Andaman and Nicobar Islands

চিনা নজরদারি জাহাজের গতিবিধি ঠেকাতে গ্রেট নিকোবরে নতুন নৌঘাঁটি, কিন্তু বিতর্ক ‘ট্রান্সশিপমেন্ট হাব’ নিয়ে

অটলবিহারী বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন ২০০১ সালে আন্দামানে গড়ে তোলা হয় তিন বাহিনীর পূর্ণ ক্ষমতার অপারেশনাল কমান্ড— ‘আইএনএস জারোয়া’।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৩ মে ২০২৬ ১৫:৪৩

প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

পরিকল্পনা হয়েছিল সিকি শতকের বেশি আগে। অটলবিহারী বাজপেয়ীর প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়। এ বার তা রূপায়নে তৎপর হয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার— ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে সমুদ্রের বুকে গড়ে তোলা হবে সশস্ত্র বাহিনীর সদা-যুদ্ধপ্রস্তুত এক ঘাঁটি। সেনা, বায়ুসেনা ও নৌসেনার মিশেলে তৈরি এক যৌথ বাহিনী মোতায়েন থাকবে সেখানে।

Advertisement

বাজপেয়ীর আমলেই ২০০১ সালে আন্দামানে গড়ে তোলা হয় তিন বাহিনীর পূর্ণ ক্ষমতার অপারেশনাল কমান্ড— ‘আইএনএস জারোয়া’। বঙ্গোপসাগর এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নয়াদিল্লির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি এই অঞ্চলে চিনা জাহাজের ধারাবাহিক আনাগোনার উপর নজরদারি ছিল এমন উদ্যোগের প্রধান উদ্দেশ্য। বস্তুত, গোটা দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ‘কৌশলগত অবস্থান’ (স্ট্র্যাটেজিক পয়েন্ট) মলাক্কা প্রণালীর উপর নজর রাখার ক্ষেত্রে এই সংযুক্ত কমান্ডের গুরুত্ব অপরিসীম। বঙ্গোপসাগরের ওই দ্বীপপুঞ্জের দক্ষিণ প্রান্ত নিকোবরে নতুন ঘাঁটি গড়ে তোলা হলে নজরদারির পাশাপাশি সম্ভাব্য চিনা হামলার মোকাবিলা সহজ হবে বলে মনে করছেন সামরিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ।

২০০০-এর দশকের শুরুতেই চিন তার সামরিক নীতি স্থল থেকে সমুদ্রকেন্দ্রিক করে তুলেছিল। তার পর থেকেই ধারাবাহিক ভাবে চিনা পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ)-র নৌশাখার নজরদারি জাহাজ, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রবাহী ট্র্যাকার, যুদ্ধজাহাজ এবং ডুবোজাহাজ ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ধারাবাহিক ভাবে প্রবেশ করতে থাকে। কম্বোডিয়া, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার, মলদ্বীপ, ইরান এবং আফ্রিকার পূর্ব উপকূলে তাদের লজিস্টিক কেন্দ্র (মেরামতি এবং জ্বালানি ভরার সুবিধা-সহ) গড়ে তোলা হয়। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের একটি সূত্র জানাচ্ছে, এখন প্রতি মাসে গড়ে ছয় থেকে সাতটি চিনা সামরিক জলযান ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে থাকে। বিমানবাহী রণতরী-সহ চিনা টাস্ক ফোর্সগুলিও মাঝেমধ্যেই এই অঞ্চলে প্রবেশ করছে।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রক মনে করছে এই পরিস্থিতিতে ভারতের সামনে এক মাত্র বিকল্প হলো লক্ষদ্বীপ এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে দীর্ঘ-পাল্লার সক্ষমতা গড়ে তোলা। তবেই ভারত সমুদ্র-নিষেধাজ্ঞা (সামরিক পরিভাষায় ‘সি-ডিনায়েল’) এবং সমুদ্র-প্রবেশ প্রতিরোধ (সামরিক পরিভাষায় ‘সি-অ্যাকসেস ডেটারেন্স) কার্যকর করতে পারবে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে কৌশলগত সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারবে। চিনের সামরিক গতিবিধির উপর নজরদারি বাড়াতে কয়েক বছর আগেই আন্দামানে নতুন একটি বিমানঘাঁটি চালু করেছিল। পোর্ট ব্লেয়ার থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার উত্তরে গড়ে তোলা হয় ‘কোহাসা’ নামে এই ঘাঁটিটি।

কার নিকোবরে বায়ুসেনা ঘাঁটি, কামার্তো দ্বীপে আইএনএস কারদ্বীপ, ক্যাম্বেল বে দ্বীপে বিমানঘাঁটির পাশাপাশি এ বার নিকোবরে নতুন সংযুক্ত ঘাঁটি তৈরি হলে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নয়াদিল্লির প্রভাব আরও বাড়বে। সামুদ্রিক নিরাপত্তার পাশাপাশি, ভারতের এই নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও রয়েছে বলে মোদী সরকারের দাবি। গ্রেট নিকোবরের ক্যাম্পবেল বে এলাকায় বিশ্বমানের ট্রান্সশিপমেন্ট হাব গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু নিকোবরে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড শুরু হলে সেখানকার পরিবেশে এবং বন্যপ্রাণের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে গ্রেট নিকোবরে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করেছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী।

প্রসঙ্গত, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ ৭৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ। উত্তরে ইস্ট দ্বীপ এবং ল্যান্ডফল দ্বীপ থেকে মায়ানমারের কোকো দ্বীপ মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে। আর একেবারে দক্ষিণে গ্রেট নিকোবর থেকে সুমাত্রা মাত্র ১৪০ কিলোমিটার। গ্রেট নিকোবরের ঠিক ৩০ কিলোমিটারের মধ্যেই আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের পথ। যেখান দিয়ে পৃথিবীর শতকরা ৭০ ভাগ জ্বালানি এবং ৫৫ ভাগ পণ্য যাতায়াত করে। ফলে ভূ-কৌশলগত কারণেই আন্দামানের নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হওয়া উচিত বলে বিশেষজ্ঞদের মত।

Advertisement
আরও পড়ুন