Healthcare in West Bengal

স্বাস্থ্যে ‘পরিবর্তন’ এসেছে, কিন্তু এখনও দলে দলে পশ্চিমবঙ্গবাসী চিকিৎসার জন্য ভিন্‌রাজ্যে যান!

গত দেড় দশকে রাজ্যে স্বাস্থ‍্যের পরিকাঠামো এবং পরিষেবা দুই-ই যে বেড়েছে, তা নিয়ে চিকিৎসক এবং রোগী সবপক্ষই প্রায় একমত। বেড়েছে নার্সিংহোমের সংখ্যাও। তার পরেও কোথাও কোথাও ফাঁকফোকর রয়ে গিয়েছে এখনও?

Advertisement
সারমিন বেগম
শেষ আপডেট: ০৮ এপ্রিল ২০২৬ ২১:১০
Situation of Healthcare Sector in West Bengal

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

ভাল আছ? বিবিধ ভালমন্দের জটিল ছন্দে লুকিয়ে থাকে এ প্রশ্নের সদুত্তর। কিন্তু সবচেয়ে আগে আসে শরীর আর মন। যে দু’টি মিলিয়ে স্বাস্থ্য।

Advertisement

কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে ‘স্বাস্থ্য’ কেমন? কেমন ছিল? এখনই বা কেমন হয়েছে? গতিক কোন দিকে?

সরকারি এবং বেসরকারি দুই ক্ষেত্রেই রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিকাঠামোয় ইতিবাচক কিছু পরিবর্তন নজর এড়ায় না। শরীরের চিকিৎসার পাশাপাশি মনের চিকিৎসার প্রসার নজর কাড়ার মতো। কিন্তু এর পরেও সার্বিক ভাবে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে যথেষ্ট ‘স্বাস্থ্যবান’ বলার জায়গা নেই। সমস্যা অনেক। দুর্বলতাও। ভিন্‌রাজ্য বা ভিন্‌দেশ থেকে এখানে চিকিৎসা করাতে আসা রোগীর যেমন দেখা মেলে, তেমনই এ রাজ্যের চিকিৎসায় ভরসা রাখতে না-পেরে চেন্নাই, ভেলোর বা হায়দরাবাদে যাওয়া মানুষের সংখ্যাও কম নয়। আরজি করের ঘটনার পরে জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলন সরকারি রোগী পরিষেবার বেশ কিছু পরিকাঠামোগত সমস্যা তুলে ধরেছিল। খোদ নবান্ন তার অধিকাংশকে নীতিগত ভাবে মেনেও নিয়েছিল।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে পশ্চিমবঙ্গে ‘স্বাস্থ্যসাথী’ প্রকল্প চালু হয়েছে। চালু হয়েছে বিনামূল্যে সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা। হাসপাতালের সংখ্যা বেড়েছে। বেড়েছে বেড। সরকারের দাবি, গত দেড় দশকে এ রাজ্যে স্বাস্থ্যের হাল ফিরেছে। পরিকাঠামো এবং পরিষেবা দুয়েরই শ্রীবৃদ্ধি হয়েছে। কিন্তু রাজ্যের সেরা চিকিৎসা পরিষেবার যথাযথ বিকেন্দ্রীকরণ কি হয়েছে? জেলার হাসপাতালগুলি কি ‘কলকাতা নির্ভরতা’ কাটিয়ে উঠতে পেরেছে? বেসরকারি হাসপাতালের ‘গলাকাটা’ বিলের চাপ কতটা কমেছে? কতটা বাস্তবায়িত হল সুলভে সেরা স্বাস্থ‍্য পরিষেবা? চিকিৎসার জন্য বাঙালির ‘দাক্ষিণাত্য অভিযান’ কেন বন্ধ করা যাচ্ছে না? এমন বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজল আনন্দবাজার ডট কম।

সরকারের দেওয়া হিসাব

তথ‍্য ও সংস্কৃতি দফতরের একটি সূত্র জানাচ্ছে, রাজ্যের প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে শুরু করে মেডিক‍্যাল কলেজগুলিতে সরকারি স্বাস্থ্যক্ষেত্রে ২০১০-’১১ সালে শয্যাসংখ্যা ছিল ৫৮,৬৪৭। বর্তমান সরকারের প্রথম এক বছরে ৩,০০০ বেড বেড়েছিল বলে দাবি করা হয়। মুখ্যমন্ত্রীর দফতরের ২০২৪ সালের এক রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৪০ হাজার বেড বৃদ্ধি পেয়েছিল। প্রায় সাড়ে তিন গুণ বেড়েছে চিকিৎসকের সংখ্যা। ১৪টি নতুন সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হয়েছে। তৈরি হয়েছে ৪২টি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল। ১৩,৫০০ সুস্বাস্থ্য কেন্দ্রও রয়েছে রাজ্য জুড়ে। আছে ১৫৬টি ন্যায্যমূল্যের স্বাস্থ্যপরীক্ষা কেন্দ্র এবং ১১৭টি ন্যায্যমূল্যের ওষুধের দোকান।

২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে মেডিক্যালে ভর্তির আসন ছিল ১,৩৫৫টি। বর্তমানে তা বেড়ে ৫,৩২৫টি হয়েছে। শুরু হয়েছে টেলিমেডিসিন পরিষেবা। সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০১১ সালের এপ্রিলে এসএনসিইউ (স্পেশ্যাল নিউবর্ন কেয়ার ইউনিট) ছিল মাত্র ছ:টি। ২০২৪ সালের নথি বলছে, রাজ্যে এসএনসিইউ-এর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২৮৬টি। ‘শিশুসাথী’ প্রকল্পে ছোটদের বিনামূল্যে হার্ট সার্জারিরও ব্যবস্থা হয়েছে। রয়েছে ‘চোখের আলো’ প্রকল্পে ছানি অপারেশন এবং চশমা বিলির ব্যবস্থাও।

জেলায় হাসপাতাল বেড়েছে, কিন্তু স্বয়ংসম্পূর্ণ কতটা?

রাজ্য সরকার জেলায় জেলায় সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল তৈরি করেছে। সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল বলতে বোঝায় যেখানে সব ধরনের আধুনিক ব্যবস্থা থাকবে। কার্ডিয়োলজি, নেফ্রোলজি-সহ বিভিন্ন বিভাগ থাকবে। এবং সেখানে শুধু কাজ চালানোর মতো চিকিৎসক নয়, থাকবেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরাও। জেলায় জেলায় তৈরি হওয়া সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালগুলি কতটা ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ’, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে অনেকের। জেলার হাসপাতালগুলি বাইরে থেকে ঝাঁ চকচকে হয়েছে ঠিকই। কিন্তু পরিষেবা কি কলকাতা কেন্দ্রিক হাসপাতালগুলির মতো? সত্যিই তেমন পরিষেবা পাওয়া গেলে তো ‘রেফার’ (অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর) কমে যেত। তা কি কমছে? সরকারি আধিকারিকেরা বলছেন, খানিকটা কমেছে তো বটেই। কিন্তু বাস্তব বলছে, এখনও জেলা থেকে কলকাতার হাসপাতালে পাঠানো রোগীর চাপ যথেষ্ট। এক স্বাস্থ্যকর্তার হিসাব অনুযায়ী, কলকাতার মেডিক্যাল কলেজগুলির একেকটিতে ইন্ডোর, আউটডোর এবং ক্রিটিকাল কেয়ার মিলিয়ে দৈনিক শতাধিক রোগী পাঠানো হয় জেলার হাসপাতালগুলি থেকে।

তবে তাঁরা এ-ও মানছেন যে, জেলার হাসপাতালগুলিতে পরিষেবা আগের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। আগে জেলাগুলিতে থেকে রোগীদের কলকাতায় পাঠানোর প্রবণতা অনেক বেশি ছিল। একটু বড় কিছু ঘটলেই কলকাতায় ‘রেফার’ করে দেওয়া হত। সেখান থেকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এখন জেলাতেও বিভিন্ন শারীরিক পরীক্ষার ব্যবস্থা হয়েছে। সুস্বাস্থ্যকেন্দ্রও খুলেছে জেলায় জেলায়। কিন্তু ‘রেফার-রোগ’ এখনও পুরোপুরি সারেনি। ফলে কলকাতার বিভিন্ন সরকারি উপরে চাপ এখনও রয়েছে। রয়েছে বেডের অভাব। অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা এসে বেড না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।

কলকাতার হাসপাতালের উপর চাপ

নার্সিংহোমে বা বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি রোগীরা চিকিৎসার খরচ না চালাতে পেরে অনেক সময়েই এসএসকেএম-এর আইসিইউ বা সিসিইউ-য়ে আসতে চান। কিন্তু তাঁদের বেড পেতে সমস্যা হয়। তাঁরা যাতে বেডের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে দরখাস্ত করতে পারেন, সেই ব্যবস্থা চালু রয়েছে এসএসকেএম-এ। কিন্তু এক ভুক্তভোগীর কথায়, ‘‘দরখাস্ত করার কয়েক মাস পরেও এসএসকেএম থেকে ফোন আসেনি!’’ রাজ্যের প্রাক্তন শিক্ষাস্বাস্থ্য অধিকর্তা প্রদীপ মিত্র অতীতে এসএসকেএম-এর অধিকর্তা ছিলেন। তাঁর কথায়, “আমার সময়েই এই ব্যবস্থা তৈরি করেছিলাম। সিরিয়াল নম্বর চালু করা হয়। দরখাস্তের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু এখন শোনা যায় অনেকেই বেড পেতে অসুবিধা হয়। তার সঙ্গে দালালচক্রও আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে বলে শুনেছি।”

অনেকের অভিযোগ, রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলিতে ‘সুপারিশ’ ছাড়া পরিষেবা মেলে না। তাঁদের বক্তব্য, হাসপাতালগুলিতে ‘ক্যাচ পেশেন্ট’ (সুপারিশে আসা রোগী)-এর প্রবণতা আবার বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সমস্যা আগেও ছিল। বাম আমলে যাঁরা চিকিৎসা করিয়েছেন, তাঁরা জানাচ্ছেন, সেই আমলে সরকারি হাসপাতালে ৩০ টাকায় বেড পাওয়া যেত। প্রতিটি হাসপাতালের নির্দিষ্ট সংখ্যক বেড ‘পেয়িং বেড’ হিসাবে থাকত। স্বল্প ভাড়ায় সেই ‘পেয়িং বেডের’ জন্যও সুপারিশ করতে হত। মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি বড় অংশ সে ভাবেই পরিষেবা যোগাড় করতেন। এখন সরকারি চিকিৎসা পরিষেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাওয়া যায়। এতে এক দিকে সাধারণ মানুষের সুবিধা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এক শ্রেণির মানুষ সম্পূর্ণ ভাবে বেসরকারি পরিষেবার দিকে ঝুঁকে পড়েছেন।

মানসিক স্বাস্থ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি

রাজ্যে মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসার জন্য ছ’টি হাসপাতাল রয়েছে। কলকাতায় রয়েছে তিনটি, জেলায় তিনটি। তার মধ্যে তুফানগঞ্জের হাসপাতালটি হয়েছে বর্তমান সরকারের আমলে। বর্তমানে আগের চেয়ে বেশি সংখ্যক ওষুধ রোগীদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া মানসিক হাসপাতালের একটি অন্যতম সমস্যা ছিল, রোগী সুস্থ হয়ে যাওয়ার পরেও তাঁকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার মতো কেউ থাকত না। এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে জনমানসে। রোগীদের বাড়ি ফেরানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তাঁদের স্বাবলম্বী করতে ‘হাফওয়ে হোম’ নামক একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে সরকারের তরফে। বেসরকারি সংগঠনের সঙ্গে মিলে তাঁদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। যাঁরা অবসাদে ভুগছেন, তাঁদের জন্য ‘টেলিমানস’ উদ্যোগ চালু হয়েছে। এর মাধ্যমে তাঁদের টেলিফোনে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

রয়েছে বিলের চাপ, চলছে নজরদারিও

বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বাবদে বিলের চাপ বেড়েছে মধ্যবিত্ত পরিবারের উপর। বেসরকারি স্বাস্থ্যক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য বর্তমান সরকারের আমলে স্বাস্থ্য কমিশন (ওয়েস্ট বেঙ্গল ক্লিনিকাল এস্টাব্লিশমেন্ট রেগুলেটরি কমিশন) তৈরি হয়েছে। সেই কমিশনে বেশির ভাগ অভিযোগই আসে বিল সংক্রান্ত। নার্সিংহোম বা বেসরকারি হাসপাতালগুলি যাতে অযথা খরচ করিয়ে লাগামহীন বিল করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ করেছে স্বাস্থ্য কমিশন। তবে বিল-সমস্যায় পুরোপুরি রাশ টানা যায়নি।

বিল নিয়ে বার বার বেসরকারি হাসপাতালগুলিকে সতর্ক করেছে স্বাস্থ্য কমিশন। নির্দিষ্ট সময় অন্তর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষদের সঙ্গে বৈঠকেও এই বিষয়গুলি নিয়ে সাবধান করা হয়। তবে সমস্যা মেটেনি। স্বাস্থ্য কমিশনের চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অসীমকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, “জরিমানা করে লাভ হয় না। ১০০টা বিলে গন্ডগোল করে একটা বিলে রিফান্ড করলে হাসপাতালের কিছু যায়-আসে না। কারণ, ৯৯টি ক্ষেত্রে কোনও অভিযোগই আসছে না। কিন্তু এতে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি হচ্ছে।”

এখনও ভেলোরমুখী!

ভিনরাজ্যে চিকিৎসা করাতে যাওয়ার প্রবণতায় রাশ টানা যায়নি। ভেলোরযাত্রীদের কাছে পরিচিত স্টেশন কাটপাডি। ভেলোর ক্রিশ্চান মেডিক্যাল কলেজে (সিএমসি) যেতে এই স্টেশনে নামতে হয়। শুধু ভেলোর নয়, এ রাজ্য থেকে চেন্নাই এবং হায়দারাবাদেও অনেকে চিকিৎসা করাতে যান। অনেকেরই প্রশ্ন, চিকিৎসা পরিষেবা যদি রাজ্যে এতটাই ভাল হয়, তা হলে রোগীদের বাইরে যেতে হচ্ছে কেন? তবে পাল্টা যুক্তিও রয়েছে। অনেকে দক্ষিণ ভারত থেকে বিফলমনোরথ হয়ে ফিরে এসে জেলার হাসপাতালে বা কলকাতার কোনও মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ হয়েছেন, এমন উদাহরণও রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে বহু রোগী কলকাতায় আসেন চিকিৎসা করাতে। বাইপাসের ধারের হাসপাতালগুলিতে প্রায়শই বাংলাদেশি রোগীদের আনাগোনা লেগে থাকে। বিহার থেকেও অনেক রোগী আসেন। আসেন উত্তরপূর্বের রাজ্যগুলি থেকেও।

তবে এ সবের পরেও বাস্তব চিত্র পাল্টায়নি। তা হল, বহু রোগী ভিন্‌রাজ্যে যান ডাক্তার দেখাতে। বস্তুত, এত পরিমাণ রোগী এ রাজ্য থেকে ভেলোরে যান যে, ভেলোর সিএমসি-তে বুকিং করানোর ব্যবস্থা চালু রয়েছে বালিগঞ্জের এক ঠিকানায়। রোজই সেখানে একাধিক ফোন আসে। বাঙালির এই ‘দাক্ষিণাত্য অভিযান’কে অবশ্য এতটা সরল ভাবে দেখতে চান না চিকিৎসক অভিজিৎ চৌধুরী। তাঁর কথায়, “সরকারি হাসপাতালে কিছুই পরিষেবা নেই, বিষয়টা এমন নয়। সরকারি স্বাস্থ্যক্ষেত্রে নজরদারি দরকার। দক্ষিণ ভারতে যাওয়ার বিষয়টা অনেকটাই বিপণন। এমনই হলে তো বিহার-ওড়িশা থেকেও লোকে দক্ষিণ ভারতে যেত। তেমন তো হচ্ছে না! তা হলে কি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা বিহারের চেয়েও খারাপ? তেমন তো নয়। এটা আসলে একটা মানসিকতা।”

একই পরিষেবা রাজ্যে, তা-ও কেন দক্ষিণে?

দক্ষিণ ভারতে যে চিকিৎসা পরিষেবা পাওয়া যায়, তা এ রাজ্যেও পাওয়া যায়। কিন্তু ফারাক আছে খরচে। রাজ্যের বেসরকারি হাসপাতালগুলির তুলনায় দক্ষিণ ভারতে অনেক কম খরচে চিকিৎসা হয়। তা ছাড়া স্বাস্থ্য পর্যটনের বিষয়টিও রয়েছে। যাঁদের সামর্থ্য রয়েছে, তাঁরা স্বাস্থ্য পর্যটনের জন্য দক্ষিণ ভারত বেছে নেন। তাঁরা মনে করেন, চিকিৎসা হবে, একটু ঘোরাও হবে, স্বাস্থ্য পর্যটনও হবে।

রাজ্যের স্বাস্থ্যভবনের এক প্রাক্তন কর্তার কথায়, “যে ধর্মস্থানে গিয়ে ইচ্ছাপূরণ হবে বলে মনে করে, মানুষ সেখানেই যায়। এই প্রবণতাও তেমনই। এই প্রবণতা সহজে বদলানোও যাবে না।” ভিন্‌রাজ্যে যাওয়া নিয়েও রোগীদের মধ্যেও বিভিন্ন ধরনের ধারণা রয়েছে। কেউ মনে করেন, রাজ্যের বেসরকারি হাসপাতালের তুলনায় ভেলোরে খরচ কম। আবার অনেকে পেটের চিকিৎসার জন্যেও হায়দরাবাদে যান। পাশাপাশি রাজ্যে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে চিকিৎসক এবং রোগীর পরিবারের মাঝে পারস্পরিক বিশ্বাসযোগ্যতায় ধাক্কা লেগেছে। রোগীমৃত্যুর ঘটনা থেকে চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ বা একে অপরের প্রতি ব্যবহারের মতো বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সেই বিশ্বাস আহত হয়েছে। রোগীর পরিবার মনে করছে, হাসপাতালে গেলেই বেশি টাকা নিয়ে নেবে! সঠিক সময়ে, সঠিক চিকিৎসা হবে কি না, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। আবার জুনিয়র চিকিৎসকেরা ভাবছেন, রোগীর পরিজনদের কাছে হেনস্থার শিকার হবেন কি না।

স্বাস্থ্য কমিশনের চেয়ারম্যান অসীমকুমারের মতে, দক্ষিণ ভারত এখন একটি ‘মিথ’ হয়ে গিয়েছে। তিনি বলেন, “দক্ষিণ ভারত কেন মিথ হল, তা পশ্চিমবঙ্গের বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থার বোঝা উচিত। আমি অনেকবার তাদের বলার চেষ্টা করেছি। এখানে অধিকাংশ অভিযোগ, রোগীদের কাউন্সেলিং করানো হয় না। এখানে চিকিৎসা হচ্ছে। কিন্তু ডাক্তারবাবুদের ধারণা, যাকে বোঝাব, তিনি কী বুঝবেন! তাঁকে কী বোঝাব! দক্ষিণ ভারতে এটি সম্পূর্ণ উল্টো। ডাক্তারবাবুরা রোগীকে এবং রোগীর পরিজনদের যথেষ্ট সময় দেন। একই চিকিৎসা এখানেও হচ্ছে, ওখানেও হচ্ছে। হয়ত এখানে আরও ভাল চিকিৎসা হয়। কিন্তু সেটা রোগীর বাড়ির লোক বুঝতে পারেন না। বা তাঁদের বোঝানো হয় না।”

আগামীর দিশা

রাজ্যে স্বাস্থ্য পরিষেবা আগের চেয়ে যে উন্নত হয়েছে, তা মানছেন প্রায় সকলেই। যদিও অনেকে এ-ও বলছেন যে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পরিষেবা বৃদ্ধি হওয়াই স্বাভাবিক। এতে বাড়তি কৃতিত্বের কিছু নেই। রাজ্যের স্বাস্থ্যক্ষেত্রের উন্নয়নের কত টাকা আসছে, সেটিও একটি বড় অনুঘটক। এখন কেন্দ্রের জাতীয় স্বাস্থ্য মিশন থেকেও টাকা দেওয়া হয়। অতীতে স্বাস্থ্যক্ষেত্রের জন্য এত টাকা আসত না। স্মৃতিচারণ করে এক সরকারি চিকিৎসক জানাচ্ছেন, একসময়ে বিশ্ব ব্যাঙ্কের থেকেও টাকা এসেছিল। সেই টাকায় অনেক হাসপাতালেরই পরিকাঠামোয় বদল আনা হয়েছিল।

আগের তুলনায় এখন রাজ্যে এসএনসিইউ-এর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কমেছে সদ্যোজাতের মৃত্যুর হারও। পশ্চিমবঙ্গে আগে শুধু কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা ছিল। এখন কিডনি প্রতিস্থাপনও হচ্ছে। ‘বোন ব্যাঙ্ক’ থেকে হা়ড় নিয়ে তা জোড়া লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অনেক ব্যয়সাপেক্ষ অস্ত্রোপচারও সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে করে দেওয়া হচ্ছে। আগে বিনামূল্যের ওষুধ কম পাওয়া যেত। এখন তা বেড়েছে। এসএসকেএম হাসপাতালের সঙ্গেই ক্যানসার হাসপাতাল চালু হচ্ছে। এনআরএস হাসপাতালে উদ্বোধন হয়েছে নতুন ভবনের। এনআরএসে রয়েছে ‘পেট সিটি স্ক্যানের’ ব্যবস্থা। ক্যানসার, স্নায়ুরোগের চিকিৎসায় জরুরি এবং ব্যয়বহুল এই পরীক্ষাটি বিনাখরচে করা যায় এনআরএস-এ। যে কারণে বাইরের হাসপাতাল থেকেও রোগীরা এখানে ‘পেট সিটি স্ক্যান’ করাতে আসেন এনআরএস হাসপাতালে।

Advertisement
আরও পড়ুন