গোপন কথা চেপে রাখতে কষ্ট হয়? ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত।
এমন কোনও কথা আপনার কানে এল, যা সকলকে বলা যাবে না। কিংবা কাউকেই বলা যাবে না। আপনি প্রতিশ্রুতিও দিলেন। বন্ধু বা আত্মীয় বা সহকর্মীকে জোর গলায় বললেন, ‘‘না না, কাক-পক্ষীতেও টের পাবে না। কেউ জানবে না।’’ কিন্তু কথাটা কান থেকে পেট পর্যন্ত পৌঁছোতে পৌঁছোতেই পেট গুড়গুড় শুরু হয়ে গেল। কথাটা এমনই আকর্ষণীয় যে, কাউকে না বলে শান্তি পাচ্ছেন না। অস্বস্তি তুঙ্গে। নাহ্, আর চেপে রাখা গেল না! অন্য এক ব্যক্তিকে ঠিক সেই কথাটাই বলে ফেললেন। তাঁর কাছ থেকে এ বার আপনিই প্রতিশ্রুতি নিলেন, যেন তিনি কাউকে না বলেন।
এই গোটা ছবি সকলেরই কমবেশি চেনা।
ভার লাঘব করতেই অনেকে গোপন কথা বলে ফেলেন। ছবি: সংগৃহীত
মনে কোনও কথা চেপে রাখা— শুনতে সহজ লাগলেও, বাস্তবে তা অনেকের পক্ষেই কঠিন। কখনও কখনও এমন হয়, গোপন কথা মনে চাপ ফেলতে থাকে, কাউকে বলার পর হালকা লাগে। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই ব্যক্তির সম্পর্কে তাঁর চারপাশের মানুষ সচেতন হয়ে যান। তাঁকে কোনও গোপন কথা বলার আগে বন্ধুরা ১০ বার ভাবেন। কিন্তু কখনও ভেবে দেখেছেন, কথা চেপে রাখার যন্ত্রণা কেন হয়? মনোবিজ্ঞান বলছে, এর পিছনে রয়েছে গভীর কারণ। ব্যাখ্যা করলেন মনোবিদ আত্রেয়ী ভট্টাচার্য।
তাঁর মতে, এই ‘গোপন রাখা’ মানে শুধু চুপ থাকা নয়। এটা মানসিক চাপও তৈরি করে। যেন মনের উপর এক অদৃশ্য বোঝা এসে পড়েছে। গোপনীয়তা রক্ষা আদপেই ভার। একটি দায়িত্ব আরোপিত হয়। যিনি সেই ভারকে বহন করতে পারছেন, তিনি ভরসাযোগ্য হয়ে উঠছেন। আর যিনি বহন করতে পারছেন না, তাঁকে হয়তো আর ভরসা করা যাচ্ছে না। এখানে কথা চেপে রাখাই যেন কোনও যোগ্যতার মাপকাঠি তৈরি হয়ে যাচ্ছে।
কারও কারও ক্ষেত্রে দেখা যায়, গোপন কথাটি প্রকাশ করে দেওয়ার উগ্র বাসনা তৈরি হচ্ছে। মনোবিদের কথায়, ‘‘ধরা যাক, দু’জন প্রেম করছেন। এক জন কথাটি গোপন রাখতে চাইছেন, অন্য জন সেই আনন্দের কথা ভাগ করে নিতে চাইছেন আরও কারও কারও সঙ্গে। কিন্তু একই সঙ্গে সঙ্গীর সম্মান রাখার জন্য তিনি বলছেন না কাউকে। এই যে দুইয়ের ঘাত-প্রতিঘাত, একেই আমরা কগনিটিভ ডিজ়োন্যান্স বলতে পারি। কথাটা প্রকাশ করতে চাই, আবার গোপনও রাখতে চাই। এর মধ্যে যে কোনও একটাই জেতে। ব্যক্তি কথাটি বলে ফেলেন বা চেপে রাখেন। এর ভিত্তিতে সমাজে তাঁর একটা পরিচিতি তৈরি হয়।’’
গোপনীয়তা রক্ষা আদপেই ভার। ছবি: সংগৃহীত
কোনও গোপন বিষয় নিয়ে বার বার ভাবতে ভাবতে দৈনন্দিন কাজও কঠিন মনে হতে শুরু করে। মাথায় ও মনে বাড়তি চাপ পড়ে। মনোবিদ জানাচ্ছেন, এই ঘাত-প্রতিঘাত সামলানো অনেকের কাছেই কঠিন হয়ে ওঠে। সেই ভার লাঘব করতেই অনেকে গোপন কথাটি বলে ফেলেন। তখন গোপনীয়তা রক্ষার থেকেও ভার লাঘবের প্রয়োজনীয়তা বেশি সেখানে। এক দিকে সত্যি বলতে চাওয়া, অন্য দিকে চুপ করে থাকার বাধ্যবাধকতা— এই টানাপড়েন থেকেই আসে উদ্বেগ, অপরাধবোধ আর অস্বস্তি। ফলে মানুষ নিজেকে স্বাভাবিক বা স্বচ্ছ মনে করতে পারেন না। এই কারণেই অনেক সময়ে গোপন কথা বলে ফেললে এক ধরনের স্বস্তি আসে। কারণ, তখন আর নিজেকে আটকে রাখতে হয় না। মনের উপর চাপ কমে, নিজের সঙ্গে নিজের দ্বন্দ্বও কমে যায়।
তবে সব কথা সকলের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়াও ঠিক নয়। হঠাৎ আবেগের বশে বলা কোনও কথা সম্পর্কের ক্ষতি করতে পারে বা নতুন সমস্যার জন্ম দিতে পারে। তাই কোথায়, কাকে, কতটা বলা উচিত, এই বোধও একান্ত গুরুত্বপূর্ণ। গোপন রাখা আর তা প্রকাশ করা, এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্যের প্রয়োজন। মনকে হালকা রাখতে যেমন কাউকে বিশ্বাস করে কথা বলা জরুরি, তেমনই নিজেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য কিছু কথা চেপে রেখে দেওয়াও প্রয়োজন।