মনের ঘরে একাকিত্ব, হার্টে তার বড় ক্ষত। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
একা চলা, একা থাকা। কারও সঙ্গে পোষাচ্ছে না, তা হলে তাকে দরকার নেই। একা দিব্যি আছি। কেউ স্বেচ্ছায় বেছে নিচ্ছেন নিঃসঙ্গতা, কেউ পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির শিকার। একাকিত্বের এই অনুভূতি কি হৃদ্যন্ত্রের ক্ষতি করছে? ডিজিটাল সমাজে মানুষ অনেকটা স্বেচ্ছায় পরস্পরবিচ্ছিন্ন হচ্ছে। মুখোমুখি বসে আড্ডার ক্ষেত্রটা ভার্চুয়াল মাধ্যমে সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। এরই বড় প্রভাব পড়ছে শরীরে উপরেও।
একাকিত্বের অনুভূতি হার্টের রোগের কারণ হয়ে উঠতে পারে, এমন দাবি করা হয়েছে একাধিক গবেষণায়। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন, ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি এবং ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা সম্প্রতি একাকিত্বের সঙ্গে হার্টের রোগের যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন। বিষয়টা কেবল মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে জড়িত নয়, বরং আরও বেশি গভীরে।
হার্ভর্ডের গবেষকেরা জানাচ্ছেন, একাকিত্বের অনুভূতি হার্টের ক্ষতি করে দু’ভাবে। প্রথমত, একাকিত্বের ভাবনা যখন যন্ত্রণাদায়ক হয়ে ওঠে তখন রক্তে সি-রিঅ্যাকটিভ প্রোটিনের মাত্রা বেড়ে যায়। এই প্রোটিন ধমনীর দেএয়ালে প্লাকের মতো জমতে থাকে যা রক্ত চলাচলে বাধা তৈরি করে হার্ট অ্যাটাকের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
দ্বিতীয় কারণ, স্ট্রেস হরমোন বা কর্টিসলের অত্যধিক ক্ষরণ। অতিরিক্ত কর্টিসল রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয় এবং ধমনীর ক্ষতি করে। অন্য দিকে, সকলের মাঝে থাকা ও সামাজিক মেলামেশা অক্সিটোসিন হরমোনের ক্ষরণ বাড়িয়ে দেয়, যা হার্টকে সুরক্ষা দিতে পারে।
একা থাকার ইচ্ছা ও একাকিত্বে পার্থক্য আছে
একাকিত্ব বা নিঃসঙ্গতার অনুভূতি আর একা থাকার ইচ্ছের মধ্যে পার্থক্য আছে। একা থাকা অনেকেই উপভোগ করেন। আবার অনেকের মধ্যে থেকেও কেউ একা থাকতে পারেন। একই বাড়িতে বিভিন্ন মানুষ মোবাইল, টিভি বা নিজস্ব জগতে মগ্ন হয়ে আছেন, কিন্তু তিনি অনেকের মাঝে আছেন। সেই অনুভূতি এক রকম, আবার যখন একা থাকাটা সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় পরিণত হয়, তখনই সমস্যা তৈরি হয়। যৌথ পরিবার থেকে এখন অণু পরিবার। সকলেরই আলাদা প্রকোষ্ঠে বাস। কর্মজীবীদের রোজের ব্যস্ততায় একাকিত্ব অনেকটাই আড়ালে চলে যায়। তবে বয়স যত বাড়ে, ততই নির্ভরশীলতা বাড়তে থাকে। সে সময়ে নিঃসঙ্গতার অনুভূতি প্রবল হয়ে চেপে বসে মনের উপরে।
তবে গবেষণা বলছে, এখন অল্পবয়সিরাও কর্মসূত্রে হোক বা স্বেচ্ছায়, নিজের আলাদা জগৎ বেছে নিচ্ছে। সেখানে পরিবার-পরিজনের থেকে বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে। ছোট থেকেই মানসিক গড়ন, মনোবৃত্তি ভিন্ন প্রকারের তৈরি হচ্ছে। নিজের স্বাধীনতাই তাঁদের কাছে বেশি পছন্দের। ফলে যে কোনও ছোট ছোট সমস্যা তারা পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছে না। আর এই অনুভূতি ধীরে ধীরে অবসাদ, উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে যা কেবল মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে তা নয়, হার্টের অসুখের ঝুঁকিও বহুগুণে বাড়িয়ে দিচ্ছে। গবেষকেরা জানাচ্ছেন, একা থাকার ইচ্ছা খারাপ নয়, তবে তা যেন বহির্জগতের থেকে বিচ্ছিন্ন না করে ফেলে। এই বিচ্ছন্নতাই বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে।