Diabetes Control Tips

পয়লা বৈশাখে মিষ্টি থাকবেই! সুগারের ভয়ে মুখ বন্ধ রাখতে হবে না, কী ভাবে সতর্ক হবেন ডায়াবেটিকেরা

আনন্দের মাঝেই শরীরের ভিতরে নিঃশব্দে চলতে থাকে আরেকটি সমীকরণ, রক্তে শর্করার ওঠানামা। তাকেই নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশল বলে দিলেন মধুমেহ রোগের চিকিৎসক আশিস মিত্র।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ১০:০৬
উৎসবের দিনে কী ভাবে সতর্ক হবেন ডায়াবিটিসের রোগীরা?

উৎসবের দিনে কী ভাবে সতর্ক হবেন ডায়াবিটিসের রোগীরা? ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত।

আনন্দ-উত্তেজনা, প্রিয় মানুষের সান্নিধ্য, আর টেবিলভর্তি খাবারদাবার। বাঙালির উৎসবে এ সব তো থাকবেই। তার উপর যদি নতুন বছরের পার্বণ হয়, তা হলে সেই উদ্দীপনা দ্বিগুণ। বাঙালি সাজ, বাঙালি খাবার, প্যাকেটভর্তি শুধু মিষ্টি আর মিষ্টি। হালখাতা করতে যান বা বাড়িতে অতিথি আসুন, চোখের সামনে মিষ্টির বাহার থাকবেই। আর সমস্যা শুরু হবে সেখান থেকেই। লোভ সংবরণে ব্যর্থ হলেই বিপদ। বিশেষ করে ডায়াবিটিসের রোগীদের জন্য এমন দিনগুলি বেশ কষ্টকর।

Advertisement

এই আনন্দের মাঝেই শরীরের ভিতরে নিঃশব্দে চলতে থাকে আরেকটি সমীকরণ, রক্তে শর্করার ওঠানামা। বিশেষ করে ডায়াবিটিস থাকলে, অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট বা চিনি শরীরে প্রবেশ করলেই ইনসুলিনের ভারসাম্য সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। ফলে উৎসবের আনন্দের সঙ্গে শরীরের এই সূক্ষ্ম পরিবর্তনটিকেও বোঝা জরুরি। একটু পরিকল্পনা করলেই কিন্তু পয়লা বৈশাখের আনন্দ আর স্বাস্থ্যের মধ্যে সুন্দর ভারসাম্য রাখা সম্ভব। সেই বিষয়েই বিস্তারিত জানাচ্ছেন মধুমেহ রোগের চিকিৎসক আশিস মিত্র।

রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে কী করবেন?

রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে কী করবেন? ছবি: সংগৃহীত

ডায়াবিটিসের রোগীরা পয়লা বৈশাখে কী ভাবে নিজেদের সুস্থ রাখবেন?

১. উৎসবের দিনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল খাবারের লোভ। মিষ্টি, পোলাও, লুচি, কচুরি, এমনই জিভে জল আনা খাবার থাকে মেনুতে। ডায়াবিটিস থাকলে এই সব খাবার একেবারে এড়িয়ে চললেই ভাল। কিন্তু বাঙালির নববর্ষ বলে কথা, একটা দিন না খেলেই নয়। সে ক্ষেত্রে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। একসঙ্গে অনেকটা না খেয়ে অল্প অল্প করে খাওয়া ভাল। বিশেষ করে মিষ্টির ক্ষেত্রে ‘একটু স্বাদ নেওয়া’— এই অভ্যাসই সবচেয়ে নিরাপদ। এতে গ্লুকোজ় একসঙ্গে অনেকটা বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে।

২. সকালের শুরুটা হালকা এবং পুষ্টিকর প্রাতরাশ দিয়ে করা উচিত। বেশি তেল-মশলাযুক্ত খাবারের বদলে ওট্‌স, ডিম, শাকসব্জি বা অল্প পরিমাণে রুটি খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ে এবং দীর্ঘ সময় স্থির থাকে। খালি পেটে মিষ্টি বা ভাজাভুজি খাওয়া একেবারেই উচিত নয়, কারণ এতে হঠাৎ করে রক্তে শর্করা বেড়ে যেতে পারে।

৩. উৎসব মানেই অনেক সময়ে খাওয়ার সময়সূচি বদলে যায়। কিন্তু ডায়াবিটিস রোগীদের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে খাবার খাওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষণ না খেয়ে থেকে হঠাৎ বেশি খেলে শরীর একবারে বেশি গ্লুকোজ় সামলাতে পারে না, ফলে ওঠানামা হয়। তাই সময় মেনে অল্প অল্প করে বার বার খাওয়া ভাল। তবে যদি খুব বেলা করে বাড়ি বা রেস্তরাঁয় গিয়ে মধ্যাহ্নভোজ করা হয়, সে ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ, বিকেল ও সন্ধ্যায় কিছু না খাওয়াই ভাল। তাতে ভারসাম্য বজায় থাকবে।

৪. শরীরচর্চাকে অবহেলা করা ঠিক নয়। সারা দিন বসে আড্ডা না দিয়ে একটু হাঁটা, বাজারে যাওয়া— এই ছোট ছোট কাজগুলিই শরীরে গ্লুকোজ় ব্যবহার বাড়ায়, ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে। তা ছাড়া প্রতি বার খাওয়ার পরে হাঁটার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসক। বিশেষ করে মিষ্টি খেলে তার পরেই হাঁটাহাঁটি করে নেওয়া ভাল। চিকিৎসকের কথায়, ‘‘কিন্তু দুপুরে এই গরমে হাঁটাহাঁটি করাটাও মুশকিলের। তাই রাতে অল্প মিষ্টি খেলে তার পর হাঁটলে উপকার পাবেন। কিন্তু তা বলে রাতে বেশি ভারী খাবারও আবার খাওয়া উচিত নয়। দুপুরে মিষ্টি বা ভাজাভুজি খেলে অবশ্যই ঘরের ভিতরে বা গ্যারাজে বা বারান্দায় হেঁটে নিতে হবে।’’ খাবারের পরিমাণ যত বাড়াবেন, হাঁটার পরিমাণও ততই বাড়বে। ধরা যাক, ২টি রসগোল্লা খেলেন, তা হলে ১৫ মিনিট হাঁটতে হবে।

শরীরচর্চাকে অবহেলা করা ঠিক নয়।

শরীরচর্চাকে অবহেলা করা ঠিক নয়। ছবি: সংগৃহীত

৫. জল খাওয়ার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি। অনেক সময়ে উৎসবের ব্যস্ততায় জল খাওয়া কমে যায়। এতে শরীরের উপর চাপ পড়তে পারে। পর্যাপ্ত জল খেলে শরীর হাইড্রেটেড থাকে এবং অতিরিক্ত শর্করা কাজে লেগে যায়। চিকিৎসকের পরামর্শ, খাবার খাওয়ার পরে নয়, ১০-১৫ মিনিট আগে এক গ্লাস ভর্তি জল খেতে হবে। চিকিৎসক বলছেন, ‘‘রক্তে যখনই শর্করা বেড়ে যায়, আমাদের শরীর প্রাকৃতিক ভাবে তা কিছুটা কমাতে সাহায্য করে। যে মুহূর্তে ব্লাড সুগার ১৮০ ছাড়িয়ে যায়, কিডনি নিজে নিজে মূত্রের মাধ্যমে তার থেকে কিছুটা শরীরের বাইরে বার করে দিতে পারে। কিন্তু তার জন্য বেশি করে জল খেতে হবে।’’

জল পানের পরিমাণ বাড়াতে হবে।

জল পানের পরিমাণ বাড়াতে হবে। ছবি: সংগৃহীত

৬. পয়লা বৈশাখে সারা দিন ধরে মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। প্রাতরাশেও লুচি-তরকারি-জিলিপি খেলেন, আবার দুপুরে ভাত খেয়েও রসগোল্লা খেলেন, বা রাতেও মিষ্টি দই খেয়ে ফেললেন, তা হলে হবে না। যে কোনও একটি বেলায় অল্প (১-২টি) মিষ্টি খাওয়া যেতে পারে। তার পর যদিও হাঁটতেই হবে।

৭. এমন পার্বণের দিনে মিষ্টি বেশি খেয়ে ফেললে অন্যান্য কার্বোহাইড্রেট বাদ দিলে ভাল। ভাত-রুটির পরিমাণ কমিয়ে দিতে হবে সে ক্ষেত্রে। তার বদলে সব্জি খেয়ে ফাইবারের পরিমাণ বাড়াতে হবে, যাতে রক্তে শর্করা হুট করে বেশি বেড়ে যেতে না পারে।

৮. দুপুরে মিষ্টি খেতে হলে চিকিৎসক আরও একটি কৌশলের কথা জানালেন। খাওয়ার আধ ঘণ্টা আগে এক গ্লাস জলে ১ টেবিল চামচ বিশুদ্ধ ও অপরিশোধিত অ্যাপ্‌ল সাইডার ভিনিগার গুলে খেয়ে নিতে পারেন। এর ফলে রক্তে গ্লুকোজ় চট করে বাড়তে পারে না।

৯. তবে ডায়াবিটিসের রোগীদের জন্য সবচেয়ে ভাল বিকল্প হল, ডার্ক চকোলেট (অবশ্যই যেটিতে ৭০ শতাংশের বেশি কোকো পাউডার থাকবে)। এটি ডায়াবেটিক থেকে শুরু হার্টের রোগীদের জন্যও খুব স্বাস্থ্যকর। রোজ ২০ গ্রাম মতো খেতে পারেন ডায়াবিটিসের রোগী।

Advertisement
আরও পড়ুন