জন্মের পর নবজাতকের বিভিন্ন পরীক্ষা হয়। এতে তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গে কোনও অসুবিধা আছে কি না জানা যায়। এ সময়েই পরীক্ষা করলে ‘ডেভেলপমেন্টাল ডিসপ্লাসিয়া অব দ্য হিপ’ বা ডিডিএইচ সমস্যাটিকে চিহ্নিত করা সম্ভব। তবে বিষয়টি নিয়ে সচেতনতা কম। সম্প্রতি বরুণ ধওয়ন জানিয়েছেন, তাঁর শিশুকন্যা এই সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছিল, তার চিকিৎসার পর্বটি তাঁদের পরিবারের জন্য কঠিন ছিল। তবে, তাঁর মেয়ে এখন সুস্থ হয়ে উঠছে। চিকিৎসকমহলের আশ্বাস, এই অসুখ একেবারেই বিরল বা কঠিন অসুখ নয়। সময়মতো চিহ্নিত করলে সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব। বিষয়টি বিশদে বোঝালেন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. দিব্যেন্দু রায়চৌধুরী।
সমস্যার খুঁটিনাটি
“আমাদের ফিমারের উপর দিকটা বলের মতো। পেলভিক বোনে যে সকেট (কোটরের মতো) থাকে, তার মধ্যে ফিমারের ওই বলের মতো অংশটা ঢুকে নড়াচড়া করে। এই কারণেই নিতম্বের সন্ধিস্থল অর্থৎ পেলভিক বোন আর ফিমারের জয়েন্টকে বলা হয় বল অ্যান্ড সকেট জয়েন্ট। কোনও কারণে সকেটের তুলনায় বল ছোট হলে, বলের মতো অংশ পিছলে যাবে বা সরে যাবে। এই সমস্যাকেই বলা হয় ডিসপ্লাসিয়া অব দ্য হিপ (ডিডিএইচ)।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই সমস্যা জন্মগত। কখনও কখনও পরেও হতে পারে। অনেক সময়ে ত্রুটিপূর্ণ সোয়াডলিং অর্থাৎ ছোট বাচ্চার পা জোর করে পাশাপাশি রাখার জন্য ফিমারের বলটা পেলভিক সকেট থেকে সরে গিয়ে ডিসলোকেটেড হতে পারে। যাদের সকেটটা অগভীর, তাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা হতে পারে,” বুঝিয়ে বললেন ডা. রায়চৌধুরী। মেয়েদের ক্ষেত্রে সকেট ছোট থাকতে পারে। আর হরমোনের কারণে অস্থিসন্ধি কিছুটা শিথিল থাকতে পারে। তাই ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের এই সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় চার থেকে ছ’গুণ বেশি। পারিবারিক ইতিহাস থাকলে, ব্রিচ প্রেজ়েন্টেশন-এ থাকলে (গর্ভে শিশুর উল্টো অবস্থান) প্রথম শিশুর ক্ষেত্রে এই আশঙ্কা থাকে। এ রকম কিছু জানতে পারলে শিশু গর্ভে থাকাকালীনই চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে রাখুন। সে ক্ষেত্রে তাড়াতাড়ি চিকিৎসা শুরু করা যাবে।
লক্ষণ ও চিকিৎসা
ডা. রায়চৌধুরীর পরামর্শ, বাচ্চার একটি কটিসন্ধিতে অন্যটির চেয়ে চামড়ার ভাঁজ বেশি পড়ছে কি না খেয়াল রাখতে হবে। খেয়াল রাখুন একটি পা অন্য পায়ের চেয়ে একটু ছোট লাগছে কিনা। এর অর্থ হল বলটা পিছলে উপরের দিকে চলে যাচ্ছে বলে পা ছোট লাগছে। পায়ের অবস্থান স্বাভাবিক না-ও ঠেকতে পারে।
এই তিনটি লক্ষণ দেখলে চিকিৎসক সন্দেহ করবেন যে শিশুর হয়তো ডিডিএইচ রয়েছে। নিশ্চিত হতে বার্লো টেস্ট, ওট্রোলানিটেস্ট-এর মতো বিশেষ পরীক্ষা করা হয়। এ ক্ষেত্রে হাঁটু দু’টি বিশেষ পদ্ধতিতে সরিয়ে শব্দ শুনে সমস্যা বোঝার চেষ্টা হয়। তার সঙ্গে, চিকিৎসক হিপ জয়েন্ট-এর আলট্রাসোনোগ্রাফি করেন। তাতে, সমস্যাটা আছে কি না, তা একেবারে পরিষ্কার হয়ে যায়।
স্ক্রিনিং-এর পর সমস্যা সম্পর্কে নিশ্চিত হলে বাচ্চার পা ফ্রগলাইক পজ়িশন-এ (ব্যাঙের পায়ের মতো পা থাকবে) যাতে থাকে সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। তার জন্য পাভলিক হারনেস (বিশেষবেল্ট-এর মতো) পরিয়ে রাখতেহবে। সাধারণত, এতেই মাসদুয়েকের মধ্যে বাচ্চা সুস্থ হয়ে উঠবে। তবে, তার পরও সমস্যা থেকে গেলে অস্ত্রোপচার করাতে হয়। অস্ত্রোপচারে সময় লাগতে পারে দুই থেকে চার ঘণ্টা। তার পর চিকিৎসক হারনেস পরানোর পরামর্শ দেবেন। ছোট বাচ্চাকে বহু কারণেই অস্ত্রোপচার করানো হয়। তাই, এতে কোনওভয় নেই।
ওদের ব্যায়ামের প্রয়োজন নেই। তবে, হারনেস পরে থাকলে আঙুল ইত্যাদির নড়াচড়া কমে যায়। সেগুলো বড়দের একটু করিয়ে দিতে হবে।
রোগ ধরা পড়বেই
জন্মানোর সময়ে এই অসুখ ধরা না পড়লেও কিছু দিনেই সমস্যা বোঝা যাবে। কারণ পা ছোট-বড় হওয়ার কারণে হাঁটতে শেখার সময় শিশুর চলাফেরায় সমস্যা হবে। অতএব, শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকের কাছে আসতে হবে এবং অসুখটিকে ধরা যাবে। সাধারণ সমস্যা, অতএব সহজেই রোগটিকে সারিয়েও তোলা যাবে। তার পর শিশু একদম স্বাভাবিক ভাবেই বড় হবে এবং সাধারণত পরবর্তী জীবনে কোনও সমস্যা হবে না। এই ধরনের অস্ত্রোপচারের পরবর্তী প্রভাব বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকিও নেই বললেই চলে।
এটি ছোট বাচ্চার অসুখ। বড়দের অন্য ধরনের সমস্যা হতে পারে। সেটি আলাদা বিষয়। শিশুদের ক্ষেত্রে অসুখটিতে ভয়ের একেবারেই কিছু নেই। বাচ্চার জন্মের পর রুটিন যে পরীক্ষাগুলি হয় তখনই খেয়াল করে এই ডিডিএইচ স্ক্রিনিং করে নেওয়া উচিত। অভিভাবক বিষয়টি জেনে রাখুন, চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে নিন এবং সন্তানের পায়ে অতিরিক্ত ভাঁজ বা গড়নে কোনও অস্বাভাবিকত্ব আছে কি না খেয়াল করুন। যত তাড়াতাড়ি ধরা পড়বে, বাচ্চা তত তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠবে।