ওজন ঝরার জাদুকাঠি হিসেবে দেখা হচ্ছে ওজ়েম্পিককে। ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত।
সৌন্দর্যের ধারণা বরাবরই বদলায়। এককালে বাঙালিদের মধ্যে ‘সুন্দর’-এর মাপকাঠি ছিল, গোলগাল মুখ, টানা টানা চোখ। কিন্তু এখন সে ছবি সম্পূর্ণ পালটে গিয়েছে। গলার হাড় বেরিয়ে থাকা তন্বী চেহারাই এখন সৌন্দর্যের মাপকাঠি।
পারিবারিক অনুষ্ঠান মানেই আপনি আতশকাচের তলায়। শেষ বার যখন দেখা হয়েছিল সেজোমামির সঙ্গে, তিনি বলেছিলেন, “একটু ওজন ঝরাতে পারলি না?” বা হোয়াট্সঅ্যাপ গ্রুপে নানা ধরনের লিঙ্ক পাঠানো শুরু করলেন আমেরিকা নিবাসী কাকিমা। যদি অল্প ওজন ঝরে থাকে বা গাল ভেঙে থাকে, তা হলে আপনি প্রশংসায় পুরস্কৃত হবেন। কিন্তু যদি গাল ফোলা লাগে, তা হলেই তির্যক বা দয়ার্দ্র দৃষ্টির আতঙ্ক। কেউ কেউ আবার মনে করিয়ে দেবেন, ‘‘নতুন কী এক ওষুধ এসেছে না? ওজ়েম্পিক! একখানা ইঞ্জেকশন নিলেই তো হয়ে যায়।’’ বলিউড তারকা কর্ণ জোহরকে জড়িয়ে গুঞ্জন ছড়াতেই এই ওষুধের জনপ্রিয়তা বাড়ে দেশে। তার পর থেকে আত্মীয়-পরিজন পরামর্শ হিসেবে ওজ়েম্পিক নিয়ে নানা ধরনের মেসেজ পরিবারের হোয়াটস্অ্যাপ চ্যাটেও পাঠাতে থাকেন। একটিই আশা, যাঁর উদ্দেশে তাঁরা পাঠাচ্ছেন, তিনি হয়তো ওজ়েম্পিক নেওয়ার কথা ভাববেন। আর সেই ব্যক্তি ইতিমধ্যেই নিজের শরীর নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভুগছেন। তাঁর শরীর যেন ব্যক্তিগত নয়, পারিবারিক সম্পত্তি। এই অদ্ভুত এক বাস্তবতার মধ্যেই নতুন এই ওষুধ ঘরোয়া আলোচনায় ঢুকে পড়েছে।
একেবারেই নিছক এক ওষুধ। প্রসাধন সামগ্রী নয়। মেডিসিনের চিকিৎসক অরিন্দম বিশ্বাস বার বার সে কথাই মনে করিয়ে দিতে চাইলেন। রোগীকে ওজ়েম্পিক ওষুধ দেওয়া এখনও শুরু করেননি তিনি। তবে এই ধরনের ওষুধ, অর্থাৎ গ্লুকাগন দিয়ে চিকিৎসা করছেন বহু দিন। এই ওষুধগুলিকে বলা হয় জিএলপি-১। শরীরের একটি স্বাভাবিক হরমোনের মতো কাজ করে এগুলি। খিদে কমায়, রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। অরিন্দম বিশ্বাস ব্যাখ্যা করলেন, ‘‘জিএলপি-র পুরো কথা হল, গ্লুকাগন লাইক পেপটাইড। একগুচ্ছ প্রোটিন নিয়ে পেপটাইড তৈরি হয়। গ্লুকাগন হরমোনের মতো পেপটাইডই হল এই ওষুধটা। এমন ভাবে এটির গঠিত হয়েছে, যেখানে গ্লুকাগন কম বেরোবে শরীর থেকে, হজমক্ষমতা কমিয়ে দেবে, পেট ভর্তি রাখবে। ফলে বেশি খেতেও ইচ্ছে করবে না। এ ভাবেই কাজ করে এই ওষুধ।’’
কী ভাবে কাজ করে ওজ়েম্পিক? ছবি: সংগৃহীত।
মূলত ডায়াবিটিস, স্থূলত্ব ও নির্দিষ্ট শারীরিক সমস্যার চিকিৎসার জন্যই এই ওষুধ তৈরি হয়েছিল। ইনসুলিনের মতো করে দেওয়া হয় এটি। কিন্তু ভারতের প্রেক্ষিতে তার ব্যবহার অনেকটাই অন্য দিকে মোড় নিয়ে ফেলেছে। এই পরিবেশে জিএলপি-১ অনেকের কাছে সহজ রাস্তা হয়ে উঠেছে। চিকিৎসকের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা নয়, বরং পরিবারের বাঁকা নজর এড়াতেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন অনেকে। কেউ কেউ ভাবেন, ওষুধ নিলে অন্তত আর কথা শুনতে হবে না। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের ভিতরে নিজের শরীরের প্রয়োজন কতটা জায়গা পায়, সেটাই প্রশ্ন।
চিকিৎসক জানালেন, কারও ক্ষেত্রে চিকিৎসার প্রয়োজনে এই ওষুধ সত্যিই কার্যকরী। তাঁরা সুস্থ বোধ করেছেন, দৈনন্দিন কাজ সহজ হয়েছে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ চিকিৎসকের। তাঁর কথায়, ‘‘আমার এক রোগীকে গ্লুকাগন দিয়েছিলাম। তিনি এখন আগের থেকে অনেক সুস্থ আছেন। কিন্তু চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এই ওষুধ একেবারেই খাওয়া যাবে না। কারণ এটি একটি ওষুধ, কসমেটিক নয়। অপব্যবহার করলে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক হতে পারে। এমনিতেই এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে, বমি ভাব, বমি, পেটখারাপ, কোষ্ঠকাঠিন্য ইত্যাদি।’’
এখানে ওষুধটি এখন আর শুধু চিকিৎসার বিষয় নয়, সামাজিক কথোপকথনের অংশ। কে কত তাড়াতাড়ি রোগা হলেন, কার ছবি ভাল লাগছে, কার পোশাক ঢিলেঢালা দেখাচ্ছে— এই সব আলোচনার নেপথ্যে উঠে এসেছে এই ওষুধ। বাঙালি পরিবারে এই চাপ আরও পরিচিত।
ছোটবেলায় যত্নের নামে বেশি খাওয়ানো, বড় হলে ততটাই শরীর নিয়ে মন্তব্য। এর কোনওটিই কিন্তু চিকিৎসকের সুপারিশ করা নয়। শিশুরোগ চিকিৎসকেরাও কিন্তু এমন পরামর্শ দেন না। সবই সমাজের চোখে তৈরি। কোন বয়সে কত খাবেন, কোন বয়সে কেমন হবে দেহের আকার, তার স্রষ্টা পরিবার ও আত্মীয়স্বজনই।
মনোবিদ শ্রাবস্তী মজুমদারের সঙ্গে এমন অনেক মানুষ কথা বলতে এসেছেন, যাঁরা ছোট থেকে শরীর নিয়ে কটাক্ষের শিকার। মনোবিদ এমন এক তরুণীর সঙ্গে কথা বলেছিলেন, যিনি শৈশব থেকেই ‘মোষ’-এর তকমা পেয়ে আসছেন। এখন তিনি বুঝেই উঠতে পারেন না, নিজেকে ভালবাসা উচিত, না কি তিনি যোগ্য নন? নিজেকে সুন্দর করে সাজাতে তিনি ভালবাসেন, আবার নিজের চেহারায় সাহসী হতে পারেন না তিনি। হয়তো ওজ়েম্পিকের মতো কিছু পেলে তালি বাজিয়ে রোগা হয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু সে কথা তিনি মুখ ফুটে যদিও উচ্চারণ করেননি। আরও এক যুবতীর কাছ থেকে এমন সমস্যার কথাই শুনেছেন মনোবিদ। রোগা হওয়া, খাওয়াদাওয়া, খাবারের পরিমাণ নিয়ে নিজের মায়ের থেকে এমন কিছু কথা শুনতে হয় তাঁকে, যার ফলে খাবারের মতো একান্ত প্রয়োজনীয় বস্তুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এঁরা কেউই হয়তো ওজ়েম্পিকের কথা উচ্চারণ করেননি, কিন্তু যদি জাদুকাঠির মতো ছুঁয়ে দিলেই সমাজের ‘কাঙ্ক্ষিত চেহারা’ পাওয়া যেত, নিশ্চয়ই তা ব্যবহার করতেন। আর সেই জাদুকাঠি হয়ে উঠছে ওজ়েম্পিক।
চিকিৎসকেরা সতর্ক করছেন, এই ওষুধ কোনও জাদু নয়। ওষুধ বন্ধ করলে ওজন বেড়েও যেতে পারে। শরীরের পাশাপাশি মানসিক দিকেও তার প্রভাব পড়ে। কিন্তু পারিবারিক আলোচনায় এই কথাগুলি খুব একটা জায়গা পায় না। নারী হলে তো তাঁর বিয়ে হওয়া নিয়ে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা চলতে থাকে। ব্লাউজ় ফিট করল কি না, কোমরের মাপ ২৪ থেকে ২৬ ইঞ্চির মধ্যে এসে পৌঁছোল কি না, পিঠের চর্বি দৃশ্যমান হচ্ছে কি না— এ সবের মধ্যেই ওজ়েম্পিকের মতো ইঞ্জেকশনের দিকে লাইমলাইট এসে পড়ে।