রঙে ভীতি রয়েছে কি? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
শুরু হল রঙের উৎসব। কিন্তু রং এবং উৎসব সব সময়ে সুখের না-ও হতে পারে। রঙের আতিশয্য কখনও আতঙ্কের হয়ে উঠতে পারে। দোল মানেই লাল, নীল, হলুদ, বেগনির উচ্ছ্বাস। কিন্তু ভাবুন তো, যদি এই রংই কারও মনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়? যদি রং দেখলেই বুক ধড়ফড় করে, হাত কাঁপে, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়? সর্বদা প্রকাশ্যে না এলেও উপেক্ষা করার প্রবণতা কাটিয়ে বেরোনো দরকার। দোল উৎসবের আগে তাই সেই বিষয়ে সচেতনতা তৈরি হওয়া দরকার। রং থেকে এই অস্বাভাবিক ভয়কেই বলা হয় ‘ক্রোমোফোবিয়া’।
রঙের প্রতি তীব্র, অমূলক ও অযৌক্তিক ভয়। এটি একটি নির্দিষ্ট ফোবিয়া। অর্থাৎ কোনও নির্দিষ্ট জিনিসকে ঘিরে ভয় তৈরি হওয়া। কারও সব রঙেই ভয় হতে পারে, আবার কেউ বিশেষ কিছু রং দেখলেই অস্বস্তি বোধ করেন। অনেক সময়ে উজ্জ্বল রং এই ভয়কে বাড়িয়ে দেয়। যাঁর এই সমস্যা হয়, তিনি জানেন, রং তাঁকে আঘাত করবে না, তবু মন থেকে শরীরে সেই ভয় প্রবাহিত শুরু করে। মনোরোগ চিকিৎসক সৌভিক চক্রবর্তী বলছেন, ‘‘যে কোনও অমূলক ভয়কেই আমরা ফোবিয়া বলি। ফোবিয়ার নির্দিষ্ট কারণ থাকতেও পারে, না-ও পারে। তেমনই রংকে অনেকে ভয় পান। এটাকে বলে ক্রোমোফোবিয়া। এই রোগ খুবই বিরল কিংবা খুবই লুকোনো থাকে। রোগী হয়তো নিজেও জানেন না, তাঁর এই সমস্যা রয়েছে। অনেক সময়ে পরবর্তী কালে শনাক্ত হয়।’’ চিকিৎসক জানাচ্ছেন, উজ্জ্বল রং দেখলে হঠাৎ করে উদ্বেগ শুরু হতে পারে এই রোগে। কখনও কখনও তা ‘প্যানিক অ্যাটাক’-এর পর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারে।
রং দেখলেই বুক ধড়ফড় করে, হাত কাঁপে, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়? ছবি: সংগৃহীত
ক্রোমোফোবিয়ার কারণ কী হতে পারে?
এই ফোবিয়ার নেপথ্যে নানা কারণ থাকতে পারে। শৈশবের কোনও খারাপ অভিজ্ঞতা, মানসিক আঘাত, বা অন্য কোনও বিষয়ে উদ্বেগের সমস্যা থাকলেও ক্রোমোফোবিয়া তৈরি হতে পারে। পরিবারে যদি উদ্বেগের প্রবণতা থাকে, তার প্রভাবও পড়তে পারে মনে। অনেক সময় নির্দিষ্ট কোনও রঙের সঙ্গে খারাপ স্মৃতি জড়িয়ে থাকলেও এমন ভয় জন্মায়।
ক্রোমোফোবিয়ার ফলাফল কী হয়?
রং দেখলে বা সেই রঙের কথা ভাবলেই শরীরে নানা প্রতিক্রিয়া শুরু হতে পারে। হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট হওয়া, ঘাম হওয়া, বমি ভাব, মাথা ঘোরা, হাত-পা কাঁপা ইত্যাদি। এই ভয় এতই প্রবল হতে পারে যে, রোগী রং এড়িয়ে চলতে শুরু করেন। ঘরের দেওয়াল, পোশাক, অনুষ্ঠান— সব জায়গায় সতর্ক থাকেন। এতে স্বাভাবিক জীবনযাপনের ছন্দ ব্যাহত হতে পারে। চিকিৎসক বলছেন, ‘‘যদি দেখা যায়, রঙের ভয় কেবল দোলের দিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে, সে ক্ষেত্রে অনেকেই বিষয়টি এড়িয়ে যান। কিন্তু অনেক সময়ে দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব পড়তে পারে।’’
ক্রোমোফোবিয়ার ধরন কী কী?
ক্রোমোফোবিয়ার বিভিন্ন ভাগ হয়। এক একটি রঙের ভীতির নাম ভিন্ন। নীচে তার কয়েকটি ভাগ দেওয়া হল—
ক্রিসোফোবিয়া: কমলা বা সোনালি রঙে ভয়
সায়ানোফোবিয়া: নীল রঙে ভয়
কাস্তানোফোবিয়া: বাদামি রঙে ভয়
লিউকোফোবিয়া: সাদা রঙে ভয়
প্র্যাসিনোফোবিয়া: সবুজ রঙে ভয়
রোডোফোবিয়া: গোলাপি রঙে ভয়
মেলানোফোবিয়া: কালো রঙে ভয়
জ়্যান্থোফোবিয়া: হলুদ রঙে ভয়
এরিথ্রোফোবিয়া: লাল রঙে ভয়
ক্রোমোফোবিয়ার চিকিৎসা আছে?
সৌভিক জানাচ্ছেন, যদি কেবল দোল বা হোলিতেই রং নিয়ে সমস্যা হয়, তা হলে খুব সহজেই এর থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। নিজেকে সে দিনের জন্য গৃহবন্দি করে নেওয়া যেতে পারে। অথবা এমন পরিসরে যাওয়া যেতে পারে, যেখানে জোর করে কেউ রং মাখাবেন না। পরিবার, আত্মীয়, বন্ধুবান্ধবকে এই বিষয়টি জানিয়ে রাখতেই হবে। কিন্তু যদি উৎসব ছাড়াও রং নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়, তা হলে পরামর্শের প্রয়োজন। থেরাপি বা দরকারে ওষুধের সাহায্য নিতে হতে পারে। ওষুধ প্রাথমিক ভাবে ‘প্যানিক অ্যাটাক’-এর সমস্যা কমিয়ে আনবে। আর থেরাপি সমস্যা গভীরে গিয়ে মূল থেকে উপড়ে ফেলার চেষ্টা করবে। ধাপে ধাপে সেই রঙের সামনে দাঁড়ানোর অনুশীলন করলে সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে।
বর্ণ সবার কাছে সমান স্বস্তির নয়, আনন্দেরও নয়। তাই আবির ছড়ানোর আগে সচেতনতা বৃদ্ধি করা দরকার। রং দিয়ে নয়, ভালবাসা দিয়ে রঙিন করে তুলুন প্রত্যেকের জীবন।