Assembly Elections in South India

তামিল রাজনীতিতে চমকপ্রদ উত্থান চিত্রতারকা বিজয়ের, কেরলে জয়ী কংগ্রেস জোট, পুদুচেরিতে এনডিএ

বিরোধী জোটের নেতৃত্বে ছিলেন তামিলনাড়ু বিধানসভার বিরোধী দলনেতা তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ইকে পলানীস্বামী। তাঁর দল এডিএমকে এ বার লড়েছিল ১৬৬টিতে।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৫ মে ২০২৬ ০১:০৫
গ্রাফিক আনন্দবাজার ডট কম।

গ্রাফিক আনন্দবাজার ডট কম।

পশ্চিমবঙ্গ এবং অসমে বিপুল ভাবে জয়ী হলেও দক্ষিণ ভারতে ভাল ফল হল না বিজেপির। তামিলনাড়ু এবং কেরলে তাদের জোট তৃতীয় স্থান পেয়েছে। অন্য দিকে, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরিতে সহযোগী এনআর কংগ্রেসের ‘জুনিয়র পার্টনার’ হিসাবে ক্ষমতায় ফিরতে চলেছে নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহের দল। কোথাওই তাদের আসন দু’অঙ্কে পৌঁছয়নি। সামগ্রিক ভাবে সবচেয়ে চমকপ্রদ ফল হয়েছে তামিলনাড়ুতে। দ্রাবিড় রাজনীতিতে সাত দশকের ডিএমকে-এডিএমকে সমীকরণ তছনছ করে দ্বিতীয় স্থান পেয়েছে চিত্রতারকা থলপতি বিজয়ের দল তামিলাগা ভেটরি কাজ়াগম (টিভিকে)। কেরলে এক দশক পরে বামেদের হারিয়ে ক্ষমতায় ফিরেছে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট।

Advertisement

তামিলনাড়ুতে ‘বিজয়’-যাত্রা

মোট ২৩৪ আসনের তামিলনাড়ু বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ১১৮টি আসন। কিন্তু কোনও দল বা জোটই তা পায়নি। চিত্রতারকা বিজয়ে টিভিকে ১০৭টিতে জিতে একক বৃহত্তম দল হয়েছে। ডিএমকে-কংগ্রেস-বাম জোট ৭৪ এবং এডিএমকে বিজেপি জোট ৫৩টি জিতেছে।

উল্লেখযোগ্য প্রার্থীদের মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী তথা ডিএমকে নেতা এমকে স্ট্যালিন কোলাথুরে পরাস্ত হয়েছেন টিভিকে প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা ডিএমকে প্রার্থী ও পন্নীরসেলভম বোডিনায়াকানুরে জিতেছেন। এডিএমকে প্রধান ইকে পলানীস্বামী এডাপ্পাডি আসনে জয়ী হয়েছেন। চিত্রতারকা তথা টিভিকে প্রধান ‘থলপতি’ বিজয় পেরাম্বুর এবং তিরুচিরাপল্লি পূর্ব বিধানসভা আসনে লড়ে দু’টিতেই জিতেছেন।

এ বারের বিধানসভা ভোটে ডিএমকে প্রধান তথা মুখ্যমন্ত্রী স্ট্যালিনের নেতৃত্বে লড়েছিল বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র তামিল সংস্করণ ‘সেকুলার প্রোগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স’ (এসডিএফ)। ডিএমকের পাশাপাশি সেই জোটে কংগ্রেস, সিপিএম, সিপিআই, ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগ (আইইউএমএল), ডিএমডিকে, ভিসিকে, এমডিএমকে-সহ মোট ১৪টি দল ছিল জোটে। এর মধ্যে ডিএমকে একাই লড়েছিল ১৬৪টিতে। দ্বিতীয় বৃহত্তম সহযোগী কংগ্রেস ২৮টিতে।

অন্য দিকে, বিরোধী জোটের নেতৃত্বে ছিলেন তামিলনাড়ু বিধানসভার বিরোধী দলনেতা তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ইকে পলানীস্বামী। তাঁর দল এডিএমকে এ বার লড়েছিল ১৬৬টিতে। ১২ দলের এই জোটে বিজেপির ভাগে বরাদ্দ ছিল ২৬টি। এ ছাড়া প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিকে ভসনের তামিল মনিলা কংগ্রেস-সহ তিনটি আঞ্চলিক দলের ভাগের আরও সাতটি আসনে ছিল পদ্মচিহ্নের প্রার্থী। আর এক প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অন্বুমণি রামাডসের দল পিএমকে ১৮টি আসন নিয়ে এই জোটেই শামিল হয়েছিল।

বিধানসভা ভোটের কয়েক মাস আগেই অবশ্য পিএমকে-তে আড়াআড়ি বিভাজন ঘটেছিল। অন্বুমণির পিতা তথা দলের প্রতিষ্ঠাতা এস রামাডস এবং তাঁর কন্যা তাঁর কন্যা গান্ধীমতি (‘শ্রীগান্ধী’ নামে পরিচিত) পরিবারের অন্দরে ক্ষমতার লড়াইয়ে পরাস্ত হয়ে নতুন দল এপিএমকে গড়ে জোট তৈরি করেছিলেন প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতার বান্ধবী শশীকলার দল পিটিএমএমকের সঙ্গে। শশীকলার ভাইপো তথা এডিএমকের বহিষ্কৃত নেতা টিটিভি দীনকরণের দল এএমএমকে অবশ্য যোগ দিয়েছিল এডিএমকে-বিজেপির জোটেই।

তবে এ বার দ্রাবিড়ভূমের নির্বাচনী প্রচারপর্বেই ‘প্রকৃত তৃতীয় শক্তি’ হিসাবে আবির্ভূত হয়েছিল তামিল চিত্রতারকা সি জোসেফ বিজয়ের দল টিভিকে। ভোটের ফলে তারা প্রথম স্থানে উঠে এসেছে। রূপোলি পর্দার মহাতারকা বিজয় তাঁর অনুগামীদের কাছে ‘থলপতি’ (দলপতি) নামে পরিচিত। ২০২৪ সালে নতুন দল গড়ার পরে রাজ্য জুড়ে ‘পরিবর্তন যাত্রা’ শুরু করেছিলেন তিনি। নতুন প্রজন্মের বিপুল সাড়া মিলেছিল তাতে। কিন্তু গত বছর কারুরে তাঁর জনসভায় গিয়েই হুড়োহুড়িতে পদপিষ্ট হয়ে ৪১ জনের মৃত্যুর পরে হঠাৎই কিছুদিনের জন্য অন্তরালে চলে গিয়েছিলেন বিজয়। তাতে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে মনে করেন অনেকেই।

তামিলনাড়ুতে ২০০৪ সাল থেকেই ডিএমকে এবং কংগ্রেসের জোট চলছিল (ব্যতিক্রম, ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচন)। ২০২১ সালে ডিএমকে কংগ্রেস-সহ অন্য দলগুলির সঙ্গে জোট বেঁধে লড়েই ক্ষমতায় এসেছিল। করুণানিধি-পুত্র স্ট্যালিনের নেতৃত্বে সরকার হলেও কংগ্রেস সেই সরকারে জায়গা পায়নি। তা নিয়ে সময়ে সময়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তামিলনাড়ুর কংগ্রেস নেতারা। ভোটের আগে কংগ্রেসে তরফে ৪০টি আসনের দাবি জানানো হলেও তাতে কর্ণপাত করেননি স্ট্যালিন। যদিও তাঁর পিতা প্রয়াত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী করুণানিধি ২০১১ সালের বিধানসভা ভোটে কংগ্রেসকে ৬৩ আসন ছেড়েছিলেন। তার পর থেকে ধারাবাহিক ভাবে রাহুল গান্ধীর দলের বরাদ্দ আসনে কোপ পড়েছে। ২০১৬ সালে ‘হাত’ প্রতীকের জন্য করুণানিধি বরাদ্দ করেছিলেন ৪১টি আসন। স্ট্যালিন দলের দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২১ সালে ছেড়েছিলেন ২৫টি। এ বার কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গের অনুরোধে তিনটি আসন বাড়িয়েছেন স্ট্যালিন। সূত্রের খবর, থলপতি বিজয়ের তরফে ১০০টি আসন ছাড়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও সর্বভারতীয় স্তরে বিজেপি বিরোধী জোটে বিশ্বাসযোগ্যতা বজার রাখার লক্ষ্যে তাতে সম্মত হননি রাহুল-খড়্গেরা।

২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে তামিলনাড়ুতে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছিল বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’। একপেশে লড়াইয়ে সে রাজ্যের ৩৯টি লোকসভার আসনের মধ্যে সবক’টিতেই জিতেছিল তারা। তার মধ্যে ডিএমকে ২২, কংগ্রেস ৯, সিপিএম ২, সিপিআই ২, ভিসিকে ২, এমডিএমকে ১ এবং আইইউএমএল ১টিতে জয় পেয়েছিল। এডিএমকে এবং বিজেপি দু’দলই ২০২৪ সালে কয়েকটি স্থানীয় দলকে নিয়ে জোট গড়ে আলাদা ভাবে লড়েছিল। ‘ইন্ডিয়া’ প্রায় ৪৭ শতাংশ, এডিএমকে জোট ২৩ শতাংশ এবং বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ ১৮ শতাংশের কিছু বেশি ভোট পেয়েছিল। এ বারের ভোটে বিজয়ের দল কার ভোট বেশি কাটবে, তা নিয়ে তুমুল জল্পনা ছিল। তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্পের অনুকরণে মহিলাদের জন্য বিজয়ের প্রতিশ্রুতি ছিল মাসে ২,৫০০ টাকার ভাতা। অন্য দিকে, স্ট্যালিন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ক্ষমতায় ফিরলে মহিলাদের জন্য ৮,০০০ টাকা নগদ উপহার থাকবে। জবাবে এডিএমকে প্রধান পলানীস্বামী আবার মহিলাদের জন্য ১০,০০০ টাকা উপহারের ঘোষণা করেছিলেন। ভোটের ফল বলছে, এমজি রামচন্দ্রন, জয়ারাম জলললিতাদের ঐতিহ্য মেনেই এ বার তামিলমন জয়ী করলেন আর এক রুপোলি পর্দার তারকা।

কেরলে এ বার ক্ষমতায় কংগ্রেস

প্রায় প্রতিটি বুথফেরত সমীক্ষার ইঙ্গিত ছিল, কেরলে এ বার সিপিএমের নেতৃত্বাধীন এলডিএফ-কে পিছনে ফেলে দেবে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জোট ইউডিএফ। তারা ১৪০ আসনের কেরল বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় জাদুসংখ্যা ৭১ ছুঁয়ে ফেলবে। ভোটের ফল বলছে ইউডিএফ জিতেছে ১০২টিতে। পেয়েছে ৪৬ শতাংশের বেশই ভোট। কংগ্রেস একাই ৬৩ আসনে জিতেছে।

এলডিএফ এ বার সাড়ে ৩৭ শতাংশ ভোট পেয়ে ৩৫টিতে জিতেছে। বিজেপি কয়েকটি ছোট দলের সঙ্গে জোট গড়ে তিন আসনে জিতলেও ১৪ শতাংশের বেশি আসনে জিতেছেন।

গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থীদের মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন (ধর্মাডম), বিরোধী দলনেতা ভিডি সতীশন (পারাভুর), প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি রমেশ চেন্নিথালা (হরিপাড়) এবং এবং প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা বিজেপি নেতা রাজীব চন্দ্রশেখর (নেমোম) জিতলেও স্বাস্থ্যমন্ত্রী তথা সিপিএম নেত্রী বীণা জর্জ (অরনমুলা) হেরেছেন।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কেরলের রাজনীতিতে নয়া ইতিহাস গড়েছিলেন বিজয়ন। তাঁর নেতৃত্বেই ভোটে লড়ে মালয়ালিদের প্রতিষ্ঠান বিরোধী ভোটদানের ‘ঐতিহ্য’ ভুল প্রমাণিত করে ক্ষমতায় ফিরেছিল এলডিএফ। থমকে গিয়েছিল পাঁচ বছর অন্তর ক্ষমতার পালাবদলে অভ্যস্ত কেরলের রাজনীতির ইতিহাস। ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটে এলডিএফ ৯১ এবং ইউডিএফ ৪৭টি আসনে জিতেছিল। ২০২১ সালে এলডিএফের আসন বেড়ে দাঁড়়ায় ৯৯। ইউডিএফ ৪১। ইতিহাস বলছে, ১৯৮২ সালের মার্চে সাংবিধানিক সঙ্কটের জেরে কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী কে করুণাকরণের মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়ে কেরলে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়েছিল। কিন্তু ওই বছর বিধানসভা ভোটে জিতে ক্ষমতায় ফিরেছিলেন করুণাকরণ। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী পদে থেকে ভোটে জিতে ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের ঘটনা ঘটেনি কেরলের রাজনীতিতে। যা করতে পেরেছিলেন বিজয়ন।

ঘটনাচক্রে, ২০১৯ সালে রাহুল গান্ধী কেরলের ওয়েনাড় লোকসভা কেন্দ্র থেকে জেতার পরেই ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের ইতিহাস গড়ছিল বামজোট। সেই লোকসভা নির্বাচনে কেরলের ২০টি আসনের মধ্যে ১৯টিতেই জিতেছিল কংগ্রেস জোট। বামেদের ঝুলিতে গিয়েছিল মাত্র একটি আসন! ঘটনাচক্রে, ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটেও কেরলে বামেদের প্রাপ্তি মাত্র একটি আসন। কংগ্রেস জোট পেয়েছিল ১৮টি। অন্য একটি পেয়েছিল বিজেপি। সেই ভোটে রাহুল ওয়েনাড়ের পাশাপাশি উত্তরপ্রদেশের রায়বরেলী থেকেও জিতেছিলেন। এর পরে ওয়েনাড়ের সাংসদ পদ থেকে তিনি ইস্তফা দেন। উপনির্বাচনে জেতেন প্রিয়ঙ্কা গান্ধী বঢরা।

চলতি বছরের গোড়়ায় কেরলের পঞ্চায়েত ও পুরভোটে ধাক্কা খেয়েছিল সিপিএমের নেতৃত্বাধীন এলডিএফ। স্থানীয় ওই নির্বাচনের ফলের নিরিখে দেখলে শাসক ফ্রন্ট এলডিএফ সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছে। মোট ১৪০ আসনের বিধানসভায় তারা এগিয়ে রয়েছে ৬৪টিতে। প্রধান শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে কংগ্রেসের জোট। চমকপ্রদ ভাবে রাজ্যের রাজধানী তিরুঅনন্তপুরম পুরসভা দখল করেছে বিজেপি! মধ্য কেরলের জেলাগুলিতে বিজেপির পক্ষে খ্রিস্টান ভোটদাতাদের সমর্থন ছিল চোখে পড়ার মতো। সেই সঙ্গে নরেন্দ্র মোদীর দল পেয়েছিল ঐতিহ্যগত ভাবে ‘বামেদের সমর্থক’ হিসাবে পরিচিত অনগ্রসর এঝাভা জনগোষ্ঠীর একাংশের সমর্থন। এঝাভাদের রাজনৈতিক সংগঠন ভারত ধর্ম জনসেনার (বিডিজেএস) সঙ্গে জোট বাঁধার কারণেই পুর-পঞ্চায়েত ভোটে এমনটা হয়েছিল বলে মনে করেন অনেকে। এ বারের বিধানসভা ভোটেও বিজেপির সঙ্গী ছিল বিডিজেএস।

এই পরিস্থিতিতে গত ৯ এপ্রিল বিধানসভা নির্বাচনে কেরলে ভোট পড়েছিল ৭৮.২ শতাংশ। যা সে রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ইতিহাসে এখনও পর্যন্ত তৃতীয় সর্বোচ্চ। ‘তাৎপর্যপূর্ণ’ ভাবে ভোটদানের নিরিখে প্রথম ২০টি কেন্দ্রের মধ্যে উঠে এসেছিল কোঝিকোঢ়, তিরুঅনন্তপুরম, কোচির বেশ কিছু শহুরে বিধানসভা আসন। গ্রামাঞ্চলে ভোটদানের প্রবণতা সচরাচর বেশিই থাকে। কিন্তু এ বার শহরেরও বিস্তীর্ণ এলাকায় ভোট দেওয়ার উৎসাহ দু’ধরনের এলাকাকে প্রায় এক সারিতে এনে দিয়েছিল। তবে ভোটপণ্ডিতদের একাংশের ব্যাখ্যা, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় শহর এলাকার বিধানসভা কেন্দ্রগুলি থেকে গড়ে প্রায় ২৫ হাজার করে নাম বাদ গিয়েছে। মোট ভোটার কমে যাওয়ায় ভোটের শতাংশের হিসেবও অন্য রকম হয়েছে। যদিও এসআইআর প্রক্রিয়ায় কেরলের ১৪টি জেলার মধ্যে মলপ্পুরম, কান্নুর ও কাসারগোড়ে মোট ভোটার বেড়েছে। অন্য জেলাগুলিতে কমেছে।

টানা দু’বার বা তার বেশি যাঁরা বিধায়ক রয়েছেন, তাঁদের আর টিকিট দেওয়া হবে না বলে ২০২১ সালে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সিপিএম। সেই নীতি মেনে সে বার কেরলে সিপিএমের বেশ কিছু প্রথম সারির নেতা-বিধায়ক ভোটে লড়েননি। এ বারও প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতায় আঁচ এড়াতে সেই কৌশলই নিয়েছিল তারা। তা ছাড়া দলের রাজ্য সম্পাদক হয়ে যাওয়ায় পলিটব্যুরোর সদস্য এমভি গোবিন্দন ভোটে লড়েননি। ভোটের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, সেই কৌশল পর পর দু’বার মুখ্যমন্ত্রী পদে থাকা বিজয়নকে তৃতীয় বার তিরুঅনন্তপুরমের কুর্সিতে পৌঁছে দিতে পারল না।

পুদুচেরিতে আবার এনডিএ

বিধানসভা আসনের সংখ্যা মাত্র ৩০। কিন্তু সেগুলি ছড়িয়ে আছে বিচ্ছিন্ন ভাবে চারটি অঞ্চলে! দেশের তিনটি অঙ্গরাজ্যের ‘পেটের ভিতরে’! তার সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই বদল ঘটেছে জনবিন্যাস-চরিত্রের! কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরির অভিনবত্ব এখানেই। সেই সঙ্গে অভিনবত্ব রয়েছে এই রাজ্যের রাজনৈতিক চরিত্রেও।

দিল্লি এবং জম্মু-কাশ্মীর ছাড়া শুধু পুদুচেরিতেই বিধানসভা রয়েছে। ৩০টি আসনের মধ্যে ২৩টি রয়েছে রাজধানীতে পুদুচেরিতে। ৫টি কারাইকালে। এই দু’টি অঞ্চলই বঙ্গোপসাগরের তীরে তামিলনাড়ু রাজ্য দিয়ে ঘেরা। এ ছাড়াও আরব সাগরের তিরে কেরল-বেষ্টিত মাহে এবং অন্ধ্রপ্রদেশ-ঘেরা ইয়ানমে রয়েছে পুদুচেরি বিধানসভার আরও একটি করে আসন। গত দু’দশকের প্রবণতা বলছে পাঁচ বছর অন্তর পুদুচেরিতে ক্ষমতাসীন সরকার বিধানসভা ভোটে পরাস্ত হয়েছে।

এ বার এনআর কংগ্রেসের প্রধান তথা মুখ্যমন্ত্রী এন রঙ্গস্বামী বিজেপি, এডিএমকে এবং ধনকুবের জোস চার্লস মার্টিনের দল এলজেকে-কে সঙ্গী করে আবার ক্ষমতায় ফিরলেন। দীর্ঘ দিন পরে পাঁচ বছর অন্তর পালাবদলের প্রথা থেকে মুক্ত হল পুদুচেরি। ৩০টি আসনের মধ্যে ১৮টিতে জিতেছে ক্ষমতাসীন জোট। এর মধ্যে এনআর কংগ্রেস একাই ১২টিতে। মুখ্যমন্ত্রী এন রঙ্গস্বামী দু’টি আসনে দাঁড়িয়ে দু’টিতেই জয়ী হয়েছেন। অন্য দিকে, বিরোধী ডিএমকে-কংগ্রেস জোট ছ’টিতে এবং তামিল চিত্রতারকা বিজয়ের দল টিভিকে দু’টি আসনে জয়ী হয়েছে।

ষাটের দশকে দ্রাবিড় জাতীয়তাবাদের প্রবল হাওয়ায় তামিলনাড়ু থেকে কংগ্রেস নির্মূল হয়ে গেলেও তামিল সংখ্যাগরিষ্ঠ পুদুচেরি-কারাইকালে কংগ্রেস বা কংগ্রেস ভেঙে তৈরি হওয়া দলের নজরকাড়া উপস্থিতি থেকে গিয়েছে। নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত সেখানে মূল লড়াই ছিল কংগ্রেস বনাম ডিএমকের। পরবর্তী সময় দুই দল জোট বাঁধায় বিরোধী রাজনীতির পরিসর চলে যায় আর এক দ্রাবিড় দল এডিএমকে এবং বিজেপির দখলে। কিন্তু পুদুচেরির পরিস্থিতি আমূল বদলে যায় ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। কংগ্রেস হাইকমান্ড রঙ্গস্বামীকে সরিয়ে মুখ্যমন্ত্রিত্ব ভি বৈথীলিঙ্গমের (পুদুচেরীর বর্তমান সাংসদ) হাতে তুলে দেওয়ায় ক্রুদ্ধ রঙ্গস্বামী নতুন দল এনআর কংগ্রেস গঠন করেন। আর তার মাত্র দু’মাস পরের বিধানসভা ভোটে এডিএমকে এবং দুই বাম দল সিপিএম এবং সিপিআইকে সঙ্গী করে ক্ষমতা দখল করেন তিনি।

২০১৬ সালের ভোটে এডিএমকে সঙ্গী ছিল রঙ্গস্বামীর। কিন্তু বাম দলগুলি আলাদা লড়ে। সে বার ক‌ংগ্রেস-ডিএমকে জোট ক্ষমতা দখল করেছিল পুদুচেরিতে। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের আগে আনুষ্ঠানিক ভাবে এনডিএ-তে যোগ দিয়ে বিজেপির সহযোগী হয়েছিলেন রঙ্গস্বামী। এর পরে ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে বিজেপি এবং এডিএমকে-কে সঙ্গী করে ক্ষমতা দখল করেন তিনি। কিন্তু ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে পুদুচেরির একমাত্র আসনে ৫২ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে জয়ী হন কংগ্রেস প্রার্থী বৈথীলিঙ্গম। এনআর কংগ্রেস এবং এডিএমকে সমর্থিত বিজেপি প্রার্থীর ঝুলিতে গিয়েছিল ৩৬ শতাংশেরও কম ভোট। যদিও এ বার বিভিন্ন বুথফেরত সমীক্ষায় পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, রঙ্গস্বামীর নেতৃত্বে পুদুচেরিতে টানা দ্বিতীয় বার ক্ষমতা দখলের নজির গড়বে এনডিএ। কার্যক্ষেত্রেও তা-ই হল।

Advertisement
আরও পড়ুন