২০২৫ সালের ১২ জুন। ঘড়িতে দুপুর ১টা ৩৯। গুজরাতের অহমদাবাদ বিমানবন্দর থেকে লন্ডনের গ্যাটউইকের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান এআই১৭১। রানওয়ে ছাড়ার ৩২ সেকেন্ডের মধ্যে বিমানবন্দরের কাছে মেঘানিনগরে ভেঙে পড়েছিল বিমানটি। বিমানে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি থাকার কারণে ভেঙে পড়ার পরেই আগুন ধরে যায় তাতে।
এই বিমান দুর্ঘটনায় যাত্রী, বিমানকর্মী-সহ মৃত্যু হয়েছিল মোট ২৬০ জনের। অবিশ্বাস্য ভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন এক জন, ব্রিটিশ নাগরিক বিশ্বাসকুমার রমেশ। দুর্ঘটনাগ্রস্ত বিমানের ১১এ আসনে বসেছিলেন তিনি। দুর্ঘটনার পর বিমানের ধ্বংসস্তূপের কাছ থেকে বেরিয়ে হেঁটে হেঁটেই অ্যাম্বুল্যান্সে উঠতে দেখা গিয়েছিল রমেশকে। কী ভাবে বেঁচে গেলেন, তা নিজেও বলতে পারেননি রমেশ। এক বছরে শরীরের ক্ষত অনেকটা মিলিয়ে গেলেও আতঙ্ক এখনও পুরোপুরি কাটেনি রমেশের।
এয়ার ইন্ডিয়ার ওই বিমানেই ছিলেন গুজরাতের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা বিজেপি নেতা বিজয় রূপাণী। দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় তাঁরও। আগুনে ভস্মীভূত হয়ে যাওয়ায় অন্য যাত্রীদের মতোই তাঁর দেহও আলাদা করে চিহ্নিত করার উপায় ছিল না। শেষমেশ ডিএনএ পরীক্ষার পর গুজরাতের প্রাক্তন এই মুখ্যমন্ত্রীর দেহ শনাক্ত করা হয়। বিজয়ের ঘনিষ্ঠমহল সূত্রে জানা গিয়েছিল, লন্ডনে কন্যার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিলেন তিনি। ২০১৬ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন রূপাণী।
গত বছরেই অহমদাবাদ বিমান দুর্ঘটনার একটি অন্তর্বর্তী তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছিল। ককপিটে শেষ মুহূর্তে পাইলটদের মধ্যে কী কথাবার্তা হয়েছিল, তা প্রকাশ করা হয় ওই রিপোর্টে। বলা হয়, বিমানের ইঞ্জিনে জ্বালানি সরবরাহ আচমকা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। জ্বালানির সেই সুইচগুলি ‘রান’ থেকে ‘কাট অফ’-এ চলে গিয়েছিল। তার ফলে দু’টি ইঞ্জিনের কোনওটিতেই পর্যাপ্ত জ্বালানি পৌঁছোয়নি। ফলে বিমান উড়তে পারেনি।
দুর্ঘটনাগ্রস্ত বিমানটি চালাচ্ছিলেন ক্যাপটেন সুমিত সবরওয়াল। সহযোগী হিসাবে ছিলেন ফার্স্ট অফিসার ক্লাইভ কুন্দর। অন্তর্বর্তী রিপোর্ট অনুযায়ী, বিমান রানওয়ে ছাড়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তাঁরা একে অপরের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। এক জন আর এক জনকে ভয়ার্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘‘কেন জ্বালানির সুইচ বন্ধ করে দিলে?’’ অন্য জন উত্তরে বলেছিলেন, ‘‘আমি কিছু বন্ধ করিনি।’’ কোনটি কার কণ্ঠ, রিপোর্টে তা স্পষ্ট করা হয়নি। তবে ককপিটে সাধারণ ভাবে পাইলটদের অবস্থান বিবেচনা করে অনেকেই দাবি করেন, সুইচ বন্ধের কথা বলা হয়েছিল ক্যাপটেন সুমিতকেই।
এয়ারক্র্যাফ্ট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (এএআইবি) দাবি করেছিল, এই কণ্ঠস্বরের নমুনা থেকে তৎক্ষণাৎ কোনও সিদ্ধান্তে আসা যায়নি। ক্যাপটেন সুমিতের বাবা এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থও হয়েছিলেন। নিরপেক্ষ, স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছিলেন তিনি। অভিযোগ ছিল, অকারণে তাঁর মৃত পুত্রের ভাবমূর্তি কলুষিত করা হচ্ছে।
তদন্তকারীরা প্রাথমিক ভাবে জানতে পারেন, বিমানের জ্বালানির সুইচটি ‘রান’ থেকে ‘কাটঅফ’-এ চলে গিয়েছিল। ফলে মাত্র এক সেকেন্ডের ব্যবধানে বন্ধ হয়ে যায় দু’টি ইঞ্জিনই। শেষ মুহূর্তে সুইচ আবার ‘রান’-এ ফিরিয়ে আনা হয়। ইঞ্জিনে জ্বালানি পৌঁছোনোর জন্য, ইঞ্জিন চালু করার জন্য মরিয়া চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু লাভ হয়নি। ইঞ্জিন-২ শেষে চালু হলেও ইঞ্জিন-১ আর আগের অবস্থায় ফেরেনি। সামনের বিল্ডিংয়ে ধাক্কা খেয়ে ভেঙে পড়ে এয়ার ইন্ডিয়ার এআই১৭১।
তদন্তের এই প্রাথমিক রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসার পর পাইলটের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন অনেকেই। ভুল করে এই সুইচ বন্ধ করে দেওয়া কি সম্ভব? বিশেষজ্ঞেরা অধিকাংশই সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেন। জ্বালানির সুইচ পাইলটেরাই ব্যবহার করেন। বিমান রানওয়ে ছাড়ার আগে এই সুইচ চালু করা হয়। ফলে চালু হয়ে যায় ইঞ্জিন। আবার বিমান অবতরণের সময়ে এই সুইচ বন্ধ করে ইঞ্জিন বন্ধ করা হয়। এ ছাড়া, মাঝ-আকাশে কোনও জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে (যেমন, ইঞ্জিনে আগুন ধরে যাওয়া) এই সুইচ ব্যবহার করা হয়। ফলে সুস্থ অবস্থায় ভুল করে এই সুইচে হাত দেওয়া পাইলটের পক্ষে সম্ভব নয়। সেই সম্ভাবনা বাস্তবসম্মতও নয় বলে দাবি করেন বিশেষজ্ঞেরা।
কেউ কেউ আবার দাবি করেন, ক্যাপটেন সবরওয়াল বিষণ্ণতায় ভুগছিলেন। মায়ের মৃত্যুর পর বেশ কিছু দিন ছুটিতেও ছিলেন। প্রশ্ন ওঠে যে, তাঁর মানসিক স্বাস্থ্য কি বিমান চালানোর পক্ষে উপযুক্ত ছিল?
তবে বিমান দুর্ঘটনার এক বছর পার হলেও এখনও তদন্তের চূড়ান্ত কোনও রিপোর্ট প্রকাশিত হয়নি। এএআইবি-র সঙ্গেই দুর্ঘটনার তদন্ত করছেন এয়ার ইন্ডিয়া কর্তৃপক্ষ, ভারতের অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রক এবং আমেরিকার জাতীয় পরিবহণ নিরাপত্তা বোর্ড।
সংবাদসংস্থা রয়টার্স সূত্র উল্লেখ করে জানিয়েছে, এই দুর্ঘটনার চূড়ান্ত তদন্ত রিপোর্ট আসতে বিলম্ব হবে। নিয়ম মেনে এক বছরের মাথায় তা প্রকাশ করতে পারবেন না তদন্তকারীরা। কারণ, তাঁদের নজর রয়েছে দুর্ঘটনাগ্রস্ত সেই বিমানের ইঞ্জিনে। এখনও তার বিশ্লেষণ সম্পূর্ণ হয়নি।
আন্তর্জাতিক নিয়ম বলছে, যে কোনও বড় বিমান দুর্ঘটনার এক বছরের মাথায় তার তদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট প্রকাশ করতে হয়। কোনও কারণে তদন্ত সম্পন্ন না হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে দিতে হয় অন্তর্বর্তী রিপোর্ট। তাতে বিলম্বের কারণও ব্যাখ্যা করতে হয়। তদন্ত সম্পূর্ণ না হলে প্রতি বছরই এমন একটি করে রিপোর্ট দিয়ে যাওয়ার কথা সংস্থার।
রয়টার্সের দাবি, গত এপ্রিলে এয়ার ইন্ডিয়ার ওই বিমানটির ইঞ্জিন পরীক্ষা করা হয়েছিল। তার পর গত মাসে তদন্তকারীরা এই ইঞ্জিন বিশ্লেষণের সূত্রেই ফ্রান্সে গিয়েছিলেন। তবে এই তথ্যগুলি আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রকাশ্যে আনা হয়নি। সূত্রের খবর, চূড়ান্ত রিপোর্ট তৈরি করতে সময় লাগবে বলেই তদন্তকারীরা অন্তর্বর্তী রিপোর্ট প্রস্তুত করেছেন।
সম্প্রতি এয়ার ইন্ডিয়ার দুর্ঘটনা সংক্রান্ত তদন্ত নিয়ে ব্লুমবার্গ একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। তাতে দাবি করা হয়েছে, দুর্ঘটনাগ্রস্ত বিমানটির ইঞ্জিন আমেরিকায় রয়েছে। তদন্তকারীরা সেটি পরীক্ষার জন্য আমেরিকায় পাঠিয়েছেন। পরীক্ষানিরীক্ষা সম্পন্ন হলে তদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট প্রকাশ করা হতে পারে। তবে তাতে আরও তিন মাস লাগতে পারে বলে দাবি করেছে ব্লুমবার্গ।
দুর্ঘটনাগ্রস্ত বিমানটি ছিল মার্কিন সংস্থা বোয়িং-এর তৈরি। বোয়িং-এর ড্রিমলাইনার মডেলের এই বিমানে জ্বালানির সুইচ ঠিক ভাবে কাজ করেছিল কি না, তা নিয়ে এখনও নানা মত রয়েছে। ঘটনাচক্রে, তার আগে-পরেও বেশ কয়েকটি বিমানে একই সমস্যা ধরা পড়ে। তার পরেই বোয়িং-এর কারখানায় জ্বালানি (ফুয়েল) সুইচ পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অহমদাবাদের দুর্ঘটনার পর নিহতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিল এয়ার ইন্ডিয়া। গত অক্টোবর থেকে তা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অনেকেই সেই ক্ষতিপূরণের অর্থ গ্রহণ করতে চাইছেন না। তাঁরা তদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট দেখে সিদ্ধান্ত নিতে চাইছেন। বিমান সংস্থার গাফিলতি ছিল কি না, তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ করবেন কি না, তা ভেবেই অনেকে এখনও ক্ষতিপূরণ নেননি। এয়ার ইন্ডিয়া জানিয়েছে, এ বিষয়ে কাউকে কোনও চাপ দেওয়া হচ্ছে না। কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমাও নেই। যে কোনও সময় ক্ষতিপূরণের অর্থ নেওয়া যাবে।
সব ছবি: পিটিআই এবং রয়টার্স