাকে। মা-বাবা খুব উদারমনস্ক।

এআর রহমানের সঙ্গে ফ্রেমবন্দি দীপালী।

এআর রহমানের সঙ্গে ফ্রেমবন্দি দীপালী।

প্রশ্ন: পুরনো একটি ভিডিয়ো এখন ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে মিনি মাথুর বলছেন, ‘‘একটা সময় আসবে, যখন দীপালীর গান গোটা বিশ্ব শুনবে’’ কেমন অনুভূতি হচ্ছে?

দীপালী: কেমন কাকতালীয় ব্যাপার না! এত বছর আগে বলা কথা, এখন ফলল। একেই হয়তো ‘ম্যানিফেস্টেশন’ বলে। গত ১০ বছর ধরে আমি সমাজমাধ্যমে গাইছি। ‘ভোজপুরি ক্লাসিকস’ ও ‘পার্কিং লট’ বলে বেশ জনপ্রিয় দুটো গানের সিরিজ় আছে। সমাজমাধ্যমে অনুসরণকারীরা প্রায়ই বলতেন, ‘তোমার বলিউড থেকে ডাক আসা উচিত।’ কিন্তু আমি নিজে কোনও চেষ্টা করিনি। এই ইন্ডাস্ট্রিতে কেউ পরিচিত নেই আমার। আর আমি কারও থেকে সাহায্য চাইতে পারি না। তবে সমাজমাধ্যমে গান দিতে শুরু করি। এই আশায় যে, যদি কখনও এআর রহমান আমার গান শোনেন। সেটাই সত্যি হল।

প্রশ্ন: ‘তেরে পাস ম্যায়’ গানের প্রস্তাবটা এল কী ভাবে?

দীপালী: আমার আর রহমান স্যারের একই দিনে জন্মদিন। ৬ জানুয়ারি। তিনি আমাকে ইনস্টাগ্রামে ফলো করতেন। ৬ জানুয়ারিই ওঁর অফিস থেকে আমার কাছে ফোন আসে। গান রেকর্ডিং-এর জন্য এর পরে আমি চেন্নাই যাই। বেশ কিছু দিন প্রস্তুতি চলে। কারণ, গানটির উপর অনেকটা ঘষামাজা করা হয়। প্রায় ছ’মাস ধরে চলে এটা। অবশেষে গানটা রেকর্ড করা হয় প্রচার-ঝলক মুক্তির আগের রাতে।

প্রশ্ন: রহমানের কাছ থেকে ফোন পাওয়ার পরে কী অনুভূতি হয়?

দীপালী: যখন রহমান স্যার আমাকে ইনস্টাগ্রামে ফলো করা শুরু করেন, তখনই মনে হয়েছিল যে, কিছু একটা ঘটতে চলেছে! আসলে আমি খুবই আবেগপ্রবণ মানুষ। তাই প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে কেঁদেছিলাম।

প্রশ্ন: রহমান নাকি খুব রাগী? কম কথা বলেন?

দীপালী: আসলে তিনি ‘পারফেকশনিস্ট’। স্যার যে কোনও কাজ নিখুঁত ভাবে করতে ভালবাসেন। শিল্পীর দক্ষতা, প্রতিভা জেনে কাজ করতে ডাকেন। কখনও আপনার এটা মনে হবে না যে, আপনার কোনও খামতি আছে। কোনও নেতিবাচক কথায় কান দেন না। তবে স্যার কম কথা বলেন। রাগী বলে মনে হয়নি।

প্রশ্ন: গানটা আপনি গাওয়ার পরে রহমান কোনও প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলেন?

দীপালী: রেকর্ডিং-এর পরে যখন ওঁর সঙ্গে দেখা হয়, প্রথমেই বলেন, ‘দীপালী গানটা দারুণ গেয়েছেন।’ সেই অর্থে আমার প্রথম প্রশংসা তিনিই করেছিলেন।

প্রশ্ন: ইমতিয়াজ় আলির তরফে কোনও ‘ব্রিফিং’ দেওয়া হয়েছিল?

দীপালী: ওঁর সঙ্গে একবারই দেখা হয়। আমার গান তিনি পছন্দ করেছেন। ছবিতে একটা দৃশ্য আছে, যেখানে মৃত্যুশয্যায় নাসিরউদ্দিন শাহ তাঁর প্রেমিকার ছবির দিকে তাকিয়ে বিদায় নেওয়ার অনুমতি চাইছেন। সেখানে গানের একটা স্তবক আমি ভালবাসা দিয়ে গেয়েছিলাম। ইমতিয়াজ় স্যার সেখানটা ভালবাসা নয়, বক্তব্য রাখার ভঙ্গিতে গাইতে বলেছিলেন। সূক্ষ্ম বিষয়ে নজর ওঁর। তার ফলে গানটা শুনতে একেবারে অন্যরকম হয়ে যায়।

প্রশ্ন: আপনি দীর্ঘদীন ধরে ভোজপুরি গান গাইছেন এখনও শ্রোতাদের একাংশ এই গান শুনে নাক সিঁটকোয় আপনার কী মত?

দীপালী: এই বিষয়টা একেবারেই ভাল লাগে না। কিন্তু দোষ কাকে দেব? যাঁরা ভোজপুরি গানকে দোষ দেন, তাঁরা কতটা ভাষাটা জানেন, তা নিয়ে সংশয় আছে আমার। এই ভাষাটার উপর আমার ভালবাসা রয়েছে। তাই আমার ভাল কিছু করা উচিত বলেই মনে হয়। তবে এখন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি খানিক বদলাচ্ছে।

প্রশ্ন: এর জন্য কটাক্ষ শুনতে হয়েছে?

দীপালী: হ্যাঁ, বহু বার। লোকে ভোজপুরি গান গাইতে বারণ করেছিল। ওই গান গাইলে নাকি অন্য গান গাওয়ার সুযোগ পাব না। তবে এ সব কথায় কান দিই না। আমি জানি, নিজের কাজটা মন দিয়ে করতে হবে। আজকে দেখুন, আমার গাওয়া ভোজপুরি গান শুনেই কিন্তু রহমান স্যার আমাকে ডেকেছেন।

প্রশ্ন: দীর্ঘদিন ধরে মুম্বইয়ে থাকছেন। কখনও কোনও পরিচালককে গান শোনাননি?

দীপালী: সত্যি কারও কাছে গিয়ে কাজ চাইনি। কারণ, এই ইন্ডাস্ট্রিতে মানুষ সাহায্য করলে, পাল্টা কোনও না কোনও সাহায্য চায়। ‘ইন্ডিয়ান আইডল’ থেকে বেরোনোর পরে এক পরিচিত যন্ত্রশিল্পী আমাকে ‘সাওয়ারিয়া’ ছবির সুরকার মন্টি শর্মা ও নায়ক রণবীর কপূরের সঙ্গে দেখা করান। তার পরেই তিনি এক রাশিয়ান মেয়েকে আমার বাড়িতে রাখার অনুরোধ করেন। এই ঘটনার পরে সাবধানী হয়ে যাই।

প্রশ্ন: আপনার স্বামীও রিয়্যালিটির অনুষ্ঠানের বিজয়ী, তাঁর কী প্রতিক্রিয়া?

দীপালী: আমার স্বামী ঐশ্বর্য নিগম ২০০৬ সালে ‘সারেগামাপা’ জিতেছিলেন কলকাতার উজ্জয়িনী মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে যৌথ ভাবে। ওই রিয়্যালিটি অনুষ্ঠানে অডিশন দিতে গিয়েই ওকে প্রথম দেখেছিলাম। ওর যদিও সেটা মনে নেই। তার পর বেশ কিছু অনুষ্ঠানে দেখা হয়। ২০১৮ সালে বিহার সরকারের একটা অনুষ্ঠানে গিয়ে কথাবার্তা শুরু হয়। তার পরের বছর বিয়ে হয় আমাদের। ঐশ্বর্য আমার থেকেও বেশি খুশি। আসলে ঐশ্বর্য কখনও আমাকে রোজগার করতে জোর করেননি। বরং আমার যত্ন নিয়েছেন। ‘প্রফেশনাল মাইক্রোফোন’-এ কী ভাবে গাইতে হয়, সেটা ওঁর কাছ থেকেই শেখা আমার।

স্বামী ঐশ্বর্য নিগমের সঙ্গে দীপালী।

স্বামী ঐশ্বর্য নিগমের সঙ্গে দীপালী।

প্রশ্ন: এ বার ভবিষ্যতের পরিকল্পনা কী?

দীপালী: এই গানটি তো বলতে গেলে আমার কোলে এসে পড়েছে। আমি কিছু না চাইতেই পেয়েছি। ঈশ্বরই আমাকে রহমান স্যারের সামনে নিয়ে ফেলেছিলেন। এখন তাই যত বড় বড় সঙ্গীত পরিচালক আছেন, সকলের সঙ্গে কাজ করতে চাই।

Advertisement
আরও পড়ুন