শিশুদের নিয়ে ভ্লগিং বা রিল বানানোয় তাদের ঠিক কতটা ক্ষতি হচ্ছে? ছবি: সংগৃহীত।
এখন অবসর মানেই রিলের নেশায় ডুব দিচ্ছেন মানুষ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রিল দেখতে গিয়ে কতটা সময় অপচয় করে ফেলছেন, তা হিসাবের বাইরে। সমাজমাধ্যমের বিভিন্ন পরিসর, যেমন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে রিল, শর্ট স্টোরিজ়, ভিডিয়ো কনটেন্টে শিশুদের উপস্থিতির হার অনেকটাই বেড়েছে। যত দিন যাচ্ছে, ততই বাড়ছে খুদে ভ্লগারদের সংখ্যা। কেউ কেউ আবার বাবা-মায়ের ভ্লগ থেকেই দারুণ পরিচিতি পাচ্ছে।
এখন শিশু জন্মানোর পর হাসপাতাল থেকেই শুরু হয়ে যাচ্ছে ভ্লগিং। নতুন মায়েরা শিশুর ন্যাপি বদলানো থেকে তাকে খাওয়ানো, তার স্নান থেকে তার জন্য কেনা জিনিসপত্র— সবটাই ক্যামেরবন্দি করছেন। হাজার হাজার লোক সেই ভিডিয়ো দেখছেন, রকমারি মন্তব্যও করছেন। শিশু খানিকটা বড় হলে আবার সে কী ভাবে দিনযাপন করছে, তার টুকরো টুকরো মুহূর্তও ছড়িয়ে পড়ছে মোবাইলে মোবাইলে। শিশুদের নিয়ে তৈরি মা-বাবাদের একের পর এক পোস্টে বাড়ছে লাইক, ভিউ, ফলোয়ার, সাবস্ক্রাইবার। ভালমন্দ কমেন্টের ছড়াছড়ি। রাতারাতি শিশুরা হয়ে উঠছে ডিজিটাল ক্রিয়েটর, ইউটিউবার। শিশুদের এই সব রিল, ভিডিয়ো থেকে বাবা-মায়ের কাছে খুলে যাচ্ছে উপার্জনের একাধিক রাস্তা। সমস্যার সূত্রপাত সেখানেই।
কেন চিন্তাভাবনা জরুরি?
শিশুশ্রম আইনত অপরাধ। তবে বাবা-মায়েরা যখন শিশুকে এ ভাবে সমাজমাধ্যমে বিক্রি করছেন, সে ক্ষেত্রে ব্যবস্থা কে নেবে? অজান্তেই শিশুর বড় ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে না তো? অনেক ক্ষেত্রেই সন্তানের প্রতি মা-বাবাদের এই মানসিকতার পিছনে কাজ করে নিজেদের জীবনের অধরা সাফল্য, নিরাপত্তাহীনতা এবং অনিয়ন্ত্রিত চাহিদা। আবার অনেক অভিভাবক হয়তো অর্থ উপার্জনের তাগিদে নয়, মজার ছলেই সমাজমাধ্যমে ছোট্ট শিশুর নানা মুহূর্ত সকলের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছেন। চিকিৎসকদের মতে, এ ক্ষেত্রে কিন্তু অভিভাবকদের আর একটু বেশি সতর্ক হওয়া উচিত। মনোসমাজকর্মী মোহিত রণদীপ বলেন, ‘‘এখন ভার্চুয়াল জগতে কে কত গুরুত্ব পাচ্ছে, তার উপর নির্ভর করেই মানুষ নিজেদের মূল্যায়ন করতে শুরু করেছে। শিশুদের ক্ষেত্রেও একই বিষয় হচ্ছে, তারা যখন একটু বুঝতে শিখছে, তখন তার ভিডিয়ো কত লাইক, ভিউ পাচ্ছে, পরিচিতি পাচ্ছে, তা দেখে তারাও নিজেদের মূল্যায়ন করছে। সমাজমাধ্যম দেখে কখনও তারা আনন্দ পাচ্ছে, কখনও আবার হতাশও হয়ে পড়ছে। এই ভিডিয়ো বানানোর অভ্যাসের কারণে তাদের সামাজিক মেলামেশার জায়গাটি ভীষণ ভাবে অবহেলিত হচ্ছে। প্রভাব পড়ছে তাদের খেলাধুলা, পড়াশোনার ক্ষেত্রেও।’’
সমাজমাধ্যমে ভিডিয়ো বানানো যখন আসক্তিতে পরিণত হচ্ছে, তখনই সমস্যা আরও বাড়ছে। সমাজমাধ্যমে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মুখোশের আড়ালে ছড়িয়ে রয়েছে অপরাধীরাও। খুদের ব্যক্তিগত তথ্য, যেমন সে কোথায় থাকে, কোন স্কুলে পড়ে, কখন কোথায় যায়— সব কিছু সমাজমাধ্যমে জানিয়ে অভিভাবকেরা নিজেদের বিপদ নিজেরাই ডেকে আনছেন।
শিশুদের নিয়ে ভ্লগিং বা রিল বানানোয় তাদের ঠিক কতটা ক্ষতি হচ্ছে?
রোজের ভ্লগিংয়ে শিশুদের না জড়ানোর পরামর্শই দিচ্ছেন শিশুরোগ চিকিৎসক অর্পণ সাহা। অর্পণ বলেন, ‘‘একটা ভিডিয়ো শুট করতে গিয়ে বার বার রিটেক, কখনও শিশুদের হাসতে বলা হচ্ছে কখনও আবার কান্নার অভিনয় করতে বলা হচ্ছে তাদের। রিলের দুনিয়ায় হারিয়ে গিয়ে তারা বাস্তব দুনিয়ায় বাঁচতে ভুলে যাচ্ছে। এতে কিন্তু তাদের মানসিক বিকাশে ব্যাপক প্রভাব পড়ছে।’’
শিশুর রোজের জীবনে ভ্লগিং কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, জানালেন অর্পণ।
১) সমাজমাধ্যমের জন্য ভিডিয়ো বা রিল বানানোর অভ্যাস কিন্তু কিছু পরিস্থিতিতে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে। সারা ক্ষণ ফোন বা ক্যমেরার সামনে থেকে থেকে তারা বাস্তব জগৎ থেকে অনেকটাই দূরে চলে যাচ্ছে। ভার্চুয়াল জগতকেই বাস্তব মনে করছে তারা। ক্যামেরা বা মোবাইলের বাইরের জগৎ ভুলতে বসছে এমন খুদেরা। এর ফলে তারা কোনও একটি বিষয়ে বেশি ক্ষণ মনোযোগ দিতে পারছে না, অল্পেই ধৈর্য হারাচ্ছে। একটা সময় তাদের একাকীত্ব গ্রাস করছে।
২) সারা ক্ষণ রিল, ভিডিয়ো বানাতে গিয়ে শিশুদের মধ্যে ‘পারফর্মিং চাইল্ড সিন্ড্রোম’ দেখা যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে খুদে শিখছে, ক্যামরা দেখলেই তার সামনে নাচ, গান, অভিনয়, হাসির মতো নানা রকম অঙ্গভঙ্গি করতে হবে। তাদের কী ভাল লাগছে, সেটাকে গুরুত্ব না দিয়ে তারা অন্যকে খুশি করাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
৩) ভিডিয়ো, রিল বানানোর জন্য শিশুদের সঙ্গে বাবা-মায়েদের ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলি হারিয়ে যাচ্ছে। বাবা-মায়েদের সঙ্গে শিশুদের বন্ডিংয়ের জায়গায় ঢুকে পড়ছে কন্টেট ক্রিয়েশন। শিশুর স্বাভাবিক আচরণগুলি বদলে যাচ্ছে ক্যামেরা দেখেই।
৪) সমাজমাধ্যমে প্রশংসা পাওয়া অভ্যেস হয়ে গেলে, পরবর্তীকালে প্রতি পদক্ষেপে অন্য লোকে তার বিষয় কী ভাবছে, সেই বিষয়টি নিয়ে তারা সচেতন হয়ে পড়বে। এর ফলে তাদের আত্মবিশ্বাসের অভাব হতে পারে। অনেক সময় শিশুর মনে নিজেকে সেরা প্রমাণ করার অবিরাম লড়াই চলতে থাকে। ব্যর্থতা তারা মেনে নিতে পারে না।
৫) শিশু যখন ছোট, তখন রিল তৈরির আগে বাবা-মায়েদের অনুমতি নেওয়ার প্রশ্ন নেই। তবে শিশু বড় হলে অনেক সময়েই তারা ক্যামেরার সামনে নিজেকে মেলে ধরতে আগ্রহী হয় না। উপার্জিত অর্থ, লাইক, বাড়তি পরিচিতি পেয়ে অভিভাবকেরা খুশি হন বটে, তবে শিশু কিন্তু নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে।
বাবা-মায়েরা কী ভাবে সতর্ক হবেন?
চিকিৎসকদের মতে, বাবা-মায়েরা অল্পস্বল্প ভ্লগ করতেই পারেন, তবে খুদের শৈশবকে কন্টেন্টে পরিণত করা কখনওই উচিত নয়। শিশুদের জন্য এমনিতেই স্ক্রিন টাইম বেশি হওয়া উচিত নয়। তাই নিজেরা যত খুশি ভ্লগ করুন, রিল বানান, তবে সব বিষয়ে শিশুকে না জড়ানোই ভাল। ভ্লগিং বা রিলের ক্ষেত্রে শিশুর মতামত, ইচ্ছাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। শিশুদের নিয়ে ভিডিয়ো, রিল বানানের ক্ষেত্রে ‘মাইন্ডফুল ভ্লগিং’ করতে হবে।
খুদেকে সুরক্ষিত রাখতে, তাদের শৈশবকে আগলে রাখতে সমাজমাধ্যমে কতটা পোস্ট করা যায়, কতটা যায় না, সেটা অভিভাবককে বোঝানো ভীষণ জরুরি। ভার্চুয়াল জগতে নয়, সন্তানকে বাস্তব জীবনে সফল করার দিকে নিয়ে যান। সমাজমাধ্যমের পরিচিতি খুবই সাময়িক বিষয়। আজ আছে, কাল নেই। তাই সাময়িক পরিচিতি আর উপার্জনের আশায় খুদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করার কোনও মানে হয় না।