‘বিশ্বাস ব্রাদার্স’ অস্তমিত! টলিউডের কী হবে? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় নেই। টালিগঞ্জে বিজেপি-র পাপিয়া অধিকারীর কাছে পরাজিত অরূপ বিশ্বাস। গত বছরে ফেডারেশনের সভাপতিত্বের সময়সীমা শেষ স্বরূপ বিশ্বাসেরও। ‘বিশ্বাস ব্রাদার্স’-এর অনুপস্থিতিতে কি তা হলে টলিউড ‘অভিভাবক’হীন? না কি নতুন করে ‘স্বাধীন’ হতে চলেছে ১০০ বছরের পুরনো ইন্ডাস্ট্রি!
উত্তর খুঁজতে পিছনে ফেরা দরকার। রাজনৈতিক পালাবদল প্রতি বার টলিউডে ছায়া ফেলেছে। কংগ্রেস আমল থেকে তার শুরু। বাম জমানাতেও বাংলা বিনোদনদুনিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব ছিল। কিন্তু সবটাই প্রচ্ছন্ন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকার গড়ার পর টলিউডের ‘বিশ্বাস ব্রাদার্স’-এর দাপট শুরু। তখন টলিপাড়ার অন্দরে এমন কথাও শোনা গিয়েছে, টালিগঞ্জের গাছের পাতাও নাকি ‘বিশ্বাসদের নিঃশ্বাসে নডে’!
স্বরূপ বিশ্বাস আর ফেডারেশনের সভাপতি নন। এখনও সংগঠনের সাধারণ নির্বাচন হয়নি। ফলে, ফেডারেশনের শীর্ষে কেউ নেই। এত দিন সংগঠনের সভাপতিকে জানিয়েই শুটিং সংস্ক্রান্ত যাবতীয় কাজ করতেন সব মাধ্যমের প্রযোজকেরা। একই ভাবে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অরূপ বিশ্বাসের পরাজয়ে অস্তিত্ব নেই তাঁদের তৈরি স্ক্রিনিং কমিটিরও। বাংলা ছবিমুক্তির বিষয়টি এই কমিটি দেখাশোনা করত। বিশেষ করে, উৎসবের সময়ে যাতে একসঙ্গে একমুঠো বাংলা ছবি মুক্তি না পায়, এই বিষয়টিই দেখার জন্য জন্ম স্ক্রিনিং কমিটির।
ফেডারেশনের সভাপতি এবং স্ক্রিনিং কমিটির অনুপস্থিতিতে টলিউডের ছবিমুক্তি, শুটিং ইত্যাদি বিষয়গুলো তা হলে দেখবেন কে? কার ‘অনুমতি’তে চলবে টলিউড? উঠেছে প্রশ্ন। সবিস্তার জানতে আনন্দবাজার ডট কম কথা বলেছিল গিল্ডের সম্পাদক, একাধিক প্রযোজক, পরিচালক, ইমপা-র সভাপতির সঙ্গে।
কী বলছেন প্রযোজকেরা? ছবি: ফেসবুক।
প্রযোজক ফিরদৌসল হাসান ইমপা-র অন্যতম সদস্য। তিনি স্ক্রিনিং কমিটির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। প্রশ্ন করতেই প্রযোজক বললেন, “সবটাই শুনেছি। কিন্তু আনুষ্ঠানিক ভাবে এখনও কোনও কিছুই জানানো হয়নি। ফলে, বাকিদের মতো আমিও বিষয়টি সময়ের উপরে ছেড়ে দিয়েছি। আমাদের ইন্ডাস্ট্রির বয়স ১০০ বছরেরও বেশি। আগে প্রযোজকেরা স্বাধীন ভাবে ছবিমুক্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করতেন। সেটাই হয়তো ফিরে আসবে আবার।” আপাতত ফিরদৌসলের কোনও ছবির শুটিং চলছে না। এখন ছবিমুক্তিও নেই তাঁর। তাই বিষয়টি নিয়ে ততটাও মাথা ঘামাচ্ছেন না প্রযোজক। তাঁর আরও বক্তব্য, “ফেডারেশন সভাপতি নেই, এই বিষয়টি জানতাম না। নিশ্চয়ই নির্বাচন করে কেউ ওই পদে বসবেন। আগামী দিনে তাঁর সঙ্গে সবাই আলাপ-আলোচনা করে কাজ করলে আমিও সেটাই করব।”
ফিরদৌসলের কথা সুর ইমপা সভাপতি পিয়া সেনগুপ্তের কথাতেও। স্ক্রিনিং কমিটি নেই, সে কথা তিনি এর আগের সাংবাদিক বৈঠকেই জানিয়েছেন। সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে পিয়ার বক্তব্য, “আগে কমিটি ছিল না। সব প্রযোজক স্বাধীন ভাবে ছবিমুক্তির দিন ঘোষণা করতেন। নতুন করে কমিটি তৈরি না হলে সেই সময়টাই আবার ফিরে আসবে।”
স্ক্রিনিং কমিটির বৈঠকে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, দেব, অরূপ বিশ্বাস। ছবি: সংগৃহীত।
প্রসঙ্গত, স্ক্রিনিং কমিটির প্রয়োজন নেই, এ কথা প্রথম বলেছিলেন অভিনেতা-রাজনীতিবিদ দেব। এর আগে একাধিক সাক্ষাৎকারে দেব আনন্দবাজার ডট কম-কে বলেছেন, “কমিটি কখনও ঠিক করে দিতে পারে না, কোন প্রযোজক কখন তাঁর ছবির মুক্তি দেবেন। ক্যালেন্ডার বানিয়ে ছবিমুক্তির ঘোষণা হয় না। কারণ, হাজার বাধাবিপত্তির মধ্যে দিয়ে একটি ছবি তৈরি হয়।” তিনি আরও বলেছিলেন, “আগে প্রযোজক-পরিচালকেরা স্বাধীন ভাবে, নিজেদের পছন্দমতো সময়ে ছবিমুক্তি ঘটাতেন। এতে হয়তো সাময়িক মতবিরোধ তৈরি হত। কিন্তু পরে তা মিটেও যেত। কমিটি তৈরি হওয়ার পরে দেখছি, ইন্ডাস্ট্রির অন্দরে সারা ক্ষণ ঝগড়া! কমিটি যদি তার কারণ হয়, তা হলে অবিলম্বে সেই কমিটি তুলে দেওয়া উচিত।”
বিধানসভা নির্বাচনের আগে মহুয়া রায়চৌধুরীর আত্মজীবনী ছবি ‘গুন গুন করে মহুয়া’র শুটিং শুরু করেছিলেন প্রযোজক রানা সরকার। নির্বাচনের আগে শুটিং বন্ধ রাখেন তিনি। খবর, এখনও তাঁর ছবির দ্বিতীয় পর্যায়ের শুটিং শুরু হয়নি। কাজ স্থগিত রাখার কারণ কি রাজনৈতিক পালাবদল এবং টলিউডের ‘অভিভাবকত্বহীনতা’? জবাবে প্রযোজক বলেন, “একেবারেই তা নয়। আমরা অভিনেতাদের বিরতি দিয়েছিলাম ভোট এবং তাঁদের বিশ্রামের জন্য।” তিনি জানিয়েছেন, কলকাতায় শুটিং করতে গেলে ফেডারেশনকে জানাতে হয় না। আউটডোর শুটিংয়ের সময় খুঁটিনাটি তথ্য জানাতে হয় কলাকুশলীদের নিরাপত্তার কারণে। তিনি চলতি মাসের শেষ থেকে ফের শুটিং শুরু করবেন। “কলকাতাতেই শুটিং হবে। কলাকুশলীদেরও বদলাচ্ছি না। ফলে, আমার আলাদা করে অনুমতি বা কাউকে জানানোর প্রয়োজন নেই।”
একই কথা শোনা গিয়েছে ছোটপর্দার অন্যতম প্রযোজক স্নিগ্ধা বসুর কথাতেও। এই মুহূর্তে ছোটপর্দায় তাঁর তিনটি ধারাবাহিক চলছে, ‘কুসুম’, ‘সাত পাকে বাঁধা’, ‘মিলন হবে কত দিনে’। স্নিগ্ধা সাফ বলেছেন, “আমরা আগেও নিয়ম মেনে কাজ করেছি। স্বরূপ বিশ্বাস আসার পরে সেই নিয়ম বেড়েছে বই কমেনি। এখনও তাঁর অনুপস্থিতিতে নিয়ম মেনেই কাজ হচ্ছে। আমরা কেউ বেআইনি কাজের পক্ষপাতী নই। কারণ, আমাদেরও সংসার রয়েছে। আর আমরা কলকাতার মধ্যেই শুটিং করি। ফলে, আলাদা করে অনুমতি এমনিতেই নিতে হয় না।” তাঁর অনুযোগ, ‘বিশ্বাস ব্রাদার্স’-এর অহেতুক বাধা-নিষেধের কারণে ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ কমে গিয়েছিল। বাইরে থেকে কলকাতায় শুটিং করতে আসতে চাইছিলেন না অন্য রাজ্যের প্রযোজকেরা। স্নিগ্ধার আশা, এ বার হয়তো সেই সমস্যা মিটবে। আবার হয়তো ভিন্রাজ্যের প্রযোজকেরা বাংলায় কাজ করতে আগ্রহী হবেন।
পরিচালক পৃথা চক্রবর্তী। ছবি: ফেসবুক।
পরিচালক পৃথা চক্রবর্তী। স্ক্রিনিং কমিটির ক্যালেন্ডার অনুযায়ী তাঁর আগামী ছবি ‘ফেরা’ মুক্তি পাবে ২৯ মে। রাজনৈতিক পালাবদল, স্ক্রিনিং কমিটির অবলুপ্তি কি ছবিমুক্তির তারিখ বদলে দিল? প্রশ্ন ছিল পৃথার কাছে। পরিচালক বললেন, “আমার ছবি নির্দিষ্ট সময়েই মুক্তি পাচ্ছে। তবে নিয়মকানুন বা শৃঙ্খলা থাকলে যে কোনও কাজ ভাল হয়। সেই জায়গা থেকে মনে হয়, কেউ না কেউ নিশ্চয়ই শূন্য আসন পূর্ণ করবেন। বাকিদের মতো আমিও সে দিকেই তাকিয়ে।”
মাথার উপরে ‘ছাতা’ নেই। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনায় বসেছেন ২৬টি গিল্ডের সম্পাদকেরা। শুধুই ফেডারেশন সভাপতি নয়, একাধিক গিল্ডের সম্পাদকেরও বদল চান সদস্যরা, টলিপাড়ায় কানাঘুষো এমনই। শুটিং, ছবিমুক্তির পাশাপাশি সে প্রসঙ্গ তুলতেই ভেন্ডার গিল্ডের সম্পাদক সৈকত দাস বলেন, “ফেডারেশনের সভাপতি না থাক, সহ-সভাপতি, কার্যকরী সভাপতিরা তো আছেন। তাঁদের কাছেই মেল মারফত শুটিং সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য জানাচ্ছেন প্রযোজকেরা। কোথাও কোনও বিশৃঙ্খলা নেই।” তিনি এ-ও জানিয়েছেন, ফেডারেশনের সাধারণ নির্বাচন নিয়ে ইতিমধ্যেই সংগঠনের অন্দরে আলোচনা শুরু হয়েছে। সেই আলোচনায় যোগ দিচ্ছেন গিল্ডের সম্পাদকেরাও। সবটাই সময়সাপেক্ষ। তবে সৈকতেরও মত, “মাথার উপরে অভিভাবক থাকা প্রয়োজন। এতে সুষ্ঠু ভাবে কাজ হয়। তবে কাজ জানা, ইন্ডাস্ট্রির অন্দরের কেউ সভাপতি নির্বাচিত হলে টলিউড আবার উন্নতি করবে।”