কলকাতার রেড রোডে প্রধানমন্ত্রী করা কিছু যোগাসনের পদ্ধতি, সেগুলির উপকারিতা কী? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
স্থির ভাবে সুখে অবস্থান করাকেই যোগাসন বলা হয়। শরীর ও মন— দুয়ের উপরেই যোগের প্রভাব অপরিসীম। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে, সর্বোপরি নিরোগ শরীর বজায় রাখতে নিয়মিত যোগাসন করা প্রয়োজন। কলকাতার রেড রোডে দ্বাদশ আন্তর্জাতিক যোগ দিবসে, রবিবার যোগাসনের নানা পদ্ধতি অনুশীলন করে দেখালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তাড়াসন থেকে ত্রিকোণাসন— যোগাসনের একাধিক পদ্ধতির অনুশীলন করে দেখিয়েছেন। যোগ-স্থানে ঘুরে ঘুরে বাকিদের অনুশীলনও দেখেন। কী ভাবে আসন অভ্যাস করতে হবে সে নয়ে পরামর্শও দেন। কারও কারও ভঙ্গি শুধরেও দেন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে।
এ বছরের আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের থিম ‘যোগা ফর হেল্দি এজিং’। অর্থাৎ, বার্ধক্যকেও নীরোগ, সতেজ ও স্বাস্থ্যবান করে তুলতে পারে যোগাসন। বেশি বয়সে শারীরিক ও মানসিক নানা সমস্যা থেকে রেহাই দিতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কোন কোন যোগাসন করে দেখালেন?
ত্রিকোণাসন
রেড রোডে যোগাসন করে দেখাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
কী ভাবে করবেন?
১) প্রথমে দুই পায়ের মধ্যে ব্যবধান রেখে দাঁড়ান।
২) এ বার বাঁ পাশে শরীরকে বেঁকিয়ে বাঁ হাত দিয়ে বাঁ পায়ের আঙুলকে স্পর্শ করুন। ডান হাতটি উপরের দিকে একেবারে সোজা করে রাখতে হবে। হাঁটু দু’টি ভাঙা চলবে না। এই ভাবে দশ অবধি গুনুন।
গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
৩) একই ভাবে ডান হাত দিয়ে ডান পায়ের আঙুল স্পর্শ করুন। ৩ বার এই আসনটি করুন।
উপকারিতা: নিয়মিত ত্রিকোণাসন অভ্যাস করলে পা, পিঠ, কোমরের সঙ্গে সঙ্গে ঘাড়, কাঁধের পেশিও মজবুত হবে। এই আসন কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে এবং হজমশক্তির উন্নতি ঘটায়। শরীরের রোগ প্রতিরোধ শক্তি বৃদ্ধি করে। আসনটি করলে সারা শরীরে রক্ত সঞ্চালন ভাল হবে। পেটের মেদ কমবে।
এই বিষয়ে ‘ভারতীয় যোগা অ্যাসোসিয়েশন’-এর প্রশিক্ষক এবং মোহনবাগান ফুটবল ক্লাবের প্রাক্তন যোগাসন প্রশিক্ষক অনুপ আচার্য বলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রীকে যিনি যোগব্যায়াম শেখান, সেই সুপ্রসিদ্ধ যোগাসন প্রশিক্ষক এইচ আর নগেন্দ্রর সঙ্গে কথা হয়েছে আমার। তিনিই বলেছেন, প্রতি দিন নিয়ম করে যোগাসনের নানা পদ্ধতি অনুশীলন করেন প্রধানমন্ত্রী। সে কারণেই তিনি এত ফিট ও সুস্থ থাকতে পারেন। ত্রিকোণাসন খুবই ভাল ভাবে করেন প্রধানমন্ত্রী। আগেও বহু বার নানা জায়গায় যোগাসনের এই পদ্ধতি অনুশীলন করে দেখিয়েছেন তিনি।’’
তাড়াসন
তাড়াসন সঠিক নিয়ম মেনে করেন প্রধানমন্ত্রী।
কী ভাবে করবেন?
১) প্রথমে ম্যাটের উপর সোজা হয়ে দাঁড়ান। দু'পায়ের পাতার মধ্যে দুই ইঞ্চি দূরত্ব রাখুন। শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক থাকবে।
২) শ্বাস নিতে নিতে হাত দু’টি মাথার উপর দিয়ে প্রসারিত করুন। গোড়ালি মাটি থেকে উপর দিকে তুলুন। মাটির সঙ্গে শুধুমাত্র আঙুলের অংশ স্পর্শ করে থাকবে। এই অবস্থায় গোটা শরীরেই টান অনুভব করবেন।
৩) পায়ের পাতার উপর গোটা শরীরের ভার বহন করতে হবে। যদি বেশি ক্ষণ পায়ের পাতার উপর দাঁড়িয়ে থাকতে না পারেন, তা হলে আবার আগের অবস্থানে ফিরে আসবেন।
গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
উপকারিতা: শরীরে গঠন, ভঙ্গি ঠিক করার জন্য এই আসন কার্যকরী। বয়স্কেরা এই আসন অভ্যাস করলে শরীরের ভারসাম্য বাড়বে। হজমশক্তি ভাল হবে। এই আসন স্নায়ুর উত্তেজনা প্রশমিত করে এবং মানসিক চাপ লাঘব করতেও সাহায্য করে।
যোগাসন প্রশিক্ষকের মতে, তাড়াসন যে কোনও বয়সেই করা যায়। বয়স্কেরা এই আসন অভ্যাস করলে শরীরের ভারসাম্য ঠিক থাকবে। পায়ের জোর বাড়বে। প্রধানমন্ত্রী তাড়াসন সঠিক নিয়ম মেনে করেন। এ বারেও আসনটি নিখুঁত ভাবেই করেছেন তিনি।
স্কন্ধ চক্রাসন
শোল্ডার রোটেশন বা স্কন্ধ চক্রাসন করে দেখালেন প্রধানমন্ত্রী।
কী ভাবে করবেন?
১) ম্যাটের উপর শিরদাঁড়া সোজা করে পদ্মাসনে বসুন। দাঁড়িয়েও করা যায় আসনটি।
২) এ বার ডান হাতের আঙুল ডান কাঁধে ও বাম হাতের আঙুল বাম কাঁধে রাখুন। কনুই দু’টি বুকের সামনে আনতে হবে। এই অবস্থায় বাইরের দিক থেকে কনুই ঘোরাতে শুরু করুন। প্রতি বার ঘোরা শেষ হবে বুকের কাছে এসে। ৫–৭ বার এই অভ্যাস করতে হবে।
৩) এ বার একই ভাবে কাঁধে হাত রেখে বিপরীত দিকে কনুই ঘোরাতে হবে। কনুই যখন উপরের দিকে তুলবেন তখন ধীরে ধীরে শ্বাস টানতে হবে আর বুকের কাছে এলে শ্বাস ছাড়তে হবে।
গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
উপকারিতা: এই আসন অভ্যাসে মেরুদণ্ড সংলগ্ন পেশিগুলির কার্যকারিতা বাড়ে। শিরদাঁড়ার নমনীয়তা নষ্ট হয়ে গেলে শরীরের সমস্ত স্নায়ু কার্যক্ষমতা কমতে থাকবে। নিয়মিত এই আসন অভ্যাস করলে স্নায়ুতন্ত্র উজ্জীবিত হয় ও সঠিক ভাবে কাজ করতে পারে। ঘাড় ও কাঁধের ব্যথাবেদনা কমাতেও আসনটি কার্যকরী।
কাঁধের ব্যায়াম স্কন্ধ চক্রাসন। যে কোনও বয়সেই অভ্যাস করা যায়। অনুপবাবু জানালেন, কাঁধ ও ঘাড়ের যন্ত্রণা কমাতে আসনটি উপকারী। নরেন্দ্র মোদী আগেও নানা জায়গায় এই আসনটি অনুশীলন করে দেখিয়েছেন। এ দিনের অনুষ্ঠানে তিনি স্পষ্ট ভাবে আসনটি একাধিক বার করে দেখিয়েছেন।
নেক স্ট্রেচ বা গ্রীবা প্রসারণ
ঘাড়ের ব্যায়াম যে কোনও বয়সেই উপযোগী, শেখালেন প্রধানমন্ত্রী।
কী ভাবে করবেন?
১) পিঠ সোজা করে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ান। চেয়ারে বসেও আসনটি করা যায়।
২) শ্বাস নিতে নিতে ডান দিকের কাঁধের উপর ধীরে ধীরে মাথা নোয়াতে হবে। শ্বাস নিতে নিতে শুরুর অবস্থানে ফিরে আসুন।
৩) এ বার শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে ঘাড় কাত করুন বাঁ দিকের কাঁধের উপর। আবার শ্বাস নিতে নিতে শুরুর অবস্থানে আসুন। এক রাউন্ড সম্পূর্ণ হল। এইভাবে ৭ রাউন্ড অভ্যাস করতে হবে।
গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
উপকারিতা: নিয়মিত অভ্যাস করলে অনিদ্রার সমস্যা ধীরে ধীরে দূর হবে। ঘাড় ও সংলগ্ন কাঁধের পেশী নমনীয় হবে। মনোযোগ বৃদ্ধি করতেও এই আসনটি নিয়ম করে অভ্যাস করা যায়। নিয়মিত অভ্যাসে মাথাযন্ত্রণা, মাইগ্রেনের সমস্যাও অনেক কমে যাবে। যাঁরা নাগাড়ে চেয়ারে বসে কম্পিউটারে কাজ করেন, দীর্ঘ সময় গাড়ি চালান বা ভারী ব্যাগ বইতে হয়, তাঁরা এই আসনটি অভ্যাস করলে ঘাড় ও কাঁধের যন্ত্রণা থেকে রেহাই পাবেন।
ঘাড়ের ব্যায়াম গ্রীবা প্রসারণ। প্রধানমন্ত্রী এই আসনটি সবচেয়ে ভাল ভাবে করেছেন। সঠিক নিয়মে অনুশীলন করে দেখিয়েছেন।
নাড়িশোধন প্রাণায়াম
প্রাণায়ামের যে কোনও পদ্ধতিতেই সিদ্ধহস্ত মোদী।
কী ভাবে করবেন?
১) মুখের সামনে ডান হাতের আঙুলগুলিকে আনুন, এর পর তর্জনী ও মধ্যমাকে হালকা ভাবে দুই ভ্রুর মাঝে রাখুন।
২) বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠকে ডান নাকের ছিদ্রে ও অনামিকাকে বাঁ নাকের ছিদ্রে রাখুন। এ বার বুড়ো আঙুলের চাপে নাকের ডান দিকের ছিদ্র বন্ধ করে বাঁ দিকের নাকের ছিদ্র দিয়ে যতটা পারেন শ্বাস নিন।
৩) অনামিকা দিয়ে চেপে ডান দিকের নাকের ছিদ্র বন্ধ করে শ্বাস ছাড়ুন বাঁ নাক দিয়ে। এই পদ্ধতিতে প্রতিটি নাসারন্ধ্রে ১০-১৫ বার করে অভ্যাস করুন এই প্রাণায়াম।
গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
উপকারিতা: শ্বাসের সমস্যা দূর হবে। হাঁপানি, সিওপিডির রোগীদের জন্য উপকারী শ্বাসের এই ব্যায়াম। নিয়মিত অভ্যাসে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়বে, স্মৃতিশক্তি উন্নত হবে, মনঃসংযোগ বাড়বে। অনিদ্রার সমস্যাও দূর হবে।
প্রাণায়ামের যে কোনও পদ্ধতিতেই সিদ্ধহস্ত প্রধানমন্ত্রী। আগেও বহুবার প্রাণায়ামের নানা পদ্ধতি অনুশীলন করে দেখিয়েছেন। এ দিনের অনুষ্ঠানে তিনি দাঁড়িয়ে প্রাণায়াম করে দেখিয়েছেন। হাতের মুদ্রা সঠিকই ছিল তাঁর।
যোগাসন ভারতীয় সংস্কৃতির ভাবাধারাতে অনুপ্রাণিত। অনুপবাবুর কথায়, এ হল গুরু-শিষ্য পরম্পরা। প্রাচীনকালে ঋষিরা অভ্যাস করতেন। সেই সূত্রে যোগের নানা পদ্ধতির প্রসার হয়েছে। যোগাসন এই বাংলাতেও সুপ্রসিদ্ধ বহু সময় ধরেই। খাস কলকাতাতেই ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ় বা যোগের ভাষায় সূক্ষ্ম ব্যায়ামের প্রবর্তন করেছিলেন স্বামী ধীরেন্দ্র ব্রহ্মচারী। ভিক্টোরিয়ায় প্রতি দিন সকালে তিনি তা অনুশীলনও করাতেন। ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর তিনি যোগগুরু ছিলেন। তিনি দেখিয়ে গিয়েছেন, যোগাসন করলে রোগব্যাধি থেকে দূরে থাকা যায়। ওষুধ একটা সময়ের পরে কাজ করা বন্ধ করে দেয়। যোগাসনের প্রভাব কিন্তু সুদূরপ্রসারী। শরীর ও মন, দুই-ই সুস্থ রাখতে যোগাসনের কোনও বিকল্প নেই।