Cancer Treatment

অবাধ্য অণুকে জব্দ করে কর্কটের চিকিৎসায় দিশা

গবেষকেরা জানাচ্ছেন, যে কোনও চর্বিরই মূল উপাদান হল এই ফ্যাটি অ্যাসিড। এটি কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের পরমাণু দিয়ে তৈরি একটি দীর্ঘ শিকল।

ঋকদেব ভট্টাচার্য 
শেষ আপডেট: ২৮ জুন ২০২৬ ০৮:২১
(বাঁ দিক থেকে উপরে) দেবব্রত মাইতি, সোমনাথ কর, সাইমুদ্দিন শেখ, (নীচে) তনয় পাল, অনিমেষ ঘোষ, ইয়ালিনীমুথু সি এম।

(বাঁ দিক থেকে উপরে) দেবব্রত মাইতি, সোমনাথ কর, সাইমুদ্দিন শেখ, (নীচে) তনয় পাল, অনিমেষ ঘোষ, ইয়ালিনীমুথু সি এম।

জৈব রসায়নের দুনিয়ায় কয়েক দশকের একটি বড় জট কাটালেন ছ’জন ভারতীয় বিজ্ঞানী, যাঁদের মধ্যে পাঁচ জনই বঙ্গসন্তান। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানপত্রিকা ‘নেচার’-এ তাঁদের সেই গবেষণা সদ্য প্রকাশিত হয়েছে। এতে আশা জেগেছে কর্কট ও অন্যান্য রোগের ওষুধ সস্তা এবং সহজলভ্য হওয়ার। নতুন দিশা খুলছে স্বাদ ও সুগন্ধি শিল্পেও।

বম্বে আইআইটির অধ্যাপক দেবব্রত মাইতির নেতৃত্বে এই গবেষণা করেছেন সেখানকার তিন পিএইচডি গবেষক— পূর্ব মেদিনীপুরের তনয় পাল, মুর্শিদাবাদের মহম্মদ সাইমুদ্দিন শেখ, ঝাড়গ্রামের অনিমেষ ঘোষ এবং তামিলনাড়ুর রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট ইয়ালিনীমুথু সি এম। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন মুম্বই বার্ক-এর গবেষক, পূর্ব মেদিনীপুরের সোমনাথ কর। তাঁরা স্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিডের অবাধ্য অণুকে বশ করে পথ দেখিয়েছেন জীবনদায়ী ওষুধ তৈরির।

গবেষকেরা জানাচ্ছেন, যে কোনও চর্বিরই মূল উপাদান হল এই ফ্যাটি অ্যাসিড। এটি কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের পরমাণু দিয়ে তৈরি একটি দীর্ঘ শিকল। এই শিকলে সর্বোচ্চ যতগুলি হাইড্রোজেন পরমাণু থাকা সম্ভব, ঠিক ততগুলিই থাকলে তাকে ‘সম্পৃক্ত’ বা স্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড বলা হয়। মুশকিলটা হল, রাসায়নিক বিক্রিয়ার সময়ে কার্বনের এই লম্বা শিকলটি ছটফট করে। তাই শিকলের প্রধান অংশ বা ‘মাথা’র দিকে রাসায়নিক বদল ঘটানো সহজ হলেও, মাথা থেকে দূরের নির্দিষ্ট কোনও নিষ্ক্রিয় কার্বনে নিখুঁত বদল ঘটানো এত দিন প্রায় অসম্ভব ছিল।

ভাটনগর পুরস্কারপ্রাপ্ত অধ্যাপক মাইতি জানান, এই সমস্যার সমাধানে তাঁরা ‘ওএএই’ নামে একটি বিশেষ রাসায়নিক ছাঁচ তৈরি করেছেন। সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে প্যালাডিয়াম অনুঘটক। এই দুয়ের সাহায্যে তৈরি হওয়া ‘আণবিক চিমটে’ ছটফটে শিকলটিকে নির্দিষ্ট জায়গায় শক্ত করে চেপে ধরে। ফলে মাথা থেকে দূরের নির্দিষ্ট কার্বনটিতেও নিখুঁত পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব হয়।

‘লক্ষ্মণফল’ বা টক আতা গাছে অল্প পরিমাণে মেলে ‘মুরিকেটাসিন’ নামে প্রাকৃতিক যৌগ। কর্কট রোগের চিকিৎসায় এর উপযোগিতা নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা চলে আসছে। এই বিজ্ঞানীরা ‘আণবিক চিমটে’ ব্যবহার করে সস্তা এবং সহজলভ্য একটি সম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড থেকে অনেক কম ধাপে এবং কম অপচয়ে কৃত্রিম ভাবে তৈরি করেছেন মুরিকেটাসিন। মূল যৌগের রাসায়নিক গঠন অনুকরণ করে সম্পূর্ণ নতুন একটি যৌগও তাঁরা বানিয়েছেন, প্রাথমিক পরীক্ষায় যার কর্কট রোগ-প্রতিরোধী কার্যকারিতা মূল প্রাকৃতিক যৌগের সমতুল্য বলে দেখা গিয়েছে।

অধ্যাপক মাইতি বলেন, “এই প্রযুক্তি দিয়ে শুধু একটি ওষুধ নয়, সাধারণ সম্পৃক্ত চর্বির উপাদান থেকে খুব দ্রুত নানা ধরনের জীবনদায়ী যৌগ বানানো সম্ভব। আয়ুর্বেদের চেনা প্রাকৃতিক উপাদানগুলিকে আধুনিক বিজ্ঞানের সাহায্যে পরীক্ষা করেআরও উন্নত ওষুধে রূপান্তরও করা যেতে পারে।”

আরও পড়ুন