(বাঁ দিক থেকে) লোপামুদ্রা মিত্র, সোমলতা আচার্য চৌধুরী, মনোময় ভট্টাচার্য, সুরজিৎ চট্টোপাধ্যায়। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম
গানহীন বাঙালি বোধহয় জলহীন মাছের মতোই! উদ্যাপন, তা যে উদ্দেশ্যেই হোক, গান ছাড়া ভাবতেই পারে না বাঙালি। আর বাঙালির গানের ভান্ডার তো অনন্ত! কারও পছন্দ রবীন্দ্রসঙ্গীত, কারও লোকগান কারও আধুনিক গান, আবার কারও পছন্দের তালিকায় থাকে বাংলা ব্যান্ডের গান। বাংলা নববর্ষের আশপাশে একাধিক জায়গায় নানা ধরনের অনুষ্ঠান করে থাকেন সঙ্গীতশিল্পীরা। পরিবার, বন্ধুবান্ধব নিয়ে গানের আসরে হাজির হয়ে যান দর্শক। তবে ভোটের আবহে খানিকটা হলেও ভাটা পড়েছে গানের অনুষ্ঠানে। বিষয়টি নিয়ে কী বলছে কলকাতার সঙ্গীতমহল?
সঙ্গীতশিল্পী মনোময়ের মতে, ‘বাংলা নববর্ষের পুরো মাস জুড়েই অনুষ্ঠান থাকে আমার। মে মাসে কবিপক্ষ আসে, নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকীও এই মাসেই থাকে। তাই এপ্রিল থেকে মে মাস প্রচুর শো থাকে ঝুলিতে। এতদিনে সেই সব অনুষ্ঠানের জন্য যোগাযোগ করে ফেলেন উদ্যোক্তারা। কিন্তু এ বছর সেই ভাবে কোনও যোগাযোগ কেউ করেননি। বরং নববর্ষের আশপাশে প্রায় পাঁচটি শো বাতিল হয়েছে আমার। বেশ কয়েকটা শোয়ের জন্য যোগাযোগ করা হয়েছিল, একটি শোয়ের টিকিটও পাঠিয়ে দিয়েছিলেন উদ্যোক্তারা। কিন্তু পরে জানান, তাঁরা পুলিশের অনুমতি পাননি। ফলে শো বাতিল।’ প্রতি অনুষ্ঠানের উপর নির্ভর করে তাঁর মিউজ়িশিয়ানদের আয়ও, সেটা নিয়ে চিন্তিত মনোময়।
মঞ্চে মনোময় ভট্টাচার্য। ছবি: সংগৃহীত
অন্য দিকে, নববর্ষের দিনই অনুষ্ঠান করেছেন সঙ্গীতশিল্পী লোপামুদ্রা মিত্র। যদিও তাঁরও মতে, কিছুটা শো কমেছে তো বটেই। এই প্রথম নয়, ভোটের আবহে সবসময়ই শোয়ের পরিমাণ কিছুটা কমে। তবে তিনি হইহই করে বাঁচতেই পছন্দ করেন। সবসময় পজ়িটিভ থাকেন আর মুখে একগাল হাসি। তাই মজা করেই বললেন, ‘‘আমি বেশ ভালই আছি। নববর্ষে ‘প্রথা’-র কাজেও ব্যস্ত থাকতে হয়। তাই সব মিলিয়ে যে কয়েকদিন শো আসছে সেই ক’দিনই করব। নববর্ষের দিন অনুষ্ঠান ছিল কলামন্দিরে, বেশ জমজমাট অনুষ্ঠান হয়েছে। তাই আপাতত আমি এতেই খুশি।’’
অনুষ্ঠানে লোপামুদ্রা মিত্র। ছবি: সংগৃহীত
বুধবার রাত পেরোলেই রাজ্যের একটা বড় অংশ জুড়ে ভোট। তার উত্তাপ ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। মাঠে নেমে পড়েছেন স্থানীয় স্তরের রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা। পাড়ায় পাড়ায় চলছে প্রার্থী চেনানোর প্রক্রিয়াও। এই আবহে গানের অনুষ্ঠানের আয়োজন মোটেই সুবিবেচনার কাজ নয়। ‘ক্যাকটাস’ ব্যান্ডের তরফে সিধুও জানান, ‘‘নববর্ষের দিন প্রতি বছরের মতো এই বছরেও যে শো থাকবে না তা আগের থেকেই আন্দাজ করেছিলাম আমরা, ব্যান্ড সদস্যেরা। অনেক আগে থেকেই ভোটের ঘোষণা হয়েছিল এই বছর। ফলে নববর্ষে শহরে সে রকম শোয়ের ডাক পাইনি। ওপেন এয়ার শোয়ের অনুমতি পাওয়া যাচ্ছে না। তবে ১৮ এপ্রিল অডিটোরিয়ামে একক শো ছিল আমার, সেখানে মোটামুটি ভাল ভিড় ছিল। আবার ২৭ এপ্রিল শিলচরে শো আছে। আসলে ‘যস্মিন দেশে যদাচার’ আর কি!’’ ভোট এলে কি শিল্পীদের চিন্তা হয়? সিধুর কথা, ‘‘পাঁচ বছরে এক বার যে ভোট হয় তাতে বেঁচে গিয়েছি। প্রতি বছর ভোট হলে পকেটে টান পড়ত। এক বছরে নববর্ষে একটু শো কম হল না হয়, ওইটুকু মেনে নিই। আবার শীতকালে তো বিভিন্ন মেলা হয়, ফলে তখন চুটিয়ে শো হয়েছে, ফলে শোয়ের বাজার খারাপ বলা যাবে না। ভোটের পর হয়তো চিত্রটা বদলাবে।’
অনুষ্ঠানের মাঝে সিধু। ছবি: সংগৃহীত
‘সুরজিৎ ও বন্ধুরা’ আপাতত অসমে গানের অনুষ্ঠানেই রয়েছেন। সুরজিৎ চট্টোপাধ্যায় প্রতি বছর শহর বা শহরের বাইরে নববর্ষে অনুষ্ঠান করেন। শিল্পীর মতে, ‘‘ভোটের মধ্যে আর শো কই? নববর্ষের অনুষ্ঠানের জন্য আমার কাছে বহু ফোনই এসেছে। কিন্তু সব শো-ই ভোটের জন্য পিছিয়ে গিয়েছে। ফলাফলের পরে হওয়ার কথা জানিয়েছেন ক্লাবকর্তারা।’’ সেদিন একটি চ্যানেলের অনুষ্ঠানে পারফর্ম করেছেন তিনি।
‘সুরজিৎ ও বন্ধুরা’ র অনুষ্ঠানের ফাঁকে সুরজিৎ চট্টোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত
সুরজিতের কথায়, ‘‘আপাতত ভোটের প্রচারে ব্যস্ত সবাই। তাই অনুষ্ঠানে মন নেই কারও। সার্বিক ভাবেই এখন ব্যাঙ্ক বা কলেজের শো কমেছে। আগে সারা বছর অনুষ্ঠান থাকত। ‘ভূমি’ থাকাকালীন তো টানা শো করেছি আমরা। তবে আশা করে আছি, ভোটের ফলাফলের পর আবার অনুষ্ঠান হবে।’’
সঙ্গীতশিল্পী সোমলতা আচার্য চৌধুরী একটি কলেজের অধ্যাপনার সঙ্গেও যুক্ত। তাই প্রথম থেকেই খুব বেছে বেছে অনুষ্ঠান করেন তিনি। মাসে খুব জোর পাঁচ থেকে ছ’টা অনুষ্ঠান। তাই ভোটের আবহ তাঁকে সেই ভাবে ভাবায়নি। তিনি বলেন, ‘‘ভোটের আবহে স্বাভাবিক ভাবেই ব্যস্ত থাকেন ক্লাবকর্তারা। তাই এই সময় সেই ভাবে লোক জড়ো হন না। অনেক ক্ষেত্রেই প্রচারে সাধারণ মানুষও ব্যস্ত থাকেন। আমি যেমন ১৯ এপ্রিল হাওড়া কলেজে শো করেছি।’’
মঞ্চে সোমলতা আচার্য চৌধুরী। ছবি: সংগৃহীত
শিলাজিৎও হাতেগোনা অনুষ্ঠান করেন। এইসময় এমনিতেও সিজ়নের মতো শো হয় না। শিলাজিতের স্পষ্ট জবাব, ‘‘এ বছরে টুকটাক শো আছে। পয়লা বৈশাখে শো ছিল না। আগের বছরেও ছিল না অনুষ্ঠান। আমার যা পারিশ্রমিক তাতে রোজ শো থাকবে, এমনটা আশাও করি না। আর এমনিতেও এখন আমি কিছুতেই চমকাচ্ছি না, অবাক হচ্ছি না, রাগও খুব কম হচ্ছে। বয়স হচ্ছে বলেই হয়তো। ‘প্রত্যাবর্তন’ ছবিটির প্রচার করছি। আর আশপাশে মিছিল হবে, জমায়েত হবে।’’
অনুষ্ঠানের মাঝে শিলাজিৎ। ছবি: সংগৃহীত
তাঁর যুক্তি, ‘‘ভোটের সময় তো এটাই স্বাভাবিক। তবে এখন যাঁরা ভোটে দাঁড়িয়েছেন তাঁরা যদি অনুষ্ঠান করেন, সে ক্ষেত্রে আলাদা কথা। তবে সে রকম কোনও খবর আসেনি এখনও। হলে মন্দ হবে না!’’