—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
‘স্ত্রী অলস’— এই মন্তব্য ‘মিথ’। একজন গৃহিণীর শ্রম উপার্জনকারী সঙ্গীকে (স্বামীকে) ভাল ভাবে কাজ করতে সাহায্য করে। তাই ভরণপোষণের প্রশ্নে স্ত্রীর অবদানকে উপেক্ষা করা অন্যায়। একটি মামলার প্রেক্ষিতে এমনই মন্তব্য করল দিল্লি হাই কোর্ট।
২০১২ সালে এক যুগলের বিয়ে হয়েছিল। হাই কোর্টে স্বামী দাবি করেন, ২০২০ সালে তাঁকে এবং তাঁদের নাবালক ছেলেকে ছেড়ে স্ত্রী চলে যান। বিচ্ছেদের মামলা হয়। নিম্ন আদালত ভরণপোষণ দিতে অস্বীকার করে বিবাহবিচ্ছেদ করা মহিলাকে। বিচারক জানান, তিনি শিক্ষিতা এবং কর্মক্ষম। তাই ‘অলস ভাবে’ বসে ভরণপোষণ দাবি করতে পারবেন না। প্রয়োজনে চাকরি খুঁজুন। ওই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে হাই কোর্টে যান মহিলা।
সম্প্রতি দিল্লি হাই কোর্টের বিচারপতি স্বর্ণকান্তের এজলাসে ওই মামলার শুনানি হয়। নিম্ন আদালতের মন্তব্য এবং নির্দেশের প্রেক্ষিতে বিচারপতি বলেন, ‘‘উপার্জন করার ক্ষমতা এবং প্রকৃত উপার্জন, দু’টি পৃথক ধারণা। তা ছাড়া উপার্জনের ক্ষমতার জন্য ভরণপোষণের দাবি অস্বীকার করা যায় না।’’ দিল্লি হাই কোর্টের পর্যবেক্ষণ, একজন স্ত্রীর কর্মহীনতাকে তাঁর অলসতা বা ইচ্ছাকৃত নির্ভরতার সঙ্গে তুলনা করা যায় না। ভরণপোষণ নির্ধারণ করার সময় আইনে কেবল আর্থিক উপার্জন নয়, বিয়ে টিকে থাকার সময় সংশ্লিষ্ট বাড়ি এবং পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মহিলার অবদানকে অর্থনৈতিক মূল্যের মাধ্যমে স্বীকৃতি দিতে হয়। বিচারপতি বলেন, ‘‘উপার্জনহীন স্বামী বা স্ত্রী ‘অলস’ বলে ধারণা গৃহস্থালির কাজে তাঁদের অবদান সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝিকে প্রতিফলিত করে। একটি পরিবারকে টিকিয়ে রাখার জন্য গৃহিণীর শ্রমের স্বীকৃতি দেওয়া অনেক বেশি কঠিন।’’
বিচারপতি তাঁর রায়ে বলেছেন, ‘‘সুতরাং, এই আদালত এমন কোনও মতামতের সঙ্গে একমত হতে পারে না যে, একজন স্ত্রী চাকরি করেন না বলে তিনি অলস কিংবা স্বামীর উপর ইচ্ছাকৃত ভাবে নির্ভর করছেন।’’
দিল্লি উচ্চ আদালতের আরও একটি পর্যবেক্ষণ প্রণিধানযোগ্য। বিচারপতি বলেছেন, যে মহিলারা কাজ করতে পারেন এবং চাকরি করতে ইচ্ছুক তাঁদের উৎসাহিত করা উচিত। কিন্তু তিনি উপার্জন করতে সক্ষম বলে ভরণপোষণ থেকে বঞ্চিত হবেন, এই সরলীকরণও সুষ্ঠু বিচারের অংশ নয়। একটি সংসার পরিচালনা করা, সন্তানদের যত্ন নেওয়া, পরিবারের ভরণপোষণ করা এবং উপার্জনকারী স্বামীর সুবিধা-অসুবিধা দেখা— এগুলো বেতনহীন শ্রম। কিন্তু মূল্যহীন তো কখনওই নয়। বিচারপতি জানান, গৃহিণীর শ্রমকে বেশির ভাগ সময়ই অস্বীকার করা হয়। কারণ, তিনি যে দায়িত্বগুলি পালন করেন, সেগুলি ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্টে দেখা যায় না। কিংবা তাঁর আয় করযোগ্য হয় না। তবে তাঁদের শ্রমই পরিবারের ধারণা, পারিবারিক কাঠামোকে শক্ত করে ধরে রাখে।
রায়ে আরও বলা হয়েছে, ভারতীয় সমাজে বিয়ের পরে অনেক মহিলাকে চাকরি ছেড়ে দিতে হয় বা হত। কিন্তু বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে স্বামীরা প্রায়শই দাবি করেন, স্ত্রী তো চাকরি করতে পারেন। তিনি কেন ভরণপোষণ দাবি করবেন! তাঁরা এ-ও বলে থাকেন, স্ত্রীরা ইচ্ছাকৃত ভাবে বেকার থাকার সিদ্ধান্ত নেন। এটা ঠিক নয়। এই ধরনের অবস্থানকে উৎসাহিত করা যাবে না এবং আইনের মাধ্যমেই এমন দাবি বা অভিযোগ আটকাতে হবে।
সংশ্লিষ্ট মামলায় আরও একটি কথা বলেছে দিল্লি হাই কোর্ট। বিচারপতি মানছেন যে, বিয়ের পর পারিবারিক দায়িত্বের কারণে অনেক মহিলা নিজের ইচ্ছায় চাকরি ছাড়েন। কিন্তু পরে প্রয়োজনে একই স্তর, একই বেতন বা একই পেশাগত অবস্থানে তিনি ফিরতে পারবেন, এটা আশা করা যায় না। আদালত এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, আলোচ্য মামলায়, স্ত্রীর অতীত বা বর্তমানের কোনও কর্মসংস্থান বা উপার্জন প্রতিষ্ঠা করার কোনও রেকর্ড নেই। তাই তাঁকে ভরণপোষণ দিতে হবে।