Anoushka Shankar Concert

নেতাজি ইন্ডোরে অনুষ্কা আর অরিজিতের যুগলবন্দি সঙ্গীতজগতকে নবযুগের দিশা দেখাল

ভারত সফরে এসেছেন পণ্ডিত রবিশঙ্করের কন্যা সেতারশিল্পী অনুষ্কাশঙ্কর। রবিবার কলকাতায় তাঁর সঙ্গে মঞ্চে ওঠেন গায়ক অরিজিৎ সিংহও। সে অনুষ্ঠান কেমন হল, লিখলেন শিল্পী তন্ময় বসু।

Advertisement
তন্ময় বসু
শেষ আপডেট: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৬:৫৯
অনুষ্কা আর অরিজিতের যুগলবন্দি, অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিলেন শিল্পী তন্ময় বসু।

অনুষ্কা আর অরিজিতের যুগলবন্দি, অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিলেন শিল্পী তন্ময় বসু। ছবি: সংগৃহীত।

অনুষ্কাশঙ্কর আসায় কলকাতা জুড়ে অনেক হইচই হয়েছে ঠিকই। তবে আমার কাছে এ শুধু ঘরের মেয়ের ঘরে আসা নয়। আমার চোখে, রবিবার ছিল যেন ওঁর পূর্ণতাপ্রাপ্তির উদ্‌যাপন।

Advertisement

অনুষ্কাকে তো সেই ছোট থেকে দেখছি। ওঁর ১৭ বছর বয়স যখন, তখন থেকে একসঙ্গে অনুষ্ঠানও করেছি। আর তা ছাড়া, পারিবারিক যোগাযোগ তো আছেই। রবিবার, চিন্নাম্মার (অনুষ্কার মা, প্রয়াত সেতারশিল্পী পণ্ডিত রবিশঙ্করের স্ত্রী সুকন্যা রাজনকে সে নামেই ডাকি) পাশে বসে যখন তাঁরই কন্যার সঙ্গীতজীবনের ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে অনুষ্ঠান শুনলাম, তখন তা এক অন্য রকম অনুভূতি। মঞ্চের সেতারশিল্পী তখন আর শুধু পণ্ডিত রবিশঙ্করের শিল্পী-কন্যা নন, তিনি এক স্বতন্ত্র ধারার আহ্বায়ক যেন। যখন একের পর এক সুর-তানের মাঝেমাঝে সে সব ভাবছি, তখনই আবার মঞ্চে উঠে এলেন আমার আর এক প্রিয় অনুজ শিল্পী অরিজিৎ সিংহ। অনুষ্কার অনুষ্ঠানের শেষের দিকে এসে ওঁকে ঘিরে যে ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা-ই যেন পূর্ণতা পেল অরিজিৎ এসে অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ায়।

মঞ্চে অনুষ্কা-অরিজিতের যুগলবন্দি জোরালো বার্তা দিয়েছে।

মঞ্চে অনুষ্কা-অরিজিতের যুগলবন্দি জোরালো বার্তা দিয়েছে। ছবি: সংগৃহীত।

আসলে অনুষ্কা সারা পৃথিবীর গান-বাজনা শুনেছেন। ২০১৫ সাল পর্যন্ত আমি ওঁর সঙ্গে মঞ্চে তবলা বাজিয়েছি। তবে তখনও তিনি ছিলেন মূলত উচ্চাঙ্গসঙ্গীতশিল্পী। তখন তিনি যা যা বাজাতেন, তা ছিল মূলত পণ্ডিতজির তৈরি। ফেস্টিভ্যাল ফ্রম ইন্ডিয়া, ইস্ট মিটস ওয়েস্ট— এই সব রবিশঙ্করজির কম্পোজ়িশন। অনুষ্কার সঙ্গে এ সব আমিও বাজিয়েছি। কিন্তু তার পর থেকে ধীরে ধীরে ধরা দিতে শুরু করলেন সঙ্গীতকার অনুষ্কা। তখন শুধু তাঁর বাজনা নয়, নিজের তৈরি সুরও গুরুত্ব পেতে থাকে তাঁর কাজে। তার মধ্যে আরও বহু ধারার সুর, তান ঢুকে পড়ছে। এ বারের অনুষ্ঠানেও নজর করলাম সেটা। ইলেক্ট্রনিক মিউজ়িক ঢুকে পড়ছে ওঁর কাজে। তার সঙ্গে আবার মিশছে ওঁর ভাবনা। এখন আর ওঁর সবটা পণ্ডিতজির মতো বলা যাবে না। এখন তিনি এক জন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রশিল্পী। এক দিকে পারিবারিক ঐতিহ্য ও ধারা বহন করছে ওঁর কাজ, একই সঙ্গে আবার এ সময়ের ভাবনা, সুর, বাজনা ধরা দিচ্ছে।

অরিজিৎ আর অনুষ্কা সমসাময়িক শিল্পী। দু’জনে দু’ধারার সঙ্গীতের মুখ হয়তো। কিন্তু জোরালো বার্তা দিল ওঁদের যুগলবন্দি। অরিজিৎ এসে যখন পণ্ডিতজির তৈরি ‘মায়া ভরা রাতে’ গানটি ধরলেন, সে তো অবশ্যই দারুণ। যে গানটি তিনি গাইলেন, সেটা পণ্ডিতজি বাংলায় তৈরি করেছিলেন। প্রথমে লক্ষ্মীশঙ্করজি গেয়েছিলেন। আর হিন্দিটা গেয়েছিলেন লতাজি (লতা মঙ্গেশকর)। এর পরে পণ্ডিতজির তৈরি আরও দু’টি সরগমও গাইলেন তিনি। অরিজিতের নিজের ভঙ্গি আছে, সে গায়কিতে পণ্ডিতজির সৃষ্টি শুনতে ভালই লাগল। আর তা ছাড়া, উনি তো নিজের একটা জায়গা তৈরি করেছেন এত দিনে, ফলে দর্শকের মধ্যে বেশ উচ্ছ্বাস দেখলাম ওঁর মঞ্চে থাকাকালীন।

অনুষ্কাকে দেখেছি বরাবরই নানা ধারার সঙ্গীত ও সঙ্গীতকারদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করতে। শুধু ভারতীয় উচ্চাঙ্গসঙ্গীতে বেঁধে রাখেননি নিজেকে। ফলে ওঁর মঞ্চে যে অরিজিতের মতো শিল্পীও আসবেন, সেটাই তো স্বাভাবিক। অন্যরা কে কেমন বলবেন জানি না, আমি এতে অনুষ্কার ভাবনার নিজস্বতা লক্ষ করলাম। আর অনুষ্ঠানকক্ষ পুরো ভর্তি ছিল। কলকাতার সঙ্গীতজগতের অনেককেই দেখতে পেয়েছি। পণ্ডিতজির ছাত্রেরা তো ছিলেনই। তরুণ ভট্টাচার্য গিয়েছিলেন, তেজেন্দ্রেনারায়ণ মজুমদার ছিলেন, পার্থসারথি দেশিকানকে দেখতে পেলাম। মনে হয় ওঁদেরও ভাল লেগেছে।

ওঁর ১৭ বছর বয়স যখন, তখন থেকে একসঙ্গে অনুষ্ঠানও করেছি: তন্ময় বসু।

ওঁর ১৭ বছর বয়স যখন, তখন থেকে একসঙ্গে অনুষ্ঠানও করেছি: তন্ময় বসু। নিজস্ব চিত্র।

রবিবার অনুষ্কা আর অরিজিৎকে মঞ্চে দেখে মনে হচ্ছিল, এই তো সেই ছোট্ট মেয়ে বড় হয়ে গিয়েছেন। না হলে সেই পুরনো নেতাজি ইন্ডোরের মঞ্চেই কিনা এমন একটা আবহ তৈরি করলেন ওঁরা! এখানেই তো একসময়ে পণ্ডিতজির সঙ্গে ওঁকে বাজাতে দেখেছি। সে ছিল আর এক সময়। অন্য রকম সময়। অন্য মাত্রার সঙ্গীত। ওঁরা আজকের ছেলেমেয়ে। ওঁদের ভাবনা ওঁরা সযত্নে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। ওঁরা তো আগে লন্ডনেও একসঙ্গে অনুষ্ঠান করেছেন। দেখলাম, সকলে খুব খুশি হয়েছেন ওঁদের একসঙ্গে অনুষ্ঠান করতে দেখে। মানুষের বেশ একটা স্বতঃস্ফূর্ত অভিব্যক্তি নজর করলাম।

রবিবারের অনুষ্ঠানের পরে আমাকে একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যেতে হয়। অনুষ্কার সঙ্গে আলাদা করে দেখা করা হয়নি। তবে লন্ডন থেকে তিনি আমাকে আগেই জানিয়ে রেখেছিলেন যে, একত্রে নৈশভোজের আয়োজন হয়েছে। চিন্নাম্মাও টেলিফোনে বলেছেন। আসমা খানের হাতের রান্না খেতে খেতে অনেক দিন পরে সোমবার গল্প হবে। ফলে সন্ধ্যায় দেখব, ব্যক্তি অনুষ্কাও কতটা পরিণত হলেন। শিল্পী হিসেবে যে অনেকটা হয়েছেন, তা তো মঞ্চে দেখেই বুঝেছি।

(সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখন: সুচন্দ্রা ঘটক)

Advertisement
আরও পড়ুন