Utpal Dutt Birthday

‘সদ্যোজাত ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ফিরছি, দরজায় দাঁড়িয়ে বাবা, পিছনে বাজছে বেটহোফেনের গান’

২৯ মার্চ উৎপল দত্তের জন্মদিন। অভিনেতা, নাট্যপরিচালক উৎপল দত্তকে চেনেন অনেকেই। বাবা হিসেবে সংসারে কেমন মানুষ ছিলেন তিনি? আনন্দবাজার ডট কম-এর জন্য কলম ধরলেন তাঁর কন্যা বিষ্ণুপ্রিয়া দত্ত।

Advertisement
বিষ্ণুপ্রিয়া দত্ত
শেষ আপডেট: ২৯ মার্চ ২০২৬ ০৯:০০
Utpal Dutta’s Daughter Bishnupriya Dutta Shares A brief unknown fact about him on his birthday

ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রণীত।

বাবা বেঁচে থাকলে ৯৭ বছর বয়স হত। বাবার জন্মদিনটা এলেই অনেক স্মৃতি ভিড় করে মাথায়। আমরা দু’জনেই একে অপরের জন্মদিন উদ্‌যাপন করতে ভালবাসতাম। আমি প্রতি বছর জন্মদিনে বাবাকে বই উপহার দিতাম। এমন বই দিতাম যেটা বাবা পড়তে চাইতেন। এ ছাড়াও, আমরা খেতে খুব ভালবাসতাম। তাই জন্মদিন মানেই প্রচুর ভাল ভাল খাবার থাকতেই হবে। তবে বাইরে লোকজন ডেকে উদ্‌যাপন করাটা অপছন্দের। বাড়ির ঘনিষ্ঠ মানুষেরা মিলে দিনটা কাটাতাম।

Advertisement

বাবার প্রসঙ্গে উঠলে এক জনের কথা বলতেই হয়, তিনি পরিচালক গৌতম ঘোষ। কারণ, বাবা মনে করতেন, গৌতমদাই একমাত্র, যিনি বাবার অভিনয়সত্তা ছাড়াও জীবনের বিভিন্ন দিকটা চিনতে পেরেছিলেন। আসলে আমার বাবা অত্যন্ত প্রাণবন্ত রঙিন একজন মানুষ ছিলেন। ওঁর ব্যক্তিত্ব, শিল্পকর্মের সঙ্গে গভীর ভাবে মিশে ছিল রাজনৈতিক দর্শন, সেটা যেন মানুষটাকে সকলের থেকে আলাদা করে রাখত। সেই কারণে বাবা আমার কাছে এবং আরও অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণা।

বাবার জীবন ও নাটক যে অবিচ্ছেদ্য, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই এই সময়ে দাঁড়িয়ে বাবার কিছু আদর্শের কথা মনে পড়ে। বাবা সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন। তাঁর নাটকের কেন্দ্রে ছিল সমতাভিত্তিক সমাজের গঠন ও বিন্যাস। বাবা ভীষণ ভাবে বিশ্বাস করতেন, থিয়েটার শুধুমাত্র বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং সমাজ পরিবর্তনের একটি হাতিয়ার, যা একটি গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

‘আজকের শাহজাহান’ নাটকের মহড়ায় মেয়ে বিষ্ণুপ্রিয়ার সঙ্গে উৎপল দত্ত।

‘আজকের শাহজাহান’ নাটকের মহড়ায় মেয়ে বিষ্ণুপ্রিয়ার সঙ্গে উৎপল দত্ত।

এখন বদলে যাওয়া এই সমাজে প্রতিবাদের ভাষা স্তিমিত হয়ে পড়ছে। এই আশঙ্কা বাবা অনেক আগেই করেছিলেন। তাঁর ‘একলা চলো রে’ নাটকে তিনি মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের উত্থান বিশ্লেষণ করেছিলেন। দেখিয়েছিলেন কী ভাবে চরম দক্ষিণপন্থী মতাদর্শ সমাজে শিকড় বিস্তার করেছে। বাবা দেশে দক্ষিণপন্থী ফ্যাসিবাদের উত্থান সম্পর্কে আগে থেকেই সচেতন ছিলেন। আজ মনে হয়, বাবা থাকলে আরও এমন কিছু লিখতেন, যেখানে ইতিহাস ও রাজনীতিকে নতুন ব্যাখ্যায় উপস্থাপনা করা যেত।

আমার জীবনটাই তো ছিল বাবা-মা এবং থিয়েটার ঘিরে। আমাদের পরিবারে কোনও পিতৃতন্ত্র বা শ্রেণিবিন্যাসের অস্তিত্ব ছিল না। একজন সত্যিকারের মার্ক্সবাদী হিসেবে তিনি লিঙ্গসমতা এবং বৃহত্তর সাম্যের আদর্শে বিশ্বাস করতেন। বাবা কঠোর পরিশ্রম করেছেন। তিনি আমাদের একটি সুন্দর ও সচ্ছল জীবনই দেননি, পাশাপাশি মায়ের আর্থিক স্বাধীনতার দিকেও তীক্ষ্ণ নজর ছিল তাঁর। সংসারের সমস্ত আর্থিক দায়িত্ব ও নিয়ন্ত্রণ ছিল মায়েরই হাতে।

মা এবং আমাকেও সহযোদ্ধা বা ‘কমরেড’ হিসেবে দেখতেন বাবা। কমরেড, যা বন্ধু বা শত্রুর বাইরে এক ভিন্ন সম্পর্ক, যেখানে থাকে সমতা, সংহতি এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা। বাবা কোনওদিনই আমার সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলেননি। কৈশোরে পা দেওয়ার আগেই তিনি আমাকে এমন অনুভব করিয়েছিলেন যে, আমার কথারও মূল্য আছে।

উনি প্রকৃত অর্থেই ‘পুরুষ’ ছিলেন। আজকাল আমরা পুরুষের যে সংজ্ঞা দেখি, তেমনটা নয়। মায়ের মতামতকে ভীষণ গুরুত্ব দিতেন বাবা। পরবর্তী কালে আমার মতামতকেও ততটাই গুরুত্ব দিয়েছেন। এখানে বলতেই হবে, বাংলা ভাষায় আমার মায়ের অসাধারণ দখল ছিল। বাবা কিন্তু শব্দ প্রয়োগের ক্ষেত্রে শুধু যে মায়ের পরামর্শ নিতেন, তা-ই নয়, তাকে গুরুত্বও দিতেন। আমরা যখন কোথাও ঘুরতে যেতাম, সেখানেও বাবার নাটক লেখার কাজ চলত। সন্ধেবেলায় দৃশ্যগুলো আমাদের পড়ে শোনাতেন। এক বার আমরা কালিম্পং ঘুরতে গিয়েছিলাম। সেই সময় ‘দাঁড়াও পথিকবর’ নাটকটি বাবা লিখছিলেন। ওই নাটকের ‘রেবেকা’, আমার অভিনীত প্রথম বড় চরিত্র। বাবার লেখায় কখনও কখনও আমিও সাহায্য করেছি। বাবা যখন ‘অগ্নিশয্যা’ লিখছেন, সেই সময়ে আমি ঔপনিবেশিক ভারত নিয়ে সুমিত সরকারের লেখা সমালোচনামূলক প্রবন্ধ পড়ছিলাম এবং সেই লেখাগুলো বাবাকে দেখাই। বাবা ভীষণ আনন্দ পেয়েছিলেন।

মেয়ে বিষ্ণুপ্রিয়া দত্তের সঙ্গে আলাপচারিতায় উৎপল দত্ত।

মেয়ে বিষ্ণুপ্রিয়া দত্তের সঙ্গে আলাপচারিতায় উৎপল দত্ত।

যদিও নাটক নিয়ে সমসাময়িকদের সঙ্গে আমার বাবার ভাবনাচিন্তা ও উপস্থাপনায় তফাত ছিল। উনি থিয়েটারে রাজনীতি, আদর্শ নিয়ে ভীষণ ‘কমিটেড’ ছিলেন। আমার মনে হয়, উনি ছিলেন আন্তোনিও গ্রামশির বর্ণিত সেই গোত্রের বুদ্ধিজীবী, যিনি সমাজের, বিশেষ ভাবে, শোষিত শ্রেণির পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তাই তাঁর কাজকে ‘প্রোপাগান্ডা’ হিসেবে দেখাটা সীমাবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। এককথায়, বাবা ছিলেন অসাধারণ ‘ক্র্যাফ্টসম্যান’। অনেক সময় বাবা বামপন্থীদের সমালোচনাও করেছেন।

বলে রাখা ভাল, মঞ্চাভিনয়ই উৎপল দত্তের ভালবাসা ছিল। মিনার্ভা থিয়েটার সংক্রান্ত ঋণের চাপে বাবা হিন্দি সিনেমায় কাজ করতে গিয়েছিলেন। যত সময় পেরিয়েছে, হিন্দি সিনেমায় পেশাদারিত্ব তিনি উপভোগ করতে শুরু করেন। হৃষীকেশ মুখোপাধ্যায় ও বাসু চট্টোপাধ্যায়ের মতো পরিচালকের ছবিতে তিনি স্বতঃস্ফূর্ত ও বুদ্ধিদীপ্ত কমেডির একটা ঘরানা তৈরির চেষ্টা করেছিলেন, যার উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত ‘গোলমাল’। অনেকেই বাবাকে কেবল ‘কৌতুকাভিনেতা’ বলেই মনে রেখেছেন। সমালোচকেরা হালকা ভাবে নিয়েছেন তাঁর কাজকে। তবু তাঁর অভিনয়ের গভীরতা ও বৈচিত্রকে অস্বীকার করা যায় না কোনও ভাবেই। সত্যজিৎ রায়ের ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ কিংবা ‘হীরক রাজার দেশে’-র মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় প্রমাণ করে তিনি কতটা শক্তিশালী ও বহুমুখী অভিনেতা ছিলেন। তবে তিনি সিনেমায় নিজের কোনও কাজ নিয়ে কখনও অনুতপ্ত ছিলেন না বলেই মনে হয়। কারণ, সিনেমা তাঁকে যেমন আর্থিক স্থিতি দিয়েছে, তেমনই থিয়েটার তাঁকে দিয়েছে সৃষ্টির স্বাধীনতা।

অনেকেই হয়তো বলেন, বাবার অভিনয়সত্তাকে বাংলা ছবিতে সে ভাবে কাজে লাগানো হয়নি। তবে আমি তা মনে করি না। সত্যজিৎ রায় থেকে মৃণাল সেন, অজয় কর, তরুণ মজুমদারের মতো পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করেছেন। খুব কম অভিনেতার এমন সমৃদ্ধ ভান্ডার রয়েছে। যা হয়নি, সেটা নিয়ে অনুযোগ নয়। এ ক্ষেত্রে আমি বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করি এবং একটা কথা বার বার বাবাকে বলতে শুনতাম, আমিও সেটাই বলতে চাই, ‘‘এ সব বড্ড বুর্জোয়া মানসিকতা।’’

বাবার সঙ্গে এত স্মৃতি যে একটা বই লেখা যেতে পারে। সব কিছু তো আর বলে প্রকাশ করা যায় না। কিন্তু উনি যে প্রকৃত অর্থেই সৃজনশীল মানুষ ছিলেন, সেটাই একটা ছোট্ট স্মৃতি দিয়ে শেষ করছি। আমার পুত্র নোয়েলের জন্মের পর যখন ওকে নিয়ে বাড়ি ফিরলাম, দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন আমার বাবা আর পিছনে বাজছে বেটহোফেনের গান। এক জন শিশুর জন্য এর চেয়ে ভাল অভ্যর্থনা আর কী-ই বা হতে পারত! সেই শিশুও সারাজীবন সঙ্গীতকে ভালবেসে গেল।

Advertisement
আরও পড়ুন