ছবি: অমিত দাস, চিরঞ্জীব বণিক।
সন্তানের হাত থেকে ফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ বাবা-মায়েরা কেড়ে নিচ্ছেন ঠিকই। কিন্তু বাবা-মায়েদের হাত থেকে তা কেড়ে নেওয়ার কেউ নেই। মুঠোফোনের পর্দার আসক্তি তাঁদেরও কিছু কম নয়। প্রাপ্তবয়স্করা স্ক্রিনের প্রতি আসক্ত কি না, তা শনাক্ত করাই কঠিন। বাড়ির ‘বড়’রা নিজেরাই বেশির ভাগ সময়েই মানতে পারেন না, স্ক্রিনের প্রতি নেশা রয়েছে তাঁদের। অথচ একই বিষয় নিয়ে শাসন করেন বাড়ির ছোটদের। ভুলে যান, বড়দের দেখেই ছোটরা শেখে।
ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ডা. দেবারতি আচার্য জানালেন, প্রাপ্তবয়স্কদের স্ক্রিন অ্যাডিকশন কোনও অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। চোখের সামনে ঘটলেও আমরা অনেক সময়েই এই আসক্তির গভীরতা উপলব্ধি করি না। মোবাইল, ল্যাপটপ, টিভি, ট্যাবলেট সকলেই কমবেশি ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু এগুলোর প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়া, না দেখে থাকতে না পারা, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সময় স্ক্রিনে কাটানোর আর এক নামই আসক্তি। যে আসক্তির প্রভাব পড়ে দৈনন্দিন কাজে, পারস্পরিক সম্পর্কে, এমনকি মানসিক স্বাস্থ্যেও।
কমবয়সিদের মধ্যে আসক্তি
দেবারতি জানালেন, বয়সভেদে এই অ্যাডিকশনের ধরন আলাদা আলাদা হয়। “তরুণ-তরণীদের মধ্যে যেমন সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার তুলনামূলক ভাবে বেশি। রিলস, শর্টস, ইনস্টা, ফেসবুক, স্ন্যাপচ্যাট ইত্যাদিতে সারাক্ষণ মজে রয়েছে তারা। অনলাইন গেমিংয়ের অ্যাডিকশন দেখা যায় কমবয়সি ছেলেমেয়েদের মধ্যে। চ্যাটিং ও ডেটিং অ্যাপও এরা বেশি মাত্রায় ব্যবহার করে। এতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় অজান্তেই চলে যায়,” বললেন দেবারতি।
সমাজমাধ্যমের ‘লাইক’, ‘ভিউজ়’ ইত্যাদি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ তাদের কাছে যে, তারা মনে করতে শুরু করে, এগুলোর সঙ্গে তাদের আত্মসম্মানও জড়িয়ে। এ ছাড়াও সমাজমাধ্যমে আসক্তদের মধ্যে ‘ফোমো’ (ফিয়ার অব মিসিং আউট) কাজ করে। সেই আশঙ্কার জায়গা থেকেও ভার্চুয়াল জগতে তাদের সময় কাটানোর প্রবণতা বেড়ে চলে।
মাঝবয়সিদের নেশা
মধ্যবয়সিদের ক্ষেত্রে স্ক্রিন অ্যাডিকশন অনেক সময়েই অফিসের কাজের আড়ালে লুকিয়ে থাকে। অনলাইন মিটিং, অফিস গ্রুপের ওয়টস্যাপ, খবর দেখার নামে তাঁরা দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে কাটান। এ সব ক্ষেত্রে এই আসক্তি অনেক সময়ে অদৃশ্য থাকে, কারণ এটি সামাজিক ভাবে গ্রহণযোগ্য এবং প্রয়োজনের মধ্যে পড়ে। তাই পরিবার বা নিজের কাছেও বিষয়টি আর সমস্যার বলে মনে হয় না। কারণ, অবিরাম স্ক্রিন ব্যবহারের যুক্তি হিসেবে থাকে, কাজের চাপ বা তথ্যের প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে এর ফলে পরিবারে শারীরিক ভাবে উপস্থিত থাকলেও মানসিক ভাবে অনুপস্থিত থাকেন তাঁরা। সন্তান বা জীবনসঙ্গীর সঙ্গে কথা বলার সময়েও মন পড়ে থাকে নোটিফিকেশনের দিকে।
অনেক সময়ে দেখা যায়, সন্তানের সঙ্গে বাবা বসেছেন খেলবেন বলে, কিন্তু হাত থেকে মোবাইলটা রাখতে পারছেন না। বারবার চোখ বা মন মোবাইলের দিকে চলে যাচ্ছে, যা সন্তানও নজর করছে। এগুলো বাড়ির খুদে সদস্যের উপরেও পরোক্ষে প্রভাব ফেলছে। তারাও বায়না করছে। স্ক্রিন সাময়িক ভাবে আরাম দিলেও প্রকৃত স্ট্রেস কমাতে পারে না।
বয়স্কদের মধ্যে আসক্তি
বাড়ির বরিষ্ঠ সদস্যদের পর্যবেক্ষণ করলেই দেখা যায়, তাঁরা হয় ইউটিউবে ভিডিয়ো দেখছেন, ওয়টস্যাপ ফরোয়ার্ডসে মন দিয়েছেন, কখনও ধর্মীয় চ্যানেল, কখনও টিভি সিরিয়াল কিংবা খবরের চ্যানেল… সাধারণত এগুলোই বেশি দেখে থাকেন। মূলত একাকিত্ব কাটাতে স্ক্রিনের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়েন এঁরা। বয়স হয়ে গেলে শারীরিক ভাবে বাড়ির বাইরে বেরোনো কমে যায়, সামাজিক আদানপ্রদান কমে আসে। তখন ভার্চুয়াল দুনিয়ার প্রতি আগ্রহ বাড়ে। এই বয়সের মানুষেরা অনেক সময়েই অনলাইনে ভুল তথ্যের দ্বারা দ্রুত প্রভাবিত হয়ে পড়েন, এবং তা অন্যত্র ছড়িয়েও দেন।
আসক্তির মূল কারণ
একাকিত্ব, মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা, অবসাদ… বিভিন্ন কারণে এই আসক্তি ঘিরে ধরে আমাদের। সমাজমাধ্যমের রিলস, লাইক, নোটিফিকেশন যে তাৎক্ষণিক ‘ডোপামিন কিক’ দেয়, তার জন্য অনেকে এই মোহে জড়িয়ে পড়েন আরও। গল্পের বইয়ের চেয়ে অডিয়ো-ভিসুয়ালে অনেক দ্রুত বিনোদন মেলে।
ছোটদের বারণ করে নিজেরা মোবাইল দেখলে তা ভুল দৃষ্টান্ত তুলে ধরে ওদের সামনে। দেবারতির কথায়, “এখনকার দিনের বেশির ভাগ বাবা-মা ব্যস্ত থাকেন, আর বাচ্চাকে মোবাইল ধরিয়ে দেন। ফলে ছোটদের মধ্যে আসক্তিটা তাদের ব্রেন ডেভেলপমেন্টের সময় থেকেই চলে আসছে। তারা বাস্তববিমুখ হয়ে পড়ছে, আর ভার্চুয়াল জগতের বাইরে নিজেদের একা বলে মনে করছে। ছোটদের ব্যস্ত রাখতে ফোনের বদলে বসে ইনডোর গেমস দিতে পারেন।”
ক্ষতিকর প্রভাব
মানসিক উদ্বেগ, বিরক্তি, অবসাদ বাড়ে। মনোযোগ কমে যায়। বাস্তব জীবনের প্রতি আগ্রহ হ্রাস পায়। রাগ বাড়ে, ধৈর্য কমে। মাথা ব্যথা, ঘুমের ব্যাঘাত, ঘাড়-পিঠে ব্যথা, ওজন বৃদ্ধি, সম্পর্কের উপরে প্রভাব… একাধিক শারীরিক ও মানসিক সমস্যার সূত্রপাত এই স্ক্রিন অ্যাডিকশন। দাম্পত্যে নিজেদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়।
বাচ্চাদের উপরে ক্ষতিকর প্রভাব আরও বেশি। তাদের শেখার ক্ষমতা কমে যাওয়া, মনঃসংযোগ ও ধৈর্য্য কমে যাওয়ার মতো ঘটনা বেড়ে চলেছে। একেবারে ছোট বাচ্চাদের এই কারণে রাগ, জেদ বেড়ে যাওয়ার মতো আচরণত সমস্যা দেখা দিচ্ছে। ভাষার প্রতি, সামাজিক যোগাযোগের প্রতি আগ্রহ কমছে ছোটদের। আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে শিখছে না তারা, স্ক্রিন ছাড়া তাদের শান্ত রাখা যাচ্ছে না।
আসক্তি কাটানোর উপায়
স্ক্রিন ততক্ষণ সমস্যা নয়, যতক্ষণ তার অসচেতন ব্যবহার হচ্ছে। যদি সীমিত ভাবে স্ক্রিনের ব্যবহার করা হয়, তা হলে তা আমাদের জীবনের সহায়ক হয়ে উঠবে, নিয়ন্ত্রক নয়।
মডেল: প্রমিত সোম, মুনমুন রায়, নিশান্ত শীল