Medicine for wedding

একটি ডোজ় ২৫,৮০০ টাকা! শাড়ি, গয়নার পাশাপাশি, বিয়ের জন্য বর-কনেরা টাকা ঢালছেন ওষুধেও

এমন ওষুধ, যা জিমে যাওয়া বা ডায়েটের চোখরাঙানি ছাড়াই কমিয়ে দেবে ওজন। বিষয়টি এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে যে, বিভিন্ন ওয়েলনেস ক্লিনিকে আলাদা করে ব্রাইডাল প্যাকেজ মিলছে ওই ওষুধ সমেত।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৩ এপ্রিল ২০২৬ ১৮:০৯
বিয়ের শপিংয়ের বাজেট করা হচ্ছে এক বিশেষ ধরনের ওষুধের জন্যও!

বিয়ের শপিংয়ের বাজেট করা হচ্ছে এক বিশেষ ধরনের ওষুধের জন্যও! গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

বেনারসি নিদেনপক্ষে ২৫-৩০ হাজার। ডিজ়াইনার ব্লাউজ় হাজার দশেক। লেহঙ্গা, শেরওয়ানি ইত্যাদি ভাল ব্র্যান্ডের হলে ৫০ হাজার থেকে শুরু। তবু এ টাকা কিছুই না। সামর্থ্য থাকলে লাখ লাখ কিংবা কোটি খানেক টাকা খরচ করেও বিয়ের পোশাক কেনেন এ কালের হবু দম্পতিরা। আর শুধু পোশাক ভাল হলেই তো হল না। সেই পোশাক পরে সিনেমার নায়ক-নায়িকার মতোও দেখতে লাগতে হবে। তার জন্য দরকার পড়বে টান-টান, নির্মেদ চেহারার। যাঁরা এমনিতেই তেমন চেহারার অধিকারী, তাঁদের কথা আলাদা। কিন্তু যাঁরা তা নন, তাঁরা পাকা দেখা হতে না হতেই ছোটেন জিমের সাবস্ক্রিপশন নিতে। শুরু করেন কড়া ডায়েট। তবে নতুন প্রজন্মের বর-কনেরা ইদানীং তত পরিশ্রম করতে চাইছেন না। বদলে বেছে নিচ্ছেন ‘শর্টকাট’। বিয়ের জন্য মনকাড়া চেহারা পেতে পোশাকের মতোই মোটা টাকা বিনিয়োগ করছেন ওষুধে।

Advertisement

এমন ওষুধ, যা জিমে যাওয়া বা ডায়েটের চোখরাঙানি ছাড়াই কমিয়ে দেবে ওজন। বিষয়টি এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে যে, বিভিন্ন ওয়েলনেস ক্লিনিকে আলাদা করে ব্রাইডাল প্যাকেজ মিলছে ওই ওষুধ সমেত। নয়াদিল্লির এক ত্বকের ক্লিনিকে যেমন একটি প্যাকেজের নাম ‘মাউনজেরো ব্রাইড’। মাউনজেরো হল ওজ়েম্পিকের মতোই ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণের একটি ওষুধ, যা একই সঙ্গে শরীরের কিছু হরমোনকে নিয়ন্ত্রণ করে ওজন কমাতেও সাহায্য করে। ওজন কমানোর জন্য তারকা মহলে ওজ়েম্পিকের মতো ওষুধ ব্যবহারের কথা শোনা গিয়েছে বহু বার (যদিও কোনও তারকা তা নিজে মুখে স্বীকার করেননি)। তবে এখন দেখা যাচ্ছে, সাধারণ মানুষও রোগা হওয়ার জন্য ওই ধরনের ওষুধে আস্থা রাখছেন।

নয়াদিল্লির ওই ত্বকের ক্লিনিকের মাউনজেরো ব্রাইডাল প্যাকেজের ছোট বিবরণী বলছে, ‘‘শরীরকে নানা রকমের পুষ্টির জোগান দেওয়ার পরামর্শ, মাউনজেরো এবং সহজ শরীরচর্চা।’’ শুধু ওই একটি ক্লিনিক নয়। দেশের আরও নানা শহরের ‘প্রি ওয়েডিং ট্রান্সফরমেশন’ অর্থাৎ বিয়ের আগে ভোল বদলে ফেলার প্যাকেজে ত্বকের চিকিৎসা, চুলের স্টাইল বা মেকওভারের পাশাপাশি রাখা হচ্ছে ওজন কমানোর ইঞ্জেকশনও। কিংবা ওয়েগোভি-র মতো ওজন কমানোর ট্যাবলেট। অন্তত তেমনই জানাচ্ছে সংবাদ সংস্থা রয়টার্স। তারা দেশেরই আট জন চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলেছে এ ব্যাপারে। আর তাঁদের অধিকাংশই জবাব দিয়েছেন, বহু হবু কনে মাউনজেরোর ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করতে শুরু করেছেন। আর শুধু মহিলারাই নন, হবু বরেরাও বিয়ের আগে ওই ধরনের ওজন কমানোর ওষুধ লিখে দেওয়ার অনুরোধ বা আবদার করেছেন।

রজত গোয়েল নামের এক বেরিয়াট্রিক সার্জন জানিয়েছেন, তাঁদের কাছে যে যে বিষয়ে প্রশ্ন আসে, তার মধ্যে গত কয়েক মাসে ওজন কমানোর ইঞ্জেকশনের কথা জানতে চেয়ে হবু বর বা কনেদের অনুরোধ এসেছে ২০ শতাংশ। এঁদের অনেকে আবার কত দিন পরে বিয়ে এবং কত দিনের মধ্যে ওজন কমাতে চাইছেন, তার একটা সময়সীমাও বেঁধে দিতে চেয়েছে। যদিও চিকিৎসক জানিয়েছেন, তিনি সবাইকে ওই ওষুধ দেননি। একমাত্র যাঁদের শারীরিক সুস্থতার জন্য ওই ওষুধ প্রয়োজন, তাঁদেরই দিয়েছেন।

এই ধরনের ওষুধের ইঞ্জেকশনের কোনওটির দাম ১৩,১২৫টাকা। কোনওটি ১৬,৪০০ টাকা। আবার ৫,৬৬০ টাকার কম দামি ডোজ়ও রয়েছে। তেমনই সর্বোচ্চ ২৫,৭৮১ টাকার ইঞ্জেকশনও রয়েছে। সে সবই অবশ্য একটি ডোজ়ের দাম। যা এক মাসে দরকার হবে। কিন্তু ওজন কমানোর ওই ওষুধ একটিতে কাজ করবে না। দরকার পড়বে প্রতি মাসে।

কলকাতার চিকিৎসক মল্লিনাথ মুখোপাধ্যায় এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘‘এ ধরনের ওষুধ নেওয়া বন্ধ করলে ওজন দ্বিগুণ গতিতে বাড়তে পারে।’’ অন্যান্য চিকিৎসকেরাও বহু বার ওজ়েম্পিক বা মাউনজেরোর মতো ওষুধ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন এবং জানিয়েছেন, এ ধরনের ওষুধ দীর্ঘ মেয়াদে নিলে ক্ষতিকর। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে খেলে বিপদও হতে পারে। কিন্তু সেসব সাবধানবাণী শুনেও শর্টকাটে ভরসা রাখছে নতুন প্রজন্ম। কারণ, বিয়ে এ দেশে একটি জমকালো ব্যাপার। সেখানে খাবার, সাজসজ্জা, গয়নার মতো বর-কনের সাজ কেমন হলে, তা-ও আলোচনার বিষয়। আর সেই নজর-মিটারে পিছিয়ে পড়তে চাইছেন না কেউ।

২৭ বছরের অদিতি যেমন মুম্বইয়ের বাসিন্দা। অর্থনীতির দুনিয়ায় কাজ করেন। উপার্জনও করেন পর্যাপ্ত। সেই তিনিও ফেব্রুয়ারিতে বিয়ের পিঁড়িতে বসার মাস ছ’য়েক আগে চিকিৎসকের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। অদিতির কথায়, ‘‘আমার নিজের চেহারা নিয়ে আত্মবিশ্বাসের অভাব ছিল। বিয়ের দিনও আমি সেই একই রকম আত্মবিশ্বাসের অভাববোধ করতে চাইছিলাম না। তাই চিকিৎসকের দ্বারস্থ হই। আর ফলাফলে আমি খুশি। আমার ১০ কেজি ওজন কমেছে।’’ হায়দরাবাদের অক্ষিতা আবার জানিয়েছেন, তিনি বিয়ের আগে ওজন কমাতে চেয়েছিলেন তাঁর শ্বশুরবাড়ির একটি মন্তব্য শোনার পরে। তাঁরা তাঁর ভারী চেহারা নিয়ে ব্যঙ্গ করেছিলেন। অক্ষিতা বলেছন, ‘‘তখন আমার ওজন ছিল ৯০ কেজি। ওষুধ খেয়ে বিয়ের আগে আমি ৭৬ কেজি হয়েছি। গত বছর ডিসেম্বরে বিয়ে হয়েছে আমার। আর আমি নিজের সিদ্ধান্তে খুশি।’’ কিন্তু জিমে না গিয়ে বা ডায়েট না করে ওষুধ কেন বেছে নিলেন? অক্ষিতা জানিয়েছেন, তিনি জানতেন, বিয়ের নানা ব্যস্ততায় তাঁর পক্ষে ব্যায়াম করা বা ডায়েট করার সুযোগ হবে না। তাই ওষুধই তাঁর কাছে তুলনামূলক ভাল বিকল্প বলে মনে হয়েছিল।

সোজা কথায়, বিশেষ দিনে বিশেষ দেখানোর জন্য সাজগোজের পাশাপাশি মেদ ঝরানোর ওষুধেও বিনিয়োগ করতে শুরু করেছে নব্য প্রজন্মের একটি অংশ। কারণ, তাঁদের কাছে বিয়ের পিঁড়িতে স্থূলত্বের কোনও জায়গা নেই। প্লাস সাইজ়ের গ্রহণযোগ্যতা তাঁদের কাছে অলীক গল্পের মতোই।

Advertisement
আরও পড়ুন