আদপে কি লাভজনক হবে অরিজিতের এই সিদ্ধান্ত? ছবি: সংগৃহীত।
গত কয়েক দিনে তোলপা়ড় সমাজমাধ্যম। ছবিতে গান গাইবেন না অরিজিৎ সিংহ। এই ঘোষণা করেছেন নিজেই। এর পরেই চারিদিকে নানা ধরনের মতামত। নিজের কাজ ছাড়া খুব একটা প্রচারে থাকতে পছন্দ করেন না গায়ক। তাই তাঁর বিপুল সংখ্যক সাক্ষাৎকারও নেই।
তবে এক বার এক সাক্ষাৎকারে গায়ক জানিয়েছিলেন, কোনও সংস্থার হয়ে কোনও গায়ক গান গাইলে, সবচেয়ে কম লাভ হয় সেই শিল্পীরই। কারণ, লাভের প্রায় পুরোটাই সেই সংশ্লিষ্ট কোম্পানি বা প্রযোজকের ঘরে যায়। তা হলে কি অরিজিতের ‘প্লেব্যাক’ থেকে অবসর নেওয়ার নেপথ্যে রয়েছে এমনই কোনও কারণ? কোনও গায়ক বা গায়িকা ‘প্লেব্যাক’ থেকে অবসর নিলে শিল্পীর অন্য দিক থেকে লাভ বেশি?
অরিজিতের এই সিদ্ধান্তকে যদি উদাহরণ হিসাবে দেখা যায়, তা হলে গায়ক বা গায়িকারা ছবির গানে কণ্ঠ না দিয়ে স্বাধীন ভাবে গান তৈরি করে বা কনসার্ট করে রোজগার করতে পারেন। তা হলে ব্যবসার নিরিখে দেখলে, এই সিদ্ধান্তে কি গায়ক অরিজিতের পরোক্ষ ভাবে লাভই বেশি হল?
এক ঘনিষ্ঠসূত্রের দাবি, দেড় বছর আগেও ছবিতে গান গাওয়ার জন্য সে ভাবে পারিশ্রমিক নিতেন না অরিজিৎ। এমনও হয়েছে, এক টাকাতে চুক্তি সাক্ষর করেছেন। কিন্তু সূত্র বলছে, গত দেড় বছরে ছবির গানপ্রতি প্রায় ১৫ লক্ষ করে টাকা নিতেন। এত দিন কনসার্টও যে বেশি করেছেন অরিজিৎ, তেমন নয়। গোটা বিশ্ব জুড়ে অরিজিৎ সারা বছরে ২৫টি মতো কনসার্ট করতেন এত দিন। ছবিতে গান না গাওয়ার সিদ্ধান্তের পরে কি সেই কনসার্টের সংখ্যা বাড়বে? প্রত্যেক কনসার্টের জন্য কত করে পারিশ্রমিক নেন তিনি? এ ক্ষেত্রে কোথায় গায়কের অনুষ্ঠান হচ্ছে, তার উপরে টাকার পরিমাণ অনেকটাই নির্ভর করে।
এ প্রসঙ্গে, নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক আয়োজকের জানান, অরিজিতের এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে সবার জন্যই লাভজনক। তিনি বলেন, “আমি ব্যক্তিগত ভাবে খুব খুশি। লাভ-লোকসানের ঊর্ধ্বে উঠে আমার মনে হয় অরিজিতের মতো শিল্পীর এই সিদ্ধান্তের ফলে আমরা আরও অনেক ভাল ভাল কাজ উপহার পাব।”
গায়কের কনসার্ট থেকেই কি সবচেয়ে বেশি ব্যবসা আসে আয়োজকদের? তা নিশ্চিত করে কারও পক্ষেই বলা কঠিন। তবে ঘনিষ্ঠসূত্র বলছে, এআর রহমান এবং অরিজিতের কনসার্টের ক্ষেত্রে হাতে প্রায় ৬০ দিন রাখতে হয়। প্রচার এবং টিকিট বিক্রির ক্ষেত্রেও বিশেষ জোর দিতে হয়। তবে বিশেষ শিল্পীদের ক্ষেত্রে কোন জায়গায় অনুষ্ঠান হচ্ছে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। যেমন দিল্লি, মুম্বইয়ে অরিজিতের কোনও অনুষ্ঠান হলে যে পরিমাণ ব্যবসা হয়, তা কলকাতায় হবে না। কিন্তু এই ব্যবসার সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে শিল্পীদের যোগ থাকে না। কারণ, অনেক ক্ষেত্রেই শিল্পীরা তাঁদের মোটা অঙ্কের পারিশ্রমিক বুঝে নেন। অরিজিতের ক্ষেত্রেও জায়গা বিশেষে অনেক কিছু নির্ভর করে।
আয়োজক কিঞ্জল ভট্টাচার্য বলেন, “ভারতে কনসার্ট আয়োজনের ক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা আছে। এখানে আয়োজকেরাই পুরো ঝুঁকিটা নেয়। কিন্তু শিল্পীরা কনসার্ট সফল হোক বা না হোক—আগেভাগেই অনেক টাকা পারিশ্রমিক হিসাবে পেয়ে যান। ফলে লাভ-লোকসান (PNL) না দেখেই আয়োজকদের সব চাপ নিতে হয়। ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত, যেখানে কনসার্টের সঙ্গে যুক্ত সবাই কিছুটা করে দায়িত্ব এবং লাভ-লোকসান ভাগ করে নেবে। তাতে সবাই কনসার্ট সফল করার জন্য আরও আন্তরিক ভাবে কাজ করবে। স্বাধীন মিউজ়িকের জগতে এই ধরনের ব্যবস্থা অনেক আগে থেকেই দেখা যায়। অনেকে জানেন না—ভারতে অধিকাংশ ‘লাইভ’ কনসার্ট এখনও লাভ করতে পারে না। তবে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলাচ্ছে।”
‘লাইভ’ অনুষ্ঠান ছাড়াও বেশ কিছু গানের প্ল্যাটফর্ম রয়েছে, যেখানে কোনও শিল্পীর গান জনপ্রিয় হলে তার নিরিখে কিছু পারিশ্রমিকও মেলে। তবে সে ক্ষেত্রে সেই লাভ যায় নির্দিষ্ট কোম্পানির কাছে। স্বাধীন ভাবে কেউ গান তৈরি করলে, তা জনপ্রিয়তা পেলে, তখন সেই পারিশ্রমিক পায় ওই শিল্পী। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে অরিজিতের এই সিদ্ধান্ত ব্যবসায়িক দিক থেকে তাঁকে কতটা লাভ দেবে, সেই অঙ্ক খুবই কঠিন।