(বাঁ দিকে) পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্ট্যালিন (ডান দিকে)। —ফাইল চিত্র।
নির্বাচনের মুখে ‘ভান্ডার’ বিলিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চেয়েও এক ধাপ এগিয়ে গেলেন এম কে স্ট্যালিন। বিধানসভা নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এ মাসিক অনুদান ৫০০ টাকা করে বৃদ্ধি করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। কিন্তু তাঁর শাসনাধীন রাজ্য তামিলনাড়ুতে মহিলাদের অ্যাকাউন্টে মুখ্যমন্ত্রী স্ট্যালিন এক বারে পাঠিয়ে দিলেন ৫০০০ টাকা। তা-ও ভাতায় অনুদান আনুষ্ঠানিক ভাবে বৃদ্ধি না করে এবং মহিলাদের অজান্তে। ‘কৌশলী’ চালে ঘোষিত ভাবে ভাতা বৃদ্ধি না-করেও তাঁদের চমক দিয়ে মহিলাদের মন জয়ের চেষ্টা করেছেন স্ট্যালিন।
এ বছরে পশ্চিমবঙ্গের মতো ভোট রয়েছে তামিলনাড়ুতেও। সাম্প্রতিক কয়েক বছরে বিভিন্ন রাজ্যে ভোটের আগে মহিলা ভাতার বৃদ্ধির এই প্রবণতা দেখা গিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গও তার ব্যতিক্রম নয়। হওয়ার কথাও নয়। কারণ, মহিলাদের ভাতা দেওয়ার বিষয়ে মমতাই পথিকৃৎ। তাঁর পরে দেশের অন্যান্য রাজ্যও সেই পথে যাত্রা শুরু করেছে। সেই পথ যে ‘লাভজনক’, তা একের পর এক রাজ্যের ভোটে প্রমাণিত। আপাতত দেশের মোট ১২টি রাজ্যে মহিলাদের অনুদান দেওয়ার প্রকল্প চালু আছে। রাজ্য অনুযায়ী সেগুলির নাম ঠিক করেছেন সংশ্লিষ্ট রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা।
এই পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোটের আগে যে মহিলাদের মাসিক অনুদান বৃদ্ধি পাবে, তা প্রত্যাশিতই ছিল। সেই অনুযায়ীই মমতার সরকারের অন্তর্বর্তী বাজেটে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এর মাসিক অনুদান ৫০০ টাকা করে বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই বর্ধিত ভাতা ইতিমধ্যে মহিলাদের অ্যাকাউন্টে পৌঁছে গিয়েছে। তবে তামিলনাড়ুতে এখনও অন্তর্বর্তী বাজেট পেশ হয়নি। আগামী মঙ্গলবার সেটি তামিলনাড়ু বিধানসভায় পেশ হওয়ার কথা। তার আগেই মহিলা ভাতায় চমক দিয়ে রাখল স্ট্যালিনের নেতৃত্বাধীন ডিএমকে সরকার।
তামিলনাড়ুর ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এর নাম ‘কলাইনার মাগালির উরিমাই থিট্টাম’। এই প্রকল্পের আওতায় মহিলাদের প্রতি মাসে ১,০০০ টাকা করে ভাতা দেয় স্ট্যালিন সরকার। শুক্রবার সকালে আচমকাই রাজ্যের মহিলাদের অ্যাকাউন্টে এক বারে ৫,০০০ টাকা ঢোকে। জানুয়ারি পর্যন্ত মহিলারা যে টাকা পেয়েছেন ওই ভাতা প্রকল্পে, দেখা যা তা এক লাফে চার গুণ বেড়ে গিয়েছে ফেব্রুয়ারিতে। প্রত্যাশিত ভাবেই ‘চমক’ তৈরি হয় ঘটনাপ্রবাহে।
অবশ্য এখনই ভাতার অঙ্ক বৃদ্ধি করেনি তামিলনাড়ু সরকার। ‘গ্রীষ্মকালীন বিশেষ প্যাকেজ’ হিসাবে ২,০০০ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, ফেব্রুয়ারি মাসের ভাতার সঙ্গে মার্চ এবং এপ্রিলের ভাতা অগ্রিম পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে ভোটের মুখে এক বারে ৫,০০০ টাকা পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে রাজ্যের মহিলাদের অ্যাকাউন্টে। অর্থাৎ, ওই প্রকল্পে পরবর্তী মাসিক অনুদান দেওয়া হবে আবার মে মাসে ভোটের ফলাফল প্রকাশের পরে।
এই উদ্যোগ থেকে স্পষ্ট যে, আনুষ্ঠানিক ভাবে সরকারি ভাতা বৃদ্ধি না করেও বিধানসভা নির্বাচনের আগে মহিলা ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা করতে এই পদক্ষেপ করেছে স্ট্যালিন সরকার। একই সঙ্গে এ-ও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে যে, ভোটে জিতে ফের সরকার গড়লে মহিলা ভাতা মাসে দ্বিগুণ, অর্থাৎ ২,০০০ টাকা করে দেওয়া হবে।
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় গত ৫ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী বাজেট পেশ হয়েছে। সেখানে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এর অনুদান মাথাপিছু ১,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,৫০০ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। তফসিলি জাতি, জনজাতি এবং পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের মহিলাদের জন্য তা ১,২০০ টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১,৭০০ টাকা। ফেব্রুয়ারি থেকেই ওই অর্থ মহিলাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যেতে শুরু করেছে। নির্বাচনের আগে মমতা যে ভাতার পরিমাণ বাড়াবেন, তা একপ্রকার প্রত্যাশিতই ছিল। কিন্তু বিষয়টি ‘সংবেদনশীল’ হওয়ায় বিরোধী শিবিরও ওই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করতে পারেনি। বরং বিরোধী বিজেপি বলেছে, তারা ভোটে জিতে ক্ষমতায় এলে ওই ভাতা বাড়িয়ে মাসে ৩,০০০ টাকা করে দেবে।
তবে নির্বাচনের মুখে সুকৌশলে মহিলাদের মন জেতার ওই প্রয়াসের জন্য স্ট্যালিনদের বিঁধতে শুরু করেছে তামিলনাড়ুর বিরোধী শিবির। তাদের দাবি, নির্বাচনে হারের ভয় থেকেই এ সব ‘চমকের রাজনীতি’ করছেন স্ট্যালিন।
যদিও নির্বাচনের মুখে মহিলা ভোটারদের মন জিততে এই প্রবণতা বিজেপি এবং অবিজেপি— উভয় সরকারের ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে। গত বছর বিহারে বিধানসভা ভোটের আগে নীতীশ কুমারের এনডিএ সরকার ‘মুখ্যমন্ত্রী মহিলা রোজগার যোজনা’ চালু করে। ওই প্রকল্পের আওতায় মহিলাদের বেশ কয়েকটি কিস্তিতে ২ লক্ষ ১০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়। ভোটের ঠিক আগে প্রথম কিস্তির ১০ হাজার টাকা পাঠানো হয়েছিল বিহারের প্রায় দেড় কোটি মহিলার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে। ফলাফল বলছে, বিহার নির্বাচনে পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের ভোট প্রায় ৮.৮ শতাংশ বেশি পড়েছিল। এটিই ছিল বিহারে পুরুষ এবং মহিলাদের ভোটদানের হারে এ যাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবধান। মহিলাদের জন্য নীতীশ সরকারের প্রকল্প এর নেপথ্যে অন্যতম ‘অনুঘটক’ হিসাবে কাজ করেছিল বলেই মনে করা হয়। ২০২৩ সালে কর্নাটক বিধানসভা নির্বাচনের আগেও কংগ্রেসের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল, ক্ষমতায় এলে ‘গৃহলক্ষ্মী’ প্রকল্প চালু করা হবে। ওই প্রকল্পে প্রত্যেক পরিবারের গৃহকর্ত্রীকে মাসে ২,০০০ টাকা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল কংগ্রেস। অতঃপর ভোটে বিজেপিকে ক্ষমতাচ্যুত করে কর্নাটকে ক্ষমতায় এসেছিল কংগ্রেস। তার পিছনেও ওই ‘অনুদানের রাজনীতি’ ছিল বলেই ভোটপণ্ডিতদের অভিমত।