দুই মলাট থেকে রুপোলি পর্দায় মণিশংকর মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাস। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
শংকর ওরফে মণিশংকর মুখোপাধ্যায় তত দিনে সাহিত্যিকমহলে খ্যাতনামী। ‘কত অজানারে’ উপন্যাসটি তাঁকে জনপ্রিয়তা দিয়েছে। ১৯৬২ সালে প্রকাশিত লেখকের আর একটি উপন্যাস ‘চৌরঙ্গী’। এই উপন্যাস তাঁর উপরে ছড়িয়ে দিয়েছিল রুপোলি পর্দার আলো।
শংকরকে প্রথম ছুঁয়েছিল উত্তমকুমারের মতো ‘সোনার কাঠি’। পরে সত্যজিৎ রায়ের মতো ‘হীরক রাজা’! এঁদের জাদুস্পর্শে তিনি খ্যাতির চূড়ায়। বাংলা ছাপিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন বলিউডে। মিঠুন চক্রবর্তী তাঁর ছবির নায়ক। আরও আছে। বড়পর্দা, ছোটপর্দা হয়ে মঞ্চ— শংকরের লেখনী সর্বত্র সমাদৃত।
সদ্যপ্রয়াত সাহিত্যিকের কোন কোন উপন্যাস ছায়াছবি, ধারাবাহিক এবং নাটকে রূপান্তরিত হয়েছিল? আনন্দবাজার ডট কম-এ রইল তার তালিকা।
‘চৌরঙ্গী’ ছায়াছবি। ছবি: সংগৃহীত।
চৌরঙ্গী: পুরনো কলকাতার বুকে তৎকালীন পাঁচতারা হোটেল। নাম হোটেল শাজাহান রিজেন্সি। শোনা কথা, ওই হোটেলে নাকি স্বল্প সময়ের জন্য চাকরি করেছিলেন শংকর। পরে পেশা বদলে যখন তিনি পাকাপাকি সাহিত্যিক, তখনই তাঁর কলম ধরেছিল ঝাঁ-চকচকে হোটেলের অন্দরকাহিনি। ‘স্যাটা বোস’ বা ‘সত্যসুন্দর বোস’, মার্কো পোলো, মিসেস করবী গুহ, মিস সুজাতা মিত্র বা মিসেস পাকড়াশি নাকি সত্যিই ছিলেন। ১৯৬৮ সালে পিনাকীভূষণ মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় হোটেল শাজাহান রিজেন্সি দুই মলাট ছেড়ে উঠে আসে বড়পর্দায়। প্রযোজক অসীমা মুখোপাধ্যায় উপন্যাসের নামেই নামকরণ করেন ছবির। উত্তমকুমারের অভিনয় ছবিতে আলাদা মাত্রা এনে দিয়েছিল। শংকরের ভূমিকায় শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়। এঁদের ঘিরে ছিলেন বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়, সুপ্রিয়া দেবী, মমতাশঙ্কর, অঞ্জনা ভৌমিক, সুখেন দাসের মতো তারকারা।
সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘সীমাবদ্ধ’। ছবি: সংগৃহীত।
সীমাবদ্ধ: সাল ১৯৭১। ওই বছরে সত্যজিৎ রায় নাম অপরিবর্তিত রেখে শংকরের উপন্যাস ‘সীমাবদ্ধ’র চিত্ররূপ দিয়েছিলেন। দুই বাংলার উত্তাল সময়ে এক সংস্থার কর্ণধার হয়েছিলেন শ্যামলেন্দু চট্টোপাধ্যায়। তাঁকে ঘিরে, তাঁর জীবন নিয়ে গল্প। সঙ্গে যুব আন্দোলন। সত্যজিতের পরিচালনায় এই গল্পকে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন শর্মিলা ঠাকুর, বরুণ চন্দ প্রমুখ।
সত্যজিৎ রায় পরিচালিত আরও একটি ছবি ‘জন অরণ্য’। ছবি: সংগৃহীত।
জন অরণ্য: ১৯৭৫ সালে সত্যজিৎ রায় আরও একবার বেছে নিয়েছিলেন শংকরের উপন্যাসকেই। এ বার তাঁর পছন্দ জন অরণ্য। অভিনয়ে প্রদীপ মুখোপাধ্যায়, দীপঙ্কর দে, অপর্ণা সেন, লিলি চক্রবর্তী প্রমুখ।
তপন সিংহের ছবি। ছবি: সংগৃহীত।
এক যে ছিল দেশ: পরিচালক তপন সিংহের এই ছবিটি শংকরের উপন্যাস থেকে নেওয়া। ১৯৭৭ সালে মুক্তি পেয়েছিল। ছবিতে তৎকালীন সেরা অভিনেতাদের ঢল। মূল ভূমিকায় দীপঙ্কর দে, সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়। তাঁদের ঘিরে ছিলেন ছায়া দেবী, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, কালী বন্দ্যোপাধ্যায়, রবি ঘোষ, অনিল চট্টোপাধ্যায়, সোনালি গুপ্তের মতো তাবড় অভিনেতারা।
বাসু চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত ছবি। ছবি: সংগৃহীত।
শীশা: বলিউডে বাসু চট্টোপাধ্যায় প্রথম সারির পরিচালক। ১৯৮৬ সালে তিনি বেছে নিয়েছিলেন শংকরের লেখা ‘মান সম্মান’ উপন্যাসটিকে। বানিয়েছিলেন হিন্দি ছবি ‘সীসা’। কর্পোরেট দুনিয়ার অন্ধকার দিক উঠে এসেছিল এই ছবিতে। নায়কের ভূমিকায় মিঠুন চক্রবর্তী, নায়িকা মুনমুন সেন। এ ছাড়াও ছিলেন অভিনেত্রী-নৃত্যশিল্পী মল্লিকা সারাভাই, বিজয়েন্দ্র ঘাটকে।
‘চৌরঙ্গী’র নব্য রূপ সৃজিত মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ‘হোটেল শাজাহান রিজেন্সি’। ছবি: সংগৃহীত।
হোটেল শাজাহান রিজেন্সি: ২০১৯ সালে সৃজিত মুখোপাধ্যায় ফের ‘চৌরঙ্গী’কে বড়পর্দায় নতুন করে নিয়ে এলেন। ছবির নাম দিলেন ‘হোটেল শাজাহান রিজেন্সি’। উত্তমকুমারের জুতোয় পা গলালেন আবীর চট্টোপাধ্যায়। শংকর পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। এ ছাড়াও ছিলেন অঞ্জন দত্ত, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়, অনির্বাণ ভট্টাচার্য, উষসী চক্রবর্তী, সুজয়প্রসাদ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। এই ছবিতে অনির্বাণ প্রথম নেপথ্য গায়ক হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁর গাওয়া ‘কিচ্ছু চাইনি আমি’ জনপ্রিয় হয়েছিল।
নিবেদিতা ফার্মাসিউটিক্যাল: ছোটপর্দায় শংকর পরিচিত হন তাঁর উপন্যাস নামাঙ্কিত ধারাবাহিক ‘নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি’র মাধ্যমে। জীবজগৎ, কীটপতঙ্গ এবং গবেষণার রহস্যময় জগতকে কেন্দ্র করে লেখা এই উপন্যাস। কেন্দ্রীয় চরিত্র জীমূতবাহন। তাঁকে জীবন্ত করেছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।
নাটক: বড়পর্দার পাশাপাশি মঞ্চেও জনপ্রিয় শংকরের ‘চৌরঙ্গী’। শোনা যায়, বড়পর্দার অভিনেতারাই নাকি এই নাটকে অভিনয় করেছিলেন। আরও একটি জনপ্রিয় নাটক ‘সম্রাট ও সুন্দরী’। ১৯৭৬-এ সারকারিনা থিয়েটারে সেই সময় রমরমিয়ে চলেছিল নাটকটি। অভিনয়ে সুপ্রিয়া দেবী, রবি ঘোষ প্রমুখ।