ছবি: সংগৃহীত।
পেট ভাল রাখার নানা পরামর্শই প্রতি দিন নানা জায়গায় দেখে থাকেন। কেউ দই খেতে বলেন, কেউ বলেন মশলা ভেজানো জল খেতে, কেউ বা বলেন দিনে জলপানের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে। সবক’টি উপায়ই কোনও না কোনও ভাবে উপকারে লাগে পেটের। কিন্তু এর কোনও টোটকাই কাজে লাগবে না, যদি খামতি থাকে আসল জায়গায়।
খাওয়াদাওয়ার দৈনন্দিন কিছু অভ্যাসই পেটের সমস্যার অন্যতম কারণ। তাই পেটের সমস্যার সমাধান খোঁজার আগে অভ্যাস বদলে দেখুন। তাতে ফল আরও ভাল মিলতে পারে।
খাওয়ার সময়
যথা সময়ে খাওয়াদাওয়া করা পেট ঠিক রাখার অন্যতম শর্ত। কারণ, সারা দিনের বাকি কাজের মতোই পেট এবং পরিপাক তন্ত্রও এক রকমের বাঁধা ছন্দে চলে। তারও আছে নিজস্ব ঘড়ি। তাই এ ক্ষেত্রে দু’টি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি—
১. প্রথমার্ধ: দিনের প্রথমার্ধ অর্থাৎ সকাল থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত শরীরের হজমশক্তি থাকে তুঙ্গে। সকালে যে ভারী খাবার খেতে বলা হয়, তার কারণ সেটাই। কারণ, সেই সময়ে শরীর দ্রুত এবং সুষ্ঠভাবে ভারী খাবারও হজম করার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু যদি দুপুরের খাবার ২টো, আড়াইটে বা তিনটের সময় খাওয়া হয়, তবে সমস্যা হতে পারে। কারণ, তখন শরীরের হজম শক্তি ধীর হতে শুরু করেছে। ফলে দুপুর ১টায় খেলে যে খাবার ২ ঘণ্টায় হজম হবে, দুপুর ৩টেয় খেলে তা হজম হবে ৪-৫ ঘণ্টা ধরে। এর মধ্যেই যদি অন্য খাবার খাওয়া হয়, যেমন ফল ইত্যাদি, তবে সেই প্রক্রিয়া আরও পিছোতে থাকে। শেষ পর্যন্ত হয়তো দেখা যায়, রাত পর্যন্ত পেট ভার হয়ে রইল। পেট ফাঁপা, গ্যাস অ্যাসিডিটির সমস্যাও হতে পারে এই ভুল সময়ে খাওয়াদাওয়া করার জন্য।
২. দ্বিতীয়ার্ধ: বিকেলের পরের খাওয়াদাওয়ার সময় এবং বিশ্রাম নেওয়ার বিষয়টি এ ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই অফিস থেকে বাড়ি ফিরে রাতের খাবারটিই খান গুছিয়ে এবং ভাল ভাবে। হয়তো রাত ১০টায় সেই খাবার খেলেন এবং খাওয়ার ২-১ ঘণ্টার মধ্যেই বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। তাতে প্রভূত সমস্যা। এমনিতেই রাতে খাবার হজম করার ক্ষমতা থাকে কম। তার উপর খাওয়ার পরে যথেষ্ট হাঁটা চলা না হওয়ায়, হজম প্রক্রিয়া চলতে থাকে ধীর গতিতে। ২-১ ঘণ্টার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়লে পেটে থাকা ব্যাক্টেরিয়া খাবার গেঁজিয়ে তোলে। তা থেকে পেট ফাঁপা বা গ্যাসের মতো সমস্যা তৈরি করে। যার জের চলতে থাকে পরের দিন পর্যন্ত।
চিবোনোর নিয়ম
হজমের প্রক্রিয়া শুরু হয় মুখে, আর গ্যাসের সমস্যা হতে পারে খাওয়ার সময়ে তাড়াহুড়ো করলে। তাই খাওয়ার সঠিক পদ্ধতি হল— খাবার প্রায় গুঁড়ো গুঁড়ো বা আধা তরল হয়ে যাওয়া পর্যন্ত চিবোনো। তার জন্য এক গ্রাস খাবারকে অন্তত বার ত্রিশেক চিবোতে হবে। এতে দু’টি কাজ হবে— এক, অন্ত্রের উপর চাপ কমবে। দুই, খাবার গেলার সময়ে হাওয়া গিলে নিলে যে ‘এয়ারোফেজিয়া’ হয়, যার জন্য পেট ফুলে থাকে, তা কমবে। কমবে ব্লোটিং বা পেট ফাঁপার সমস্যাও।
কাঁচা বুঝে খাওয়া
রাতে কাঁচা খাবার সামলে খাওয়াই ভাল। অনেক সময়ে স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে গিয়ে রাতে স্যালাড খান স্বাস্থ্যসচেতনেরা। কিন্তু কাঁচা খাবারে যে সেলুলোজ় থাকে, তা রাতে হজম করা কঠিন। বিশেষ করে যাঁরা পেট ফাঁপা এবং গ্যাসের সমস্যায় ভোগেন, তাঁদের রাত ৮টার পরে সব্জি ভাপিয়ে বা সেদ্ধ করে নিয়ে খাওয়াই ভাল।
খাওয়ার পরের অভ্যাস
রাতের খাবার বা দুপুরের খাবার খাওয়ার পরে কি শুয়ে বা বসে থাকেন? অভ্যাসটি পেটের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তা বলে খাওয়ার পরে জিম করা বা কঠিন এক্সারসাইজ় করার কথা বলা হচ্ছে না। হালকা পায়ে ১০ মিনিটের হাঁটাহাঁটিই যথেষ্ট। এই অভ্যাসটি রপ্ত করতে পারলে, বিশেষ করে ভারী খাবার খাওয়ার পরে করলে অন্ত্রের খুব উপকার হয়। এতে যেমন গ্যাসের বা অ্যাসিডের সমস্যা মেটে, তেমনই রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতেও সুবিধা হয়।
জলের তাপমাত্রা
অনেকেই খেয়ে উঠে বা খেতে খেতে ঠান্ডা জল খান, যা পেটের হজমকারক এনজ়াইমগুলিকে কিছু ক্ষণের জন্য অকেজো করে দেয়। খেতে খেতে বা খাওয়ার ঘণ্টা দু’য়েকের মধ্যেও তাই ঠান্ডা জল খাওয়ার অভ্যাস এড়িয়ে চলা ভাল। জল খেলে তার তাপমাত্রা থাকতে হবে অন্তত ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। কারণ সেটিই শরীরের ভিতরের আদর্শ তাপমাত্রা। আর সেই তাপমাত্রাতেই হজমপ্রক্রিয়া থাকে সবচেয়ে বেশি কার্যকর।