Dolyatra

বাঙালির দোল আর চিরবিরহের গল্পের নটেগাছটি কি একেবারেই মুড়িয়েছে? কেমন আজকের বিরহদিন

বাঙালির দোল আর বিরহকে একাকার করেছিলেন তরুণ মজুমদার তাঁর ‘দাদার কীর্তি’ ছবিতে। দোলে যখন সবাই মাতোয়ারা, তখন প্রেমে অপমানিত প্রত্যাখ্যাত নায়ক রেললাইনের উপরে এক স্থবির ট্রলির উপরে বসে রয়েছে রং থেকে আনন্দ থেকে দূরে…।

Advertisement
অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: ০৩ মার্চ ২০২৬ ১০:১৪
A lookback into the relation of Dolyatra and estrangement in Bengali life flow

চিরবিরহের দোল কি হারিয়েছে বাঙালি? ছবি: সংগৃহীত।

গলির মোড়ে কিসের গাছ ছিল ওটা? সারা বছর পাতাহীন শুকনো ডাল মেলে ধরত মহাশূন্যের দিকে। ঝুঁঝকো সন্ধেয় মনে হত, কেউ যেন করতল প্রসারিত করে রেখেছে আকাশের দিকে। তারা খসে পড়লেই লুফে নেবে। ফেব্রুয়ারি আসতেই তার চেহারা আলাদা সবুজ পাতায় আর রক্তলাল ফুলে সে এক কাণ্ড! আর ওই গাছের পাশটিতেই ছিল তাহাদের বাড়ি। ‘তাহা’ নামটা ডাকনাম। একান্ত গোপনের। হয়তো ওর নাম কাবেরী কিংবা রুমি, কে অত খবর রাখে। সন্ধের লোডশেডিং বেলায় তাহাদের বাড়ি থেকে ভেসে আসত গলা সাধার তরল গরল। অনিঃশ্বাসে পান করতে হত তাকে। সে যে কী বিষ, সে যে কী অমৃত আজ এই বছর পঞ্চাশে এসেও ভুলতে পারেননি সুনন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়। সংসারী। প্রেমজ বিয়ে। সন্তান। অধ্যাপনার নিচিন্ত চাকরি। তবু ফেব্রুয়ারি এলেই উচাটন আজও। কাউকে বলা যাবে না সে কথা। তাহাদের কথা। তাহা, তাহার বান্ধবীরা, তাদের ডালপালা মেলে ওঠার দিন। সাইকেল অপরাহ্ন। বড় একটা ভাঁজ খাইয়ে মোড় ঘুরে যাওয়া। কায়দা। কার জন্য? সুনন্দ আজও মনে মনে রক্তিম হয়ে ওঠেন সে সব কথা ভেবে। ভিতরে ভিতরে অম্বলের চোরা টানের মতো গলার কাছে পাক খায় অস্বস্তি। কী যেন ছিল সেই গরলের নাম…? ‘রোদন ভরা এ বসন্ত’! খুব বেশি ক্ষণ আজও সইতে পারেন না গানটিকে। যখন ‘দক্ষিণসমীরে দূর গগনে/ একেলা বিরহী গাহে’ চলে আসত গানের অনিবার্যতায়, তখন কু-ডাকা মন জানত এই বিরহভার বইতে হবে সারা জীবন। সংসার পেরিয়ে, সন্তান পেরিয়ে, মোড় পেরিয়ে, সবুজ পাতা আর রক্তলাল পেরিয়ে দূর গগনে যে চিরবিরহের আসন পাতা, তা মোক্ষম মালুম হত।

Advertisement

আর তখনই সা-রা-রা-রা করে বেজে উঠত ঢোল। গাছে ডাল থেকে রক্তলাল নেমে এসে হাতমুঠি আবিরে। সে শুধু রঙের দিন। সে লগন রং শুনাবার। সত্যিই হাতে ধরা আবিরে গান গুমরে গুমরে উঠত সুনন্দর। তাহাদের বাড়ির সমস্ত কপাট বন্ধ। দোল কি ভদ্দরলোকে খেলে? সেই কপাটের অন্তরালেও কি গুমরে উঠত দু’খানি চোখ, একমাথা ঝাঁকড়-মাকড় চুল শুধুমাত্র আবির নেবে বলে। সে শুধু তাহা-র দিন। যে মুঠোভর আবিরের কোনও দিন গন্তব্যে পৌঁছোনো হল না, এ লগন সেই গান শুনাবার।

স্মৃতিসমুদ্রে ডুব দিলেন অর্থনীতির সিরিয়াস মাস্টারমশাই সুনন্দ। বলেই ফেলুলেন, এখনও সেই বিশেষ রং-দিনটি এলে শূন্য মুঠোও যান ভরে যায় আবিরে। গাছটা নেই। তাহাদের বাড়ির জায়গায় আজ বহুতল। কোনও অমৃতগরল ছলকে নামে না সন্ধে বেলায়। তবু ফেব্রুয়ারি-মার্চের এই বিশেষ দিনটিতে মনে পড়ে যায় ‘তাহা’র কথা। তাঁর দেওয়া একান্ত নামটির কথা। আজ বছর পঞ্চাশে দাঁড়িয়ে পাকাপোক্ত গার্হস্থ্যের শক্ত বনিয়াদের উপরে ভর দিয়েও কেন যে ভোলা গেল না সেই বিরস দিন বিরল কাজের কথাটি, কে জানে!

A lookback into the relation of Dolyatra and estrangement in Bengali life flow

চোখ বুজলেই দেখা যাবে হারানো বিরহদিন। ছবি: সংগৃহীত।

বাঙালির দোল আর বিরহকে একাকার করেছিলেন তরুণ মজুমদার তাঁর ‘দাদার কীর্তি’ ছবিতে। দোলে যখন পশ্চিমের সেই জনপদের বাঙালি-অবাঙালি একযোগে মাতোয়ারা, তখন প্রেমে অপমানিত প্রত্যাখ্যাত নায়ক রেললাইনের উপরে এক স্থবির ট্রলির উপরে বসে রয়েছে রং থেকে আনন্দ থেকে দূরে…। সামনে পয়েন্টসম্যান আর তার স্ত্রীর দোলখেলা দেখছে সে। বহু ক্ষণ পর সেই পয়েন্টসম্যান আর তার স্ত্রী ছাতু আর জল নিয়ে এসে দাঁড়ায় তার সামনে। উৎসবের দিন অভুক্ত মানুষকে সেই সামান্য খাদ্য-পানীয় তারা সবিনয়ে গ্রহণ করতে বলে। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল কাহিনিতে এমন কোনও দৃশ্যের উল্লেখ ছিল না। কিন্তু কিশোর প্রেমের ব্যাপারে মাস্টারমাইন্ড তরুণবাবু ধরতে চেয়েছিলেন এমন এক বিরহভাবনাকে, যেখানে উৎসব আর দূরত্ব একাকার। প্রেম আর প্রত্যাখ্যান রেললাইনের মতোই সমান্তরালে চলে। কৈশোরে যাঁরা ‘দাদার কীর্তি’ দেখেছেন, তাঁরা জানেন এর মর্মবেদনকে।

স্নিগ্ধা রায়চৌধুরী গানের শিক্ষিকা। কলকাতার উপকণ্ঠের এক জনপদে গান শেখানোর স্কুল আছে তাঁর। বিয়ে করেননি। হারমোনিয়াম, তানপুরা আর পেল্লায় সাইজের রবীন্দ্রনাথের ছবি নিয়েই কাটিয়ে দিলেন সারা জীবন। সেই দীর্ঘকায় দেবতার গান মানেই অনিবার্য ভাবে এসে পড়ে বিরহের কথা। দোলের দিনে সারা পাড়া যখন বাঁদুরে রং আর বেলুন ছোড়াছুড়িতে ব্যস্ত, তখন নিজের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে বসন্ত উৎসব পালন করে আসছেন যৌবন থেকেই। আজ চুলে রুপোলির আধিক্যই চোখে পড়ে। সকাল ন’টার মধ্যেই তাঁর গানের স্কুলে ভিড় ছাত্রছাত্রীদের। প্রাক্তনীদেরও। এই গানের ক্লাস থেকেই প্রেম, বিয়ে হয়েছে অনেকের। অনেকের আবার মাঝপথেই দাঁড়ি পড়ে গিয়েছে সম্পর্কে। কিন্তু স্নিগ্ধাদি একই রকম আছেন। বাহুল্যহীন, অথচ পরিপাটি সাজ। বসন্তোৎসবের দিনটিতেও সাদা খোলের শাড়ি। এখানে আবির ছাড়া অন্য রং নিষিদ্ধ। আজ যেখানে কলকাতার পাড়ায় পাড়ায় শান্তিনিকেতনি কেতায় আবির আর রবীন্দ্রসঙ্গীতের বসন্তোৎসবের হিড়িক, সেই সংস্কৃতি স্নিগ্ধাদি শুরু করেছিলেন আশির দশকের শেষ দিকে। পাড়ার মোড়ের মাইক বেয়ে ব্যারিটোন বচ্চনকণ্ঠে ‘রং বরসে’ বেজে গেলেও স্নিগ্ধাদির হলঘরে হারমোনিয়াম, তবলা আর এসরাজের সঙ্গতে কেউ মৃদু কণ্ঠে গাইছেন ‘তোমার গোপন কথাটি’। একটু বেলা বাড়লে মিষ্টিমুখ করে বিদায় নেন সবাই। স্নিগ্ধাদি সন্ধেবেলায় আবার টেনে নেন হারমোনিয়াম। খুব গোপন কথার মতো, প্রায় পাতাঝরার শব্দের মতো স্বরে গেয়ে ওঠেন, ‘কখন যে বসন্ত গেল, এবার হল না গান’। নিবিড় হয়ে আসা হুল্লোড়হীন দোলের সন্ধের বাতাসে কি গুমরে ওঠে অভিমান? স্নিগ্ধাদি মৃদু হেসে বললেন, “সারাটা সকাল তো মিলনের গানই হয়েছে। সন্ধেটা তোলা থকুক না বিরহের জন্য।”

তা থাকুক। নিজের জীবন সম্পর্কে বিশেষ বলতে নারাজ স্নিগ্ধাদির মতে রবীন্দ্রগানের বাইরে তাঁর জগৎ বলে কিছুই নেই। আর রবিঠাকুর তো নিখাদ বিরহপুরুষ ছিলেন না! বসন্তে, রঙের মেলায় তাঁর মিলনের গানের পাল্লাই হয়তো ভারী। কিন্তু নিরালা সাঁঝবেলায় কেন বিরহগান? কখনও মনে হয় স্নিগ্ধাদির মতো মানুষ হয়তো সেই চিরবিরহের সন্ধানই করে গিয়েছেন সারা জীবন, যা তাঁদের আরাধ্য পুরুষটি তাঁর জীবৎসীমা জুড়ে করে গিয়েছেন। সীমাহীন আকাশতলে গুঞ্জরে উঠেছে বিরহবেদন। সে বিরহ হয়তো সৃষ্টির শিকড় ছুঁয়ে রয়েছে। রং আর ফাগের অভিজ্ঞান শুধু তাকে মনে করিয়ে দেয় সেই ‘সুন্দর’-এর কথা, যাকে হাতে ধরা যাবে না কখনওই।

A lookback into the relation of Dolyatra and estrangement in Bengali life flow

যে সব রং হারিয়ে গিয়েছে সময়ের বাঁকে। ছবি: সংগৃহীত।

কিন্তু এ সবই যেন বিগত জন্মের কথা। সুনন্দবাবুই হোন বা স্নিগ্ধাদি, তাঁরা কেউই মিলেনিয়াল বা জেন জ়ি নন। আজকের প্রজন্মের কাছে ‘চিরবিরহ’ শব্দটার কোনও মানে আছে কি? ‘দোল’-এর আছে, ‘হোলি’-রও আছে। কিন্তু বিরহ? তা-ও আবার ‘চির’! কবি জয় গোস্বামীর কাছে এমন প্রশ্ন রাখা হলে তিনি প্রথমেই মাথা নাড়লেন নেতিবাচক ভঙ্গিমায়। তাঁর মতে, উৎসব হিসাবে দোল থাকলেও ‘চিরবিরহ’ বা কোনও রকমের বিরহই আজ আর নেই। কবির কথায়, “বিরহ তৈরি হয় দূরত্ব থেকে। প্রযুক্তির দৌলতে সেই দূরত্বটাই তো আজ উধাও। বিরহের বদলে আজ যেটা আছে, তার নাম ‘ব্রেক আপ’। যার শিকড়ে রয়েছে বিদ্বেষ। বিরহ অভিমান থেকে আসে। সেই অভিমানও আজ নিছক বিদ্বেষে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।” কথাচ্ছলে জয় জানালেন এক তরুণীর বিষয়ে। তাঁর তখন কৈশোর আর যৌবনের সন্ধিক্ষণ। সেই সময়ে এক তরুণের সঙ্গে তাঁর একটা সম্পর্ক হয়। কিছু দিন পরে সেই সম্পর্ক ছিন্নও হয়ে যায়। অথচ সেই তরুণটি তরুণীর বাড়িতে একদিন এসে হাজির হন তাঁর সাম্প্রতিক প্রেমিকাকে নিয়ে। তেমন কোনও দরকারও ছিল না তাঁর সেই বাড়িতে ফিরে আসার। পরে সেই তরুণী তাঁর বাবার কাছে হাসিতে ফেটে পড়ে জানিয়েছিলেন, শুধুমাত্র প্রেমিকাকে দেখানোর জন্যই সেই যুবক সে দিন তাঁদের বাড়িতে গিয়েছিলেন। এর মধ্যে বিরহ কোথায়? এ তো নিছক প্রতিশোধস্পৃহা থেকে উঠে আসা এক মনোবৃত্তি!

এই প্রসঙ্গে আর এক নারীর কথা বললেন জয়। এক মধ্যযৌবনা নারী। সম্পর্কে ছিলেন। সেই সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরে তিনি কবির কাছেই আসেন সান্ত্বনার সন্ধানে। সেই মহিলার মধ্যে শিল্পবোধ ছিল। কবি তাঁকে বলেন সেই শিল্পকে নিয়েই ঘুরে দাঁড়াতে। এ যেন এক রেওয়াজের মতো। তার কিছু দিন পরে তিনি জানতে পারেন সেই মহিলা তাঁর সাম্প্রতিক প্রেমিকের হাতে হাত রেখে হেঁটে গিয়েছেন প্রাক্তনের সামনে দিয়ে। এখানেও শুধু দ্বেষ, অন্যের মুখ ম্লান করে দেওয়ার সুখ। বিরহ কোথায়? জয় কিছুটা আত্মমগ্ন স্বরে তুলে আনলেন কালিদাসের ‘মেঘদূত’-এর কথা। সেখানে যক্ষের সঙ্গে যক্ষিণীর বৎসরকালের অদর্শন ছিল। মন্দাক্রান্তা ছন্দে যক্ষ মেঘকে পাঠিয়েছিলেন বিরহবারতা দিয়ে। ভারতীয় পরম্পরাতেও রয়েছে এ হেন বিরহের উদাহরণ। জয় জানালেন ‘ছায়াবেহাগ’ নামে এক বিরল রাগের বন্দিশের কথা। যেখানে কাককে পাঠাচ্ছেন বিরহী প্রেমিক তাঁর দয়িতার খবর আনার জন্য। নদীবাংলার গ্রামগুলিতে নৌকার মাঝিকে প্রিয়া বা প্রিয়ের বার্তা আনার অনুরোধ করা হচ্ছে, এমন লোকসঙ্গীতও মোটেই বিরল নয়। কিন্তু আজ ভিডিয়ো চ্যাট আর সমাজমাধ্যমের দাপটের যুগে সেই দূরত্বই আর নেই, ‘অপেক্ষা’ শব্দটিও অচেনা হয়ে গিয়েছে। সেখানে ‘চিরবিরহ’ যেন দেওয়ালে লেখা একটা স্লোগানশব্দ। তার বেশি কিছু নয়।

দোল আর চিরবিরহ নিয়ে খানিক আত্মমগ্ন হলেন সত্তরের আর এক কবি প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কবিতায় মাঝেমধ্যেই উঁকি দিয়ে গিয়েছে উত্তর কলকাতার দোল। যে কবি একদিন লিখেছিলেন, “ধাঙর বস্তিতে গিয়ে হোলির বাঁদুরে রং/ মেখে নিলে বোঝা যায় বসন্তের মর্মবেদনা”, তিনিই যেন কিছুটা উদাসীন চিরবিরহের কথায়। দোলের সঙ্গে লেগে থাকা বিরহ খুব সাময়িক। বসন্তের মর্মবেদনা জাগিয়েই তা বিলুপ্ত হয়ে যায়। তবু কোথাও যেন অন্তঃসলিলা বিরহধারা বহমান থাকে। এ কবিতা লেখার বহু পরে ‘মৈথুন’ নামের এক কবিতায় প্রসূন লিখেছিলেন— “দোলের দিন বেলা ডেট্টা সাত মিনিটে মুক্তিপদর/ ক্লেশাবরণ (অহংজ্ঞান) খসে গিয়ে আন্ডারোয়ার বেরিয়ে পড়ল”। পাড়ার চেনা মাতাল মুক্তিপদ তখন বেদমন্ত্র এড়িয়ে তন্ত্রের পঞ্চ ম-কারের উল্লাসে রত। পঞ্চ ম-এর শেষ ম, অর্থাৎ মৈথুন-এ এসে চিৎকারে ফেটে পড়ছে মুক্তিপদ। সেই পরম মুহূর্তে যেন মুক্তিপদর জ্ঞানের আবরণটুকুও আর নেই। আছে শুধু শূন্য ও করুণার, প্রকৃতি ও পুরুষের চিরমিলনের উল্লাস। তাঁর দীর্ঘ কবিতাযাত্রায় বিরহ থেকে মিলনের দিকেই ঢলেছে চেতনপ্রবাহ। মিলনে-বিরহে কোনও ভেদ নেই সেখানে। মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে সব।

A lookback into the relation of Dolyatra and estrangement in Bengali life flow

লাল ফুল ফুটিয়ে সেই গাছ কি আজও হাসছে? ছবি: সংগৃহীত।

কে না জানে, আজ সত্যিই বিরহ আটকে আছে সংস্কৃত অনার্সের ক্লাসে ‘মেঘদূত’ পড়ানোর জালে। ব্রেক আপ আর বিরহ যে এক নয়, তা আজকের প্রজন্ম কি মনে রাখে? প্রতিশোধ কি প্রেমেরই অপর পিঠ? এই সব সাতপাঁচ ভাবনা ঘুরপাক খায় ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায়। তবু কি বিরহবোধ জাগে না কোথাও? কোচিং ক্লাসের ঘনবদ্ধ উপপাদ্য বুঝতে বুঝতে ক্লাস নাইনের ছেলেটি কি ভাবে না উল্টো দিকের বেঞ্চিতে বসে একমনে নোট নেওয়া মেয়েটির চিবুকে যদি এক ফোঁটা আবির দেওয়া যেত… কেমন হত! উল্টো দিকের মেয়েটি কোনও দিনও জানতেও পারবে না, কোন প্রসাধনীতে তাকে এক দোলের প্রাক্মুহূর্তে কেউ সাজিয়েছিল। শত হায়ারুলোনিক আর স্যালিসাইলিকের সাধ্য নেই সেই আবিরফোঁটার সঙ্গে টক্কর নেওয়ার। সেই ভাবনা কি ক্রমশ কৈশোর থেকে যৌবন পার হয়ে প্রৌঢ়ত্বের দিকে যাওয়ার সময়েও জেগে থাকে না? অর্থনীতির গম্ভীর অধ্যাপক কি নির্জনে, একান্ত নির্জনে বসে ‘তাহা’ নামটিতে আদরের আবির ছোঁয়ান না? ‘গীতবিতান’ আর ‘স্বরবিতান’-এর অলিগলি পেরিয়ে খালি গলায় কি এক বারও স্নিগ্ধাদি গুনগুনিয়ে ওঠেন না “বসন্তের শেষ রাতে এসেছি যে শূন্য হাতে—/ এবার গাঁথিনি মালা, কী তোমারে করি দান”?

গলির মোড়ে সারা গায়ে আগুন জ্বেলে আজ সেই গাছটি আবার যেন জেগে উঠে পাড়াকে আলো দেবে। সমস্ত বাঁদুরে রং ছাপিয়ে, ঢোল-তামাসা পেরিয়ে রং খেলতে খেলতে ক্লান্ত কেউ বাড়ির পথ ধরবে। বিদ্যুচ্চমকের মতো মনে ফুঁসে উঠবে— এ বারও বসন্ত গেল। গাওয়া হল না সেই গান। সেই অনুচ্চারিত গান, যেখানে স্নিগ্ধ এক চিবুকের ডোল থেকে ঝরে পড়ছে পলাশরঙা আবিরগুঁড়ো। ঝরে পড়বে তার সারা জীবন ব্যেপে।

Advertisement
আরও পড়ুন