লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কলকাতা মুভিটোন’ স্টুডিয়োয় শুটিং হচ্ছে? নিজস্ব চিত্র।
টেকনিশিয়ান স্টুডিয়ো থেকে ঢিলছোড়া দূরত্ব। এত দিন যত না সবার নজর কেড়েছে, এখন তার চেয়েও বেশি কৌতূহল তাকে ঘিরে। লাল গেট, লাল দেওয়াল পেরোলেই অন্দরে নানা আকারের সেট। কুদঘাটে লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কলকাতা মুভিটোন’ স্টুডিয়ো। যাঁর বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুঁসছে টলিপাড়া।
এই স্টুডিয়োতেই এত দিন ‘ভোলেবাবা পার করেগা’র নায়ক সদ্যপ্রয়াত রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিত্য আনাগোনা। এই ধারাবাহিকের আউটডোর শুটিং করতে গিয়েই সমুদ্রে তলিয়ে গিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার তাঁর অস্বাভাবিক মৃত্যুর প্রতিবাদে এবং ইন্ডাস্ট্রির সকলের নিরাপত্তা চেয়ে লাগাতার কর্মবিরতির ডাক টলিউডের।
এই স্টুডিয়ো চত্বরের অন্দরের ছবিটে কেমন? রোজের মতোই কর্মব্যস্ত? রাহুলের মৃত্যুর পর এখানে শুটিং হচ্ছে? নাকি একরাশ শূন্যতা ঘিরেছে স্টুডিয়োটিকে? যদিও ইতিমধ্যেই লীনার নামে তালসারি থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন রাহুলের স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকার।
স্টুডিয়োর ভিতরে রাস্তা ধরে এগোলেই সামনে বাংলো বাড়ি। বিপরীতে সাজানো বাগান। নিজস্ব ছবি।
তারই খোঁজে আনন্দবাজার ডট কম-এর প্রতিনিধি হাজির সেখানে। মঙ্গলবার লাল দরজা টানটান বন্ধ। ঠেলে ঢুকতেই দেখা মিলল স্টুডিয়োর কর্মী গোকুল সিংহের। “আজ থেকে শুটিং বন্ধ”, পা রাখতে না রাখতেই জানালেন তিনি। তাঁর সঙ্গে আরও জনা দুই নিরাপত্তারক্ষী দাঁড়িয়ে। তাঁরাও ওই স্টুডিয়োর কর্মী। সাংবাদিক শুনেই শঙ্কার ছায়া প্রত্যেকের মুখেচোখে। স্টুডিয়ো চত্বর ঘুরে দেখার ইচ্ছাপ্রকাশ করতেই ফোনে অনুমতি নিলেন গোকুল। অনুমতি মিলতেই স্টুডিয়ো চত্বরে পা। বাঁ হাতে একফালি মাঠ, একটি ডোবা। শুটিংয়ের পাশাপাশি এখানে আরও নানা অনুষ্ঠান হয়ে এসেছে। শুনশান সব। চৈত্রমাসের কড়া রোদ ছড়িয়ে পড়েছে সেটের দোতলা বাড়ির গায়ে। তখনও তার বারান্দায় লাল-হলুদ শালুর পর্দা ঝুলছে। উৎসববাড়ির দৃশ্য শুটের আগে সাধারণত এই ধরনের পর্দা টাঙানো হয় সেটে।
নকল ‘সুপার স্পেশ্যালিটি হসপিটাল’-এ কত নকল অসুস্থতার শুটিং হয়! নিজস্ব ছবি।
ওই বাড়ির ঠিক উল্টোদিকে সাজানো বাগান। দোলনা, দুর্গাপ্রতিমা, নকল ফোয়ারায়। লীনার সেই সাজানো বাগান যেন শুকিয়ে গিয়েছে! এলোমেলো, ইতস্তত পড়ে ‘প্রপস’। জনশূন্য প্রান্তরে থেকে থেকে কুকুরের চিৎকার। আর কোকিলের ডাক। এ রকম বিপরীত দৃশ্যই তো লীনা বরাবর তুলে ধরেছেন তাঁর সমস্ত ধারাবাহিকে! স্টুডিয়োর অন্দর ঘুরে দেখতে দেখতেই এলেন ম্যানেজার জয় ভট্টাচার্য। তাঁরও মুখচোখে অস্বস্তি। মৃদু গলায় জানালেন, অনেকেই এসে দরজার ফাঁক দিয়ে স্টুডিয়োর অন্দরের ছবি তুলে নিয়ে যাচ্ছেন। সকলের কৌতূহলের কারণ হয়ে উঠেছে লীনার ‘কলকাতা মুভিটোন’। বললেন, “এই রাস্তা দিয়ে রাহুল শটের ফাঁকে হাঁটতেন।” আলাপ ছিল আপনার সঙ্গে? জানতে চাইতেই চিলতে হাসি ম্যানেজারের ঠোঁটে। “স্টুডিয়োর ম্যানেজার হিসাবে আলাপ ছিল। দেখা হলে হাসতেন। ব্যস, এটুকুই। কিন্তু বেশ মানুষ ছিলেন।” মিশুকে ছিলেন বুঝি? “খুব মিশুকে নয়। গায়ে পড়ে খুব যে সকলের সঙ্গে কথা বলতেন, তেমনটাও নয়। তবে মিলেমিশে থাকতেন সকলের সঙ্গে। মুখের আলাপ রাখতেন।”
এত দিন দুটো ধারাবাহিকের শুট চলছিল স্টুডিয়োয়। ‘চিরসখা’ আর ‘ভোলেবাবা পার করেগা’। রাহুলের মৃত্যুর পরে সাময়িক তাঁর ধারাবাহিকের শুটিং বন্ধ ছিল। তখন শুধুই ‘চিরসখা’র শুটিং হয়েছে। গত দু’দিন ধরে নতুন অভিনেতাদের নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছিল ‘ভোলেবাবা পার করেগা’র শুটিং। কর্মবিরতি উঠলে আবার কি ‘চিরসখা’র শুটিং শুরু হবে? জবাব দিতে চাইলেন না উপস্থিত কেউ।
এই সেই বাংলো প্যাটার্নের বাড়ি। অন্দরে ‘চিরসখা’র শুটিং হয়। নিজস্ব ছবি।
অথচ এত শূন্যতা কিন্তু ছিল না। “এই স্টুডিয়ো চত্বর সারা ক্ষণ গমগম করত। লীনাদির সমস্ত ধারাবাহিকের শুটিং এখানেই হয়। অভিনেতাদের আনাগোনা, সাংবাদিকদের ভিড়— সব মিলিয়ে যেন হট্টমালার দেশ!”, অতীত স্মরণ ম্যানেজার জয়ের। হঠাৎ তৈরি হওয়া নিস্তব্ধতা তাই স্টুডিয়োকর্মীদের কাছে বড্ড ভারী মনে হচ্ছে। বেরিয়ে আসার আগে হঠাৎ কানে এল অস্ফুট কিছু কথা। “কোথা থেকে কী যে হয়ে গেল”, কর্মীদের কেউ একজন কি ফিসফিসিয়ে উঠলেন?
লাল গেটের বাইরে পা রাখতেই ফের টানটান বন্ধ ‘কলকাতা মুভিটোন’-এর গেট। আশপাশে অতিকৌতূহলী কয়েক জন দাঁড়িয়ে। স্টুডিয়োর দিকে আঙুল দেখিয়ে ফিসফিসিয়ে কথা বলছেন তাঁরা। বুঝি নতুন করে মগ্ন রাহুলের স্মৃতিতে?