Women Reservation Amendment bill

আসন বাড়িয়ে মহিলা সংরক্ষণে আপত্তি বিরোধীদের, গণতন্ত্র ধ্বংসের অভিযোগ উড়িয়ে পাল্টা হুঁশিয়ারি মোদীর

বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘওয়াল ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’-সহ তিনটি বিল লোকসভায় পেশের পরেই কেন্দ্রের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের উপর আঘাত হানার অভিযোগ তুলেছেন বিরোধীরা।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ ২২:৩৭
(বাঁদিক থেকে) নরেন্দ্র মোদী, প্রিয়ঙ্কা গান্ধী বঢরা, অমিত শাহ।

(বাঁদিক থেকে) নরেন্দ্র মোদী, প্রিয়ঙ্কা গান্ধী বঢরা, অমিত শাহ। গ্রাফিক আনন্দবাজার ডট কম।

মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণ সংক্রান্ত সংশোধনী বিলকে শিখণ্ডী করে আসলে লোকসভার আসন বাড়াতে সক্রিয় হয়েছে বিজেপি, অভিযোগ বিরোধীদের। অভিযোগ, জনগণনার আগেই সুবিধামতো আসন পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলির প্রভাব খর্ব করে উত্তর ভারতের আসনের অনুপাত বাড়িয়ে নেওয়াই উদ্দেশ্য, যেখানে বিজেপির প্রভাব অনেক বেশি। অভিযোগ, সেই কারণেই সংবিধান সংশোধনী বিলে লোকসভার আসন বৃদ্ধির সঙ্গে মহিলা সংরক্ষণকে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘওয়াল ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’ বিল লোকসভায় পেশের পর বিরোধীদের বক্তব্য, লোকসভার আসন বৃদ্ধির মতো ভিন্ন একটি বিষয়কে মহিলা সংরক্ষণ বিলের অধীনে আনা হয়েছে বিজেপির রাজনৈতিক লক্ষ্যসাধনের জন্যই। বিজেপি অবশ্য এই বিলের বিরোধিতা করার মধ্যে বিরোধীদের মহিলা আসন সংরক্ষণের বিরোধিতাই দেখছে।

Advertisement

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নানা যুক্তি দিয়ে দাক্ষিণাত্যের বঞ্চনার অভিযোগ খারিজ করলেও ‘আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব’ কমার আশঙ্কার বিষয়টি এড়িয়ে গিয়েছেন! কিন্তু বিলের খসড়া প্রস্তাবে স্পষ্ট, নতুন আইন কার্যকর হলে জন্মহারে এগিয়ে থাকা উত্তর ভারতের রাজ্যগুলির লোকসভা আসন তুলনামূলক ভাবে অনেকটাই বাড়বে। ফলে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে পিছিয়ে পড়বে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলি— ঘটনাচক্রে যেখানে বিজেপির জনভিত্তি কম। অন্য দিকে, কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়ঙ্কা গান্ধী লোকসভায় বলেন, ‘‘এই বিল এই খসড়া নিয়ে পাশ হলে গণতন্ত্রের ইতি ঘটবে দেশে।’’

সংসদে তিন দিনের বিশেষ অধিবেশনে তিনটি বিল পাশ করাতে চাইছে কেন্দ্র। প্রথমটি— লোকসভা এবং বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভায় মহিলাদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ১৩১তম সংবিধান সংশোধনী বিল ( পোশাকি নাম, ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’। লোকসভার সাংসদ সংখ্যা বাড়িয়ে ৮৫০ করার বিষয়টি এরই অন্তর্গত), দ্বিতীয়টি— লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত বিল। তৃতীয়টি— কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল আইন সংশোধনী বিল। বৃহস্পতিবার দুপুরে তিনটি বিলই লোকসভায় পেশ করার পরে দিনভর বিতর্ক এবং বিতণ্ডা হয়েছে সরকার ও বিরোধী পক্ষের। সূত্রের খবর, শুক্রবার বিকেলে এই তিনটি বিলের উপর ভোটাভুটি হতে পারে সংসদের নিম্নকক্ষে।

বিল পেশেও ভোটাভুটি

বিল লোকসভায় পেশ করা হবে কি না, তা নিয়েও ভোটাভুটি হয় অধিবেশন কক্ষে। তাতে বিল পেশের পক্ষে মত দেন ২৫১ জন সাংসদ। বিপক্ষে মত দেন ১৮৫ জন। সংসদের অধিবেশন শুরুর আগে বৃহস্পতিবার সকালেই সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। নারী ক্ষমতায়ন নিয়ে বার্তা দেন তিনি। তাঁর কথায়, নারী ক্ষমতায়নের জন্য এক ‘ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’ হতে চলেছে সংসদের বিশেষ অধিবেশনে। কংগ্রেস, তৃণমূল, সমাজবাদী পার্টি-সহ বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র শরিক দলগুলি এই বিলের মূল ভাবনার প্রতি নীতিগত সমর্থন জানালেও, এর সঙ্গে সম্পৃক্ত আসন পুনর্বিন্যাস (ডিলিমিটেশন) প্রক্রিয়ার তীব্র বিরোধিতা করেছে। বিরোধীদের দাবি, সরকার এই বিলের মাধ্যমে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা করছে।

আসনবৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন

সংবিধানের ৮১ নম্বর ধারা অনুযায়ী লোকসভার সর্বোচ্চ আসন ৫৫২ হতে পারে। এর মধ্যে ৫৩০ জন বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে এবং ২০ জন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলি থেকে নির্বাচিত হতে পারে। ৮১ নম্বর ধারা অনুযায়ী এর আগে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান জনগোষ্ঠীর ২ জন সদস্য লোকসভায় মনোনীত হতেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জমানায় ২০১৯ সালে সংবিধানের ১০৪তম সংশোধনীর মাধ্যমে তা তুলে দেওয়া হয়েছিল। এ বার ৮২ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাব রয়েছে বিলে। ৮২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনগণনার শেষ হওয়ার পরে সংসদীয় নির্বাচনী এলাকার পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়া শুরু করা যায়।

কিন্তু জনগণনার রিপোর্ট প্রকাশের আগেই লোকসভার আসন বাড়িয়ে ৮৫০ করে মহিলা সংরক্ষণ চালু করতে চাইছে মোদী সরকার। যা নিয়ে আপত্তি বিরোধীদের। সেই সঙ্গে বিরোধীদের একাংশ মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসনের মধ্যে তফসিলি, অনগ্রসর এবং সংখ্যালঘু মহিলাদের পৃথক সংরক্ষণ চেয়েছেন। সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব বৃহস্পতিবার সংখ্যালঘু মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণের দাবি তুললে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তার তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, ‘‘ভারতীয় সংবিধান কোনও ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর জন্য কোনও ধরনের সংরক্ষণ অনু‌মোদন করে না।’’

গণতন্ত্রের ইতি, শঙ্কা প্রিয়ঙ্কার

লোকসভায় মোদী সরকারের পেশ করা তিনটি বিলের সঙ্গে নারীদের কোনও সম্পর্ক নেই বলে বৃহস্পতিবার অভিযোগ করলেন প্রিয়ঙ্কা গান্ধী বঢরা। ওয়েনারের কংগ্রেস সাংসদ বলেন, ‘‘মহিলা সংরক্ষণের মোড়কে বিজেপি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে চাইছে। এই বিলগুলো আনার মাধ্যমে কেন্দ্র অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণীর (ওবিসি) অধিকার কেড়ে নিতে চায়।’’ এর পরেই তাঁর মন্তব্য, ‘‘বর্তমান খসড়ায় বিল পাশ হলে দেশে গণতন্ত্রের ইতি ঘটবে।’’

২০২৩ সালে ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’ বিল পাশ হয়েছিল লোকসভা এবং রাজ্যসভায়। মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণের ওই বিলে বলা হয়েছিল, জনগণনার পরে আসন পুনর্বিন্যাস করা হবে। তার পর ওই আসনের ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণ করা হবে মহিলাদের জন্য। কিন্তু এখন কেন্দ্র আর জনগণনা পর্যন্ত অপেক্ষা না করে দু’টি পৃথক বিষয়কে একসঙ্গে জুড়ে দেওয়ায় প্রশ্ন তুলেছে অন্য বিরোধী দলগুলিও।

‘মেয়েরা ক্ষমা করবে না’, হুঁশিয়ারি মোদীর

বৃহস্পতিবার লোকসভায় বিতর্কে মহিলাদের আসন সংরক্ষণ বিল নিয়ে বিরোধীদের হুঁশিয়ারি দিয়ে মোদী বলেন, “যাঁরা মহিলা সংরক্ষণ বিলের বিরোধিতা করছেন, মেয়েরা তাঁদের ক্ষমা করবে না।” বিরোধিতার জন্য তাঁদের ‘দীর্ঘ সময় ধরে মূল্য চোকাতে’ হবে বলেও জানান তিনি। তাঁর সরকারের এই উদ্যোগ, দেশের জন্য অন্যতম ‘ঐতিহাসিক’ পদক্ষেপ হিসাবে উল্লেখ করলেন তিনি৷ কিন্তু সেই সঙ্গেই প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য, ‘‘আমি মহিলা সংরক্ষণ বিল পাশের কৃতিত্ব চাই না।’’ মোদীর কটাক্ষ, কোনও নেতা এর কৃতিত্ব নিতে চাইলে তিনি পাতা জুড়ে বিজ্ঞাপনও দিতে পারেন।

মহিলা সংরক্ষণ বিল নিয়ে মোদীর বক্তৃতার সময় উঠে দাঁড়িয়ে কিছু বলছিলেন তৃ়ণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁকে বসতে বলেন স্পিকার ওম বিড়লা। তার পরেই স্পিকারের উদ্দেশে মোদী বলেন, “ওঁকে (কল্যাণ) বলতে দিন। ওখানে (পশ্চিমবঙ্গ) ওঁকে কেউ কিছু বলতে দেন না।” আসন পুনর্বিন্যাস বিল পাশ হলেও দাক্ষিণাত্যের স্বার্থে আঁচ আসবে না দাবি করে মোদী বলেন, ‘‘আমি ‘গ্যারান্টি’ দিচ্ছি, দক্ষিণী রাজ্যগুলি কোনও ভাবে বঞ্চিত হবে না।’’ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহও দাবি করেছেন, দক্ষিণের রাজ্যগুলির প্রতিনিধিত্ব কমবে না, বরং বাড়বে।

Advertisement
আরও পড়ুন