ভোটের স্মৃতি নিয়ে খরাজ মুখোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত।
আমার ভোট চাক্ষুষ করা সত্তরের দশকে। তখনও অস্থির অবস্থা ছিল রাজ্যে। কিন্তু এখনকার মতো অবস্থা ছিল না। আসলে ভোটের দিনগুলোয় আগে ছিল ছুটির মেজাজ। আমি ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে যেতাম। পোলিং অফিসারেরা আমাকে দেখে বেশ আদরের সঙ্গেই বলতেন, ‘কী বাবু, তুমি ভোট দেবে?’ আমি তখন মাথা নেড়ে বলতাম, ‘হ্যাঁ দেব।’ আমার মন রাখতে তাঁরা ভোটের কালি লাগিয়ে দিতেন আমার নখে। সেটা পেয়েই যেন আলাদা একটা উৎসাহ আসত। মনে হত, আমিও বাবার মতো বড় হয়ে গেলাম। ভোটকেন্দ্রে পোলিং অফিসারদের সঙ্গে গল্প জমিয়ে ফেলতাম। তার মাঝেই বাবার ভোট দেওয়া শেষ।
আসলে তখন এত হইহট্টগোল, ঝামেলা, ঝগড়াঝাঁটির বিষয় তো ছিল না। এখন ছোটবেলার সেই সুন্দর স্মৃতি মুছে গিয়েছে। ভোট দিতে যাওয়া মানে যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়া! রাস্তায় বেরোলেই বন্দুকের নল, ভোটগ্রহণ কেন্দ্রের বাইরেও উর্দিধারীরা বন্দুক তাক করে বসে থাকে। উনিশ-বিশ হলেই বিপদ। আসলে এখন ব্যাপারটা হল, নিরীহ মানুষের প্রাণ যায় যাক, ভোটটা ঠিক হতে হবে।
আমাদের সময় ভোটে দেখতাম, পাড়ায় মাইকে মাইকে প্রচার হচ্ছে। জনসভা হচ্ছে রাস্তায়। এখন আমরা সমাজমাধ্যম থেকে টেলিভিশন— সর্বত্র ঝগড়া দেখি। ছোটবেলায় একটা জিনিস দেখতাম, রাজনীতির লোকেরা কেউ খেটে খাওয়া, কিংবা কেউ পড়াশোনা জানা মানুষ। আর একটা জিনিস ছিল। আগে যাঁরা রাজনীতিতে অভিজ্ঞ তাঁরাই রাজনীতি করতেন। এখন তো অভিনেতারাই রাজনীতিতে, কী যোগ্যতা আছে তাঁদের? আসলে যে কোনও জিনিস করতে গেলে সেটা শিখতে হয়। কিন্তু শুধু দেশ চালানোর ক্ষেত্রে কোনও শিক্ষার দেখি প্রয়োজন পড়ছে না। অভিনেতা-অভিনেত্রীরা কী এমন করেছেন যাঁরা দেশ চালানোর যোগ্যতা রাতারাতি অর্জন করে ফেলেছেন? আসলে আমার আশেপাশে এত মানুষকে দেখলাম নেতা, বিধায়ক, মন্ত্রী হতে, এখন তো এঁদের সতীর্থ বলতেও খারাপ লাগে। আর রাজনৈতিক নেতা-মন্ত্রীরাই বা অভিনেতাদের সাহায্য নেন কেন? প্রশ্ন জাগে। আমি বীতশ্রদ্ধ।
নিজে প্রথম বার যখন ভোট দিই সেই সময় থেকেই যথেষ্ট রাজনৈতিক ভাবে সচেতন মানুষ ছিলাম। কিন্তু বর্তমানে যা হচ্ছে সেটা দেখেশুনে রাজনীতি থেকে নিজেকে মানসিক ভাবে দূরে সরিয়ে নিয়েছি।
ছোট থেকে যখন বড় হয়েছি তখন দেখেছি, রাজনীতি মানে আদর্শের জায়গা। এই পেশায় আসতে গেলে পড়াশোনার প্রয়োজন। বাড়িতে বড়দের দেখেছি আর্দশের রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে। কিন্তু এখন দেখি, সকলের শুধু ক্ষমতা ও টাকা চাই। আমার বয়স হয়েছে। অভিনয় করে সংসার চালাই। তাই শৈশবের স্মৃতি যেন ধুয়েমুছে যাচ্ছে এই সময়ের এই অস্থির আদর্শহীন একটা সমাজকে দেখে।
ভোট নিয়ে হিংসা বন্ধ করার কিন্তু অনেক উপায় আছে। পৃথিবীতে যখন সব কিছুই অনলাইনে হয়ে যাচ্ছে, ভোটটা কেন করা যাচ্ছে না অনলাইনে? এই প্রশ্নটার উত্তর পাচ্ছি না।
(সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখিত)