নরেন্দ্র মোদী। — ফাইল চিত্র।
কিছু দেশ ও সংস্থা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স-কে রণকৌশলগত সম্পদ হিসেবে দেখছে। তারা গোপনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি গড়ে তুলতে চাইছে। আজ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দিল্লিতে এআই নিয়ে আন্তর্জাতিক শীর্ষ সম্মেলন থেকে এই সব দেশ ও সংস্থাকে নাম না-করে তোপ দাগলেন। যুক্তি দিলেন, এআই প্রযুক্তি সকলের সঙ্গে ভাগ করে নিলে তবেই তা থেকে গোটা বিশ্ব উপকৃত হবে।
বুধবারই আমেরিকার হয়ে হোয়াইট হাউসের এআই বিষয়ক নীতি উপদেষ্টা শ্রীরাম কৃষ্ণন বলেছেন, আমেরিকা আশা করে, ভারতের মতো আমেরিকার সহযোগী দেশগুলি আমেরিকার এআই প্রযুক্তিকে ভিত করেই নিজস্ব এআই ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। ভারত মনে করছে, আমেরিকা ও সেখানকার সংস্থাগুলি চাইছে, বাকি দেশগুলি তাদের প্রযুক্তির উপরে নির্ভরশীল হয়ে থাকুক। ভারত এর বিরোধিতা করে এআই যাতে সস্তায় ও সহজে মেলে, তার পক্ষে সওয়াল করছে। এআই প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ‘ওপেন-সোর্স’ ব্যবস্থা চাইছে। দিল্লিতে জি-২০ সম্মেলনের মতোই এআই সম্মেলন থেকেও মোদী সরকার দেখাতে চাইছে, ভারত শুধু নিজের জন্য নয়, গোটা ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা উন্নয়নশীল দেশগুলির হয়েই কথা বলছে। এআই সম্মেলনের চূড়ান্ত ঘোষণাতেও এই বিষয়গুলি তুলে আনতে চাইছে ভারত।
সরকারি সূত্রের মতে, প্রধানমন্ত্রীর আজকের বক্তব্য আসলে ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা উন্নয়নশীল দেশগুলির হয়ে আমেরিকার মতো প্রযুক্তির দিক থেকে এগিয়ে থাকা উন্নত দেশগুলিকে বার্তা। আমেরিকার এআই সংস্থাগুলি একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। চিনের সঙ্গেও প্রতিযোগিতাও করছে। কর্পোরেট সংস্থার খরচ কমানো মূল লক্ষ্য হয়ে উঠছে। এর ফলে বহু কর্মী ছাঁটাই হবেন, অনেক ক্ষেত্রে চাকরির সুযোগ কমে যাবে বলে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। ভারত এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বার্তা দিতে চাইছে, এআই-এর আসল সাফল্য নির্ভর করবে, কী ভাবে তা এশিয়া, আফ্রিকার গরিব ও উন্নয়নশীল দেশগুলির কৃষি ব্যবস্থা, পানীয় জলের সমস্যা, জনস্বাস্থ্য বা শিক্ষার মতো ক্ষেত্রের ভোল বদলে দিতে পারে, তার উপরে। দিল্লিতে ‘ইন্ডিয়া এআই ইমপ্যাক্ট সামিট’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মঞ্চ থেকে ভারত এআই-এর আরও ‘গণতান্ত্রিক’ ও ‘মানব উন্নয়নে’ আরও বেশি ব্যবহারের পক্ষে সওয়াল করছে।
প্রধানমন্ত্রী আজ এই প্রসঙ্গে ভারতের এআই নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গিকে ‘মানব’ নীতি হিসেবে তুলেছেন। এই পাঁচটি নীতি হল, এআই-এর ক্ষেত্রে নৈতিক ব্যবস্থা, দায়বদ্ধ পরিচালনা, জাতীয় সার্বভৌমত্ব, সকলের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত এবং আইনি ও বৈধ ব্যবহার। তাঁর বক্তব্য, এআই এক দিকে উদ্ভাবন, উদ্যোগ, নতুন শিল্পের জন্য দরজা খুলে দিচ্ছে। একই সঙ্গে ডিপফেক প্রযুক্তি, ভুয়ো তথ্য-ছবি তৈরির ফলে সমাজে অস্থিরতার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে। ফলে এআই ব্যবহার ও তাতে লাগাম পরানোর জন্য আন্তর্জাতিক স্তরে মানদণ্ড তৈরি হওয়া প্রয়োজন। এআই সম্মেলনে বক্তৃতার পরে রাষ্ট্রনেতাদের শীর্ষ বৈঠকেও প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এআই প্রযুক্তিকে মানব-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে গড়ে তুলতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তৃতার পরে বিরোধী শিবির তাঁর বিরুদ্ধে স্ব-বিরোধিতার অভিযোগ তুলেছে। বিরোধীদের দাবি, মোদী সরকার নিজে এআই কাজে লাগিয়ে সাধারণ মানুষের উপরে নজরদারি, নির্বাচনে ভোটার তালিকায় কারচুপি, সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা মুছে দেওয়ার কাজ করতে চাইছে। কংগ্রেসের সমাজমাধ্যম সেলের প্রধান সুপ্রিয়া শ্রীনতের অভিযোগ, মোদী সরকার তথ্যপ্রযুক্তি আইনের অপব্যবহার করে ইন্টারনেটে বা সমাজমাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে হওয়া সমালোচনা সরিয়ে ফেলছে। ‘সহযোগ’ নামের একটি ‘সেন্সরশিপ পোর্টাল’ও তৈরি করছে। এর সঙ্গে যুক্ত সরকারি আধিকারিকেরা সরকারের উদ্দেশে সমালোচনামূলক যে কোনও লেখা, ছবি, ভিডিয়ো সমাজমাধ্যম বা পোর্টাল থেকে সরানোরনির্দেশ দেবেন।
মোদী সরকার ইতিমধ্যেই নিয়ম করেছে, সমাজমাধ্যমে কোনও ‘আপত্তিজনক’ ছবি-ভিডিয়ো নিয়ে সরকার নোটিস দিলে, তিন ঘণ্টার মধ্যে তা সরাতে হবে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ওয়টস্যাপের মতো সমাজমাধ্যমের পরিচালক সংস্থা মেটা-র শীর্ষকর্তারা এর বাস্তবতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।
কিন্তু কেন্দ্রীয় তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবের যুক্তি, তিন ঘণ্টা যথেষ্ট সময়। প্রযুক্তি সংস্থাগুলির পাঁচ মিনিটের মধ্যে এই কাজ করে ফেলা উচিত।