প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যের ছবির অভিনব মুক্তি। ছবি: সংগৃহীত।
গতিময়তাই জীবন। চিরকালীন এই আপ্তবাক্যের উল্টো স্রোতে হেঁটে স্লথ জীবনের গান শুনিয়েছে পরিচালক প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যের ছবি ‘নধরের ভেলা’। ছবিটি কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হয়েছে। দর্শকমহলে প্রশংসিতও হয়েছে। অনেকেই তাই এই ছবির প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির অপেক্ষায় অধীর আগ্রহী। কিন্তু প্রথাগত সেই পথে হাঁটতে নারাজ প্রদীপ্ত। আগামী ২১ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় প্রিমিয়ার হবে তাঁর ছবির। তবে কোনও প্রেক্ষাগৃহ বা সিনেমাহলে নয়, ছবিটি মুক্তি পাবে একটি নাট্যমঞ্চে, দক্ষিণ কলকাতার তপন থিয়েটারে। যদিও পরিচালক জানালেন, তাঁর আগের দু’একটি ছবির মুক্তিও নাট্যমঞ্চেই হয়েছিল।
অভিনবত্ব আরও আছে। পরিচালক থেকে অভিনেতা-অভিনেত্রীরাই ছবির প্রদর্শনের দিন সকাল থেকে টিকিট বিক্রি করবেন, তপন থিয়েটারে। আগে থেকে টিকিট সংগ্রহের কোনও ব্যবস্থাই রাখা হচ্ছে না। এমনকি, হলে দর্শকদের আসন গ্রহণ করতেও সাহায্য করবেন পরিচালক ও অভিনেতারা।
এমন অনন্য ভাবনা কেন? আসলে তাঁরা যে স্বাধীন, তাঁদের ছবি যে স্বাধীন, সেই বিশ্বাসে ভর করেই অভিনব উপায়ে ছবিটির মুক্তির আয়োজন করতে চাইছেন তাঁরা, জানালেন পরিচালক প্রদীপ্ত। সাধারণ যেটা হয়ে থাকে, কোনও ছবি মুক্তির দায়িত্ব থাকে পরিবেশকদের হাতেই। তারাই সংশ্লিষ্ট ছবি বিভিন্ন সিনেমাহলে পৌঁছে দেয়। সেই অনুযায়ী নির্ধারিত হয় একটা ছবি কোন কোন সময় দেখানো হবে, কতগুলি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে।
আসলে পরিবেশক অবধি পৌঁছোননি পরিচালক। এ ব্যাপারে প্রদীপ্তের বক্তব্য, ‘‘আমাদের কাছে অত টাকা নেই। পরিবেশকদের মাধ্যমে ছবিমুক্তির জন্য যে পরিমাণ টাকার প্রয়োজন সেটা আমাদের নেই। তার পরে কোন শো পাব, কোনও সময়ে পাব— সেগুলিও একটা বিষয়। তার পর আবার ছবির প্রচারও বিপননের জন্য একটা মোটা অর্থ বরাদ্দ করতে হয় সেটাও নেই আমাদের। তাই আমরা আমাদের ছবি নিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছে যাব। প্রথম শো তেহট্টে, দ্বিতীয় শো (প্রিমিয়ার) হবে কলকাতায়। থিয়েটার ম়ঞ্চে।’’
জানা গিয়েছে, কলকাতায় প্রিমিয়ার হবে ২১ ফেব্রুয়ারি। তার আগে অবশ্য ২৫ জানুয়ারি দেখানো হবে নদিয়ার তেহট্টে। ‘নধরের ভেলা’র শুটিং হয়েছিল তেহট্টে। সেই ভালবাসার টানেই ওখানকার সিনেমারসিকদের উপহার হিসেবে প্রথম শোয়ের জন্য তেহট্টকে বেছে নিয়েছেন পরিচালক। দ্বিতীয় শো, অর্থাৎ আনুষ্ঠানিক প্রিমিয়ারের জন্য বেছেছেন ২১ ফেব্রুয়ারি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসটিকে।
পরিচালক জানালেন, প্রিমিয়ারে কোনও বড় তারকা বা বিশিষ্ট ব্যক্তিকে কোনও নিমন্ত্রণ করা হচ্ছে না। তবে আগ্রহী যে কেউ এসে টিকিট কেটে তাঁর ছবি দেখতে পারেন। কলকাতায় একটাই প্রদর্শন। টিকিট নিঃশেষিত হলে কী করবেন? প্রদীপ্ত জানালেন, সে ক্ষেত্রে দর্শকদের কথা ভেবে পরে আবার শো নেওয়ার চেষ্টা করবেন তিনি।
এই ছবিতে অভিনয় করেছেন অমিত সাহা, ঋত্বিক চক্রবর্তী, প্রিয়ঙ্কা সরকার, শতাক্ষী নন্দী, সায়ন ঘোষ। প্রদর্শনের দিন সবাই হাজির থাকবেন। এখন পর্দায় ছবি দেখানোর জন্য ইউএফও, কিউব-এর মতো বেশ কিছু আধুনিক মাধ্যম রয়েছে। সেই পথেও যাচ্ছেন না তিনি ও তাঁর সঙ্গীরা।
জাতীয় পুরস্কার থেকে শুরু করে একাধিক সম্মান পেয়েছেন ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’, ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’-খ্যাত প্রদীপ্ত। তবু নিজের ছবির জন্য টলিপাড়ার কোনও প্রযোজককেই পাশে পেলেন না? প্রদীপ্ত বলেন, ‘‘টলিপাড়ার প্রযোজকদের সঙ্গে আমার পথ ও মত কোনওটাই মেলে না। আমি আমার ছবিটা আমার মতো করে করতে চাই। সেখানে চিত্রনাট্য থেকে কোন অভিনেতা-অভিনেত্রী নেওয়া হবে— সবটা আমিই বাছি। প্রযোজকের সঙ্গে কাজ করলে একটা বাণিজ্যিক উপাদান ঢোকাতেই হয়।’’ সেই জায়গায় আপোস করতে নারাজ তিনি।
যে কোনও পরিচালকই চান, তাঁর ছবি বৃহত্তর দর্শকের কাছে পৌঁছক। প্রদীপ্তও বাণিজ্যিক সাফল্যের দিকটা মাথায় রাখতে চান। একই সঙ্গে তিনি নিজের দর্শকের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যেতে চান। তাই এমন পরিকল্পনা। মাল্টিপ্লেক্স কিংবা সিঙ্গল স্ক্রিন না হলেও নন্দনে অনায়াসে সিনেমা দেখাতে পারেন স্বাধীন পরিচালকেরা। কিন্তু সেই পথেও হাঁটেননি প্রদীপ্ত। এ ব্যাপারে প্রদীপ্ত জানিয়েছেন, তাঁর ছবির জন্য সরকার বা কোনও ব্যক্তিবিশেষের কাছে কোনও সাহায্য চাননি তিনি। কারণ, তাঁর আগের ছবিগুলির ক্ষেত্রেও নিজেই সব করছেন। এ বারও তাঁর ব্যতিক্রম হবে না।
‘নধরের ভেলা’র এমন মুক্তি প্রসঙ্গে পরিচালক গৌতম ঘোষ জানান, এমন অভিনব উপায়ে ছবি মুক্তি সম্ভব। তাঁর প্রথম ছবি ‘মা ভূমি’র ক্ষেত্রেই এমনটা হয়েছিল। গৌতমের কথায়, ‘‘উনি সহযোগিতা চাইছেন না, ভাল কথা। ওঁর সৎসাহসের জন্য সাধুবাদ জানাচ্ছি। কিন্তু নন্দন-২ ও রাধা স্টুডিয়ো স্বাধীন পরিচালকদের জন্যই তৈরি। সেখানে প্রদীপ্তের চেষ্টা করা উচিত। আসলে এ ভাবে মুক্তি ঘটলে মানুষের প্রতিক্রিয়া সহজে বোঝা যায়। প্রদীপ্তের উদ্যোগ যদি এমনটা ভেবে হয়, তা হলে সেটা ভালই।’’
ইস্টার্ন ইন্ডিয়া মোশন পিকচার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ইম্পা) সভাপতি পিয়া সেনগুপ্ত জানান, এ ভাবে যে একটা ছবি মুক্তি পাচ্ছে সেটাই তিনি জানেন না। তাঁদের কাছে কোনও রকমের প্রস্তাব নিয়েও আসেননি পরিচালক।