বাদল সরকার। ফাইল চিত্র।
খোলা মাঠে নাটক বন্ধ করার জন্য যদি পুলিশ লেলিয়ে দেয় সরকার, তবে নাটক করেই তার জবাব দিতে হবে— এইটা সাব্যস্ত হল। কিন্তু অভিনয়ের দিনই যদি ১৪৪ ধারা জারি হয়, তবে কি তা অমান্য করে নাটক হবে? না কি তৎক্ষণাৎ কাছাকাছি কোথাও সরে যাওয়া হবে? ১৯৭৪ সালের অগস্ট মাসের কলকাতা। ক’দিন আগে ২০ জুলাই কার্জন পার্কে নাটক দেখতে এসে পুলিশের লাঠি খেয়ে মারা গিয়েছেন বাইশ বছরের যুবক প্রবীর দত্ত। বীর সেনের সিল্যুয়েট, বাদল সরকারের শতাব্দী এবং আরও কয়েকটি দল তখন ওই উদ্যানে নিয়মিত অভিনয় করে। বাদল প্রস্তাব দিলেন, এর একমাত্র জবাব হল ওই জায়গাতেই আবার অভিনয় করা। সমবেত ভাবে অভিনয় করা। ১৪৪ ধারা জারি হয়নি শেষ পর্যন্ত। বিজ্ঞাপন-প্রচার ছাড়াই হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়ে দেখেছিলেন ‘মিছিল’ নাটকের সেই ঐতিহাসিক অভিনয়। “আমি খুন হয়েছি। আমি। এই যে এখানে। আমি খুন হয়েছি”— নাটকে খোকার এই সংলাপ সেদিন উচ্চারিত হয়েছিল আক্ষরিক অর্থেই বধ্যভূমিতে দাঁড়িয়ে।
বাদল সরকার। বিশ শতকের পঁচিশতম বছরে জন্মেছিলেন। একুশ শতকের পঁচিশ বছরে একশো বছর পূর্ণ করলেন।
কম বয়সের ঝোঁক
বাদলের বাবা মহেন্দ্রলাল ছিলেন খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত, স্কটিশ চার্চ কলেজের ইতিহাসে প্রথম ভারতীয় অধ্যক্ষ। ছেলের নাম রেখেছিলেন সুধীন্দ্র। ভরা বর্ষায় জন্ম বলে কাকা ডাকতেন ‘বাদল’। কালেদিনে ওই নামটাই রয়ে যায়। সুধীন্দ্র সরকার বললে বাদলকে চট করে চেনা মুশকিল। বাবার চাকরি সূত্রে ছোটবেলা কেটেছিল উত্তর কলকাতায়। নাটক পড়তে ভালবাসতেন কম বয়স থেকেই। বাংলার শিক্ষক সরসীকুমার দত্তের প্রেরণায় সপ্তম শ্রেণিতে পড়াকালীন তৃতীয় ইঙ্গ-মরাঠা যুদ্ধকে পটভূমি করে একটা নাটক লিখে ফেললেন। মেজদিদির বই থেকে ডব্লিউ গ্রাহাম ওয়াটসনের লেখা ‘স্লিপার্স অব সিন্ডারেলা’ পড়ে খুব ভাল লেগেছিল। তারই ছায়ায় দ্বিতীয় নাটক দশম শ্রেণিতে। কলেজের পাট চুকিয়ে বাদল শিবপুরে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে ঢুকলেন। বন্ধুদের অনেকেই তখন বামপন্থী রাজনীতিতে, বাদলেরও মনটা সরতে থাকল। জন গলসওয়ার্দির ‘দ্য রুফ’-এর ছায়ায় একটাই নাটক তখন লেখার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সরসীবাবুর কন্যা সুকুমারী (পরে ভট্টাচার্য, বিশিষ্ট সংস্কৃতজ্ঞ লেখক-গবেষক) তার এমন কড়া সমালোচনা করলেন যে আর বছর বারো নাটক লেখার দিকে এগোননি বাদল। তাঁর নিজের কথায়, “আমার বহু রোগ ঐ এক দিনে সুকুমারীদি ছাড়িয়ে দিয়েছিলেন।”
শৌখিন নাট্যচর্চা
১৯৪৭-এ পড়াশোনার পর্ব মিটল। রেজ়াল্ট বেরোনোর আগেই বাদল চাকরি পেয়ে গেলেন নাগপুরে। কিন্তু চার মাসের বেশি মন টিকল না। কলকাতায় ফিরে প্রথমে একটা বেসরকারি কলেজ, তার পর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি। পাশাপাশি চলছে রাজনীতি। যদিও মোহভঙ্গ হতে দেরি হয়নি। ১৯৪৯ সালে বিয়ে করলেন। স্ত্রী সম্পর্কে আত্মীয়া, তায় হিন্দু। ফলে বাড়ির সকলের মুখ ভার। বাদলেরা সংসার পাতলেন এন্টালিতে। দু’টি সন্তানও জন্মাল সেখানেই। যাদবপুর আর এন্টালিতে টুকটাক নাটক করা হচ্ছিল বটে, তবে বাদলের বেশি আগ্রহ অন্য দিকে। বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে নগর পরিকল্পনা তখন উঠে আসছে নতুন চাহিদা নিয়ে। বাদল শিবপুরে ঢুকলেন তাই নিয়ে ডিপ্লোমা পড়তে। ১৯৫৩ সালে নতুন চাকরি মাইথনে। সেখানেও শৌখিন নাটকের দল নিয়ে বছরদুয়েক কাটল। তার পর আবার কলকাতা, পুরসভার চাকরি। তখনই মাথায় ঢুকল, নগর পরিকল্পনায় বিলিতি ডিগ্রি নিয়ে এলে কেমন হয়? অতএব ছুটি নিয়ে বিলেত পাড়ি, সালটা ১৯৫৬।
বিলেতে জন গিলগুড, মাইকেল রেডগ্রেভ, ভিভিয়ান লে, চার্লস লটনের অভিনয় চাক্ষুষ করার অভিজ্ঞতা হল। তবে ওই অবধিই। নাটকে ডুবে থাকার মন তখনও বাদলের নেই। ‘বড়পিসিমা’ নাটকটা অবশ্য লন্ডনেই লেখা। কলকাতায় ফিরে বন্ধুবান্ধবকে পড়ে শোনালেন। সেই সঙ্গে গড়ে উঠল শনিবাসরীয় বৈঠকী, ‘চক্র’। চক্রের আয়োজনেই অভিনয় হল ‘বড়পিসিমা’, ১৯৬০-এ। তার পর ‘সলিউশন এক্স’, ‘শনিবার’ আর ‘থানা থেকে আসছি’। আরও দুটো নাটক বাদলেরা করেন এ সময়ে, ‘রাম শ্যাম যদু’ আর ‘সমাবৃত্ত’। তবে আবার ছেদ পড়ল। কারণ বাদল এ বার ফ্রান্সে গেলেন নগর পরিকল্পনার প্রশিক্ষণ নিতে। প্যারিসে বসে লেখা হল ‘সারা রাত্তির’ আর ‘বল্লভপুরের রূপকথা’। প্যারিস থেকেই নাইজেরিয়ায় চাকরির প্রস্তাব। অতএব ১৯৬৪-তে কিছু দিনের জন্য কলকাতায় ফিরেই বাদল আবার চললেন নাইজেরিয়া।
এবং বহুরূপী
‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ নাটকটা প্রথম পড়া হয় ১৯৬৪-র জুলাই মাসে, অর্থনীতির অধ্যাপক শ্যামল চক্রবর্তীর বাড়িতে। শমীক বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করতে পারেন, শম্ভু মিত্র তখন নতুন নাটক খুঁজছেন। জোরজার করে বাদলের কাছ থেকে পাণ্ডুলিপির কপি জোগাড় করে শমীকই সেটি শম্ভুর কাছে পৌঁছে দেন। বহুরূপী পত্রিকায় নাটকটা ছাপা হয়ে যায়। কিন্তু বহুরূপী নয়, নাটকটা ঝটিতি মঞ্চে নিয়ে আসে শৌভনিক। ছুটিতে এসে বাদল যখন দেখেন, তাঁর খুব ভাল লাগেনি। সে বার বহুরূপীর সঙ্গেই তাঁর সম্পর্ক গাঢ় হল। ‘বাকি ইতিহাস’, ‘সারা রাত্তির’, ‘বাঘ’, ‘রাম শ্যাম যদু’— চারটি নাটকই নিয়ে নিল বহুরূপী। বাদল নাইজেরিয়া ফিরে গিয়ে লিখে ফেললেন ‘পরে কোনদিন’, ‘আর এক বার’, ‘বিবর’ এবং ‘পাগলা ঘোড়া’।
১৯৬৭-তে কলকাতায় আসা গেল। মাথায় তখন নাটক তো আছেই, একটা কিশোর পত্রিকা বার করার কথা ভাবছেন। নতুন চাকরি চাই, সেই চিন্তাও রয়েছে। এই পর্বটায় বহুরূপীতে যোগ দেওয়া এক রকম স্থির করেই ফেলেছিলেন। ‘বাকি ইতিহাস’ তখন করছে বহুরূপী। যদিও নাটকে যে রদবদল করেছিলেন শম্ভু, সেটা বাদলের পছন্দ হয়নি। ইতিমধ্যে শম্ভু কিছু দিন বিদেশে গেলেন। সেই অবসরে ‘প্রলাপ’ নাটকটা বহুরূপীতে করানোর ভার পেলেন বাদল। সেটা করতে করতেই বুঝতে পারলেন, বহুরূপীতে তিনি ঠিক খাপ খাবেন না, নিজের দল করাই ভাল। বহুরূপীর হিমাংশু চট্টোপাধ্যায় বাদলের বন্ধু। তিনি সঙ্গে এলেন। স্ত্রী পুতুল, শ্যালিকা মলিনা এবং আরও কয়েক জন ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধব রইলেন। ভবিষ্যতের নামী নাট্যব্যক্তিত্ব পঙ্কজ মুন্সীও এই সময়েই আসেন। কিশোর পত্রিকার জন্য ভেবে রাখা নামই নাটকের দলের নাম হল— শতাব্দী।
শতাব্দীর গোড়ায়
‘শতাব্দী’র প্রথম প্রযোজনা ‘কবি কাহিনী’। এই পর্যায়ে খুব বেশি চলেনি দলটা। তবে পাঁচ-ছ’জন ছিলেন, যাঁরা হাল ছাড়তে নারাজ। পঙ্কজ তার অন্যতম। ইতিমধ্যে বাদল মুখ্য নগর পরিকল্পকের চাকরি পেয়েছেন এবং সেই চাকরির দু’মাসের মাথাতেই ভারত সরকার তাঁকে সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান কর্মসূচির আওতায় দু’মাসের জন্য রাশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপে পাঠাল। এই যাত্রায় লাভ হল অনেকগুলো। মস্কোয় ইউরি লিউবিমোভের পরিচালনায় দু’টি নাটক এবং একটি মহড়া দেখার সুযোগ হল। বাদলের কথায়, “অনেক কিছু শিখেছি ওর ওই ক’টা থিয়েটার আর রিহার্সাল দেখে। ভিতরে সেঁধিয়ে গেছে সে সব।” তার পর পোল্যান্ডে ইয়ের্জি গ্রোটোস্কির নাটক দেখা এবং কথাবার্তা বলার সুযোগ। গ্রোটোস্কির কতটুকু নেওয়া সম্ভব আর কতটুকু নয়, একটা প্রাথমিক ধারণা তৈরি হল মনে। বাদল পরে লিখেছেন, “গ্রোটোস্কির থেকে শিখেছি অনেক কিছুই, তবু ওঁর থিয়েটারের সঙ্গে স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের থিয়েটারের কোনও মিল নেই।”
কলকাতায় ফিরে বাদল দেখলেন সবাই পার্ট মুখস্থ করে প্রস্তুত, অতএব মঞ্চে এল ‘প্রলাপ’। ছ’টা শোয়ের পরে ধরা হল ‘সারা রাত্তির’ আর ‘শেষ নেই’। ‘বল্লভপুরের রূপকথা’র সময় বাদল ঘোষণা করে দিলেন, একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা যদি না ওঠে তো এই শেষ। ‘বল্লভপুর...’ কিন্তু লেগে গেল। ‘সাগিনা মাহাতো’ আর ‘আবু হোসেন’ও দর্শক টানল। কিন্তু বাদলের মন তত দিনে অন্য ধরনের পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করেছে। বিদেশের অভিজ্ঞতা আর বিশেষ করে ‘থিয়েটার ইন দ্য রাউন্ড’ (স্টিফেন জোসেফ) বইটা পড়ার পর থেকে।
অঙ্গনমঞ্চ-মুক্তমঞ্চ
১৯৭১ সালে বাদল প্রথমে পুরসভার চাকরিটা ছেড়ে দিলেন আর অল্প দিন পরেই নেহরু ফেলোশিপের জন্য মনোনীত হলেন। বাদল সেই ফেলোশিপ প্রোজেক্টের নাম দিলেন ‘আ থিয়েটার অব সিন্থেসিস অ্যাজ় আ রুরাল-আরবান লিঙ্ক’। এটা লিখতে লিখতেই তৃতীয় থিয়েটার সম্পর্কে তাঁর ভাবনা কিছুটা অগোছালো ভাবে রূপ নিতে থাকে। পথনাটক নয়, মঞ্চ আর দর্শকের দূরত্ব ঘুচিয়ে দেওয়া এক অন্য ধারার সেই নাট্য-পরিক্রমার সূত্রপাত— ১৯৭২ সালের ১৮ জুন, এবিটিএ প্রেক্ষাগৃহে ‘সাগিনা মাহাতো’র অভিনয়ে। কিন্তু নতুন রীতির দাবিমাফিক চাই নতুন পরিসর। লেডি রাণু মুখোপাধ্যায়ের সৌজন্যে অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসের তিন তলায় একটা জায়গা ভাড়ায় পাওয়া গেল। ১৯৭২-এর নভেম্বর থেকে ১৯৭৪-এর অগস্ট পর্যন্ত বাদলদের মূল ঠিকানা ছিল এই মঞ্চ। এখানেই আমেরিকান নাট্যপরিচালক রিচার্ড শেখনারের সঙ্গে বাদলের প্রথম সাক্ষাৎ। তার পরে দু’মাসের আমেরিকা সফরে সেই সখ্য আরও গভীর— থার্ড থিয়েটারের ভাবনা পোক্ত হল, ওয়র্কশপ বা কর্মশালার মধ্য দিয়ে নাট্যনির্মাণের রীতি আয়ত্তে এল। অ্যাকাডেমি-পর্বে অঙ্গনমঞ্চে অভিনীত হয়— ‘সাগিনা মাহাতো’, ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’, ‘স্পার্টাকুস’, ‘আবু হোসেন’, ‘প্রস্তাব’, ‘মুক্তমেলা’, ‘মিছিল ও ত্রিংশ শতাব্দী’। ‘স্পার্টাকুস’ই প্রথম নাটক, যা বাদল অঙ্গনমঞ্চের কথা ভেবে লেখেন। ‘স্পার্টাকুস’ই কার্জন পার্কে শতাব্দীর প্রথম অভিনয়ের জন্য বেছে নেওয়া হয়।
বীর সেনের সিল্যুয়েট কার্জন পার্কে অভিনয় করছিল ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর থেকে। তাদেরই ডাকে ১৯৭৩-এর মার্চে বাদল করলেন ‘স্পার্টাকুস’। দর্শক সমাগম এতটাই ভাল হল যে, পরের বছর বাদলরা অ্যাকাডেমি ছেড়ে আকাশের ঠিকানাতেই সরে এলেন। কখনও কার্জন পার্ক, কখনও অ্যাকাডেমির উল্টো দিকের মাঠ, কখনও অন্যত্র। কিন্তু জরুরি অবস্থার সময়টায় মাঠে-ময়দানে নাটক করা মুশকিল হয়ে যায়। ফলে ১৯৭৬ থেকে ঠাঁই প্রথমে প্রজ্ঞানানন্দ ভবনে, তার পর বেঙ্গল থিয়োজ়ফিকাল সোসাইটির ঘরে। কিছু দিনের মধ্যেই অবশ্য রাজ্যে বামফ্রন্ট সরকার এসে গেল। সেই সময়ে বাদলেরা সিন্ধি ইউথ অ্যাসোসিয়েশনে অভিনয় করেছেন ১৯৮০ থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত। থিয়োজ়ফিকাল সোসাইটিতে ১৯৮৫-৮৬। একটা সময় ঠিক করেছিলেন শহরে আমন্ত্রিত শো ছাড়া করবেনই না। কিন্তু কখনও কার্জন পার্কে, কখনও রবীন্দ্র সদন চত্বরে, কখনও শিয়ালদহ লোরেটো স্কুলে— শতাব্দীর পদযাত্রা খুব থেমে থাকেনি।
তৃতীয়ের রাজনীতি
১৯৭৪-এর ‘মিছিল’ নাটক থেকে বাদলের নাট্যনির্মাণে রাজনৈতিক উচ্চারণ একটা অভিমুখ পেতে থাকে। ‘মিছিল’, ‘ভোমা’, ‘বাসি খবর’, ‘সুখপাঠ্য ভারতের ইতিহাস’, ‘মানুষে মানুষে’, ‘খাট মাট ক্রিং’ ইত্যাদি এই গোত্রে পড়ে। বাদলের সহযোগী বিশাখা রায়ের বড় অবদান এর পিছনে ছিল। বিশাখা নিজে নকশালপন্থী রাজনৈতিক কর্মী। পুলিশের চোখ এড়িয়ে কলকাতায় পালিয়ে এসেছিলেন। সেখানেই বাদলের সঙ্গে বন্ধুত্ব। প্রথমা স্ত্রীর মৃত্যুর পরে বিশাখাকে বিয়ে করেন বাদল। বিশাখা লিখেছেন, “থিয়েটার আন্দোলন গড়ে তুলতে একটা সক্রিয় মতাদর্শগত অবস্থান নেবার প্রয়োজন হয়। সত্তরের দশক আমাদের সামনে এক নতুন আবহ টেনে নামায়। নকশালবাড়ি আন্দোলন, আত্মত্যাগ, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ব্যক্তি বাদল সরকারের সামনে এক উত্তাল সময়ের পৃষ্ঠা মেলে ধরে।” শুধু প্রসেনিয়ামের বেড়া ভেঙে কী হবে, যদি না নাটককে গ্রামাঞ্চলে নিয়ে যাওয়া গেল, শহরের নিচুতলায় পৌঁছে দেওয়া গেল— এই প্রশ্নটা বড় হয়ে ওঠে। সেই তাগিদেই ‘মিছিল’-এর প্রথম অভিনয় উত্তর ২৪ পরগনার রামচন্দ্রপুর গ্রামে। ওই বছরই ‘কম্প্রিহেনসিভ এরিয়া ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনে’ বাদলের নতুন চাকরি হয়েছে। গ্রামেগঞ্জে ঘোরার সুযোগ বেড়েছে অনেকখানি। ‘ভোমা’-র প্রথম অভিনয় সুন্দরবনের রাঙাবেলিয়ায়।
থার্ড থিয়েটার সম্পর্কে বাদলের ভাবনা চুম্বকে কতকটা এই রকম— “...বর্তমান অবস্থার পরিবর্তনের তাগিদে তৃতীয় থিয়েটারের জন্ম, সুতরাং স্বভাবতই এই থিয়েটারের উৎস— ‘কী বলতে চাইছি’...। তার থেকে আসছে— ‘কাকে বলতে চাইছি’, এবং এই দুটি থেকে আসছে ‘কীভাবে বলব’।...তৃতীয় থিয়েটারে কেনাবেচা নেই, সুতরাং তৃতীয় থিয়েটার ‘ফ্রী’। ফ্রী দু’টি অর্থেই। প্রথম অর্থ— কোনো নির্দিষ্ট অঙ্কের মূল্য এ থিয়েটারে প্রবেশের শর্ত নয়।...দ্বিতীয় অর্থ— মুক্ত। টাকার উপর নির্ভরশীলতা থেকে মুক্ত, এবং সেই কারণে আরো অনেক ক্ষেত্রে মুক্ত।”
সত্তরের দশক থেকেই থার্ড থিয়েটারের আরও বহু দল গড়ে উঠতে থাকে। ১৯৮৬ সালে বাদলরা যখন গ্রাম পরিক্রমা করেন, তাঁদের সঙ্গে যোগ দেয়— পথসেনা, ঋতম, হালিশহর সাংস্কৃতিক সংস্থা, এরিনা থিয়েটার গ্রুপ, তীরন্দাজ, পিপলস আর্ট থিয়েটার অশোকনগর এবং ঠাকুরনগর সাংস্কৃতিক পরিষদ। আজও আনন (সিউড়ি), ঋতম (মধ্যমগ্রাম), পথসেনা (কাঁচরাপাড়া), আয়না (কলকাতা), অল্টারনেটিভ লিভিং থিয়েটার (খড়দহ), ব্রীহি (বহরমপুর) এবং আরও অনেকে এই প্রকরণে নাটক করে যাচ্ছে। রাজ্যের বাইরে দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরু, পুণে, প্রয়াগরাজ, রাঁচী, নাগপুর, আমদাবাদ, ভুবনেশ্বর, গুয়াহাটি এবং আরও অন্যত্র থার্ড থিয়েটারের চর্চা চলছে।
ভারতের মঞ্চে
বাদলের লেখা নাটক অভিনীত হয়েছে, আজও হচ্ছে নানা শহরে, নানা ভাষায়। দেশে, দেশের বাইরেও। বাদল প্রসেনিয়াম ছাড়লেও প্রসেনিয়াম কিন্তু বাদলকে ছাড়েনি। বাংলার বাইরে তাঁর পরিচিতির সূত্রপাত ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ থেকেই। শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতিতে আছে, শৌভনিক যখন নাটকটা করছে, সে সময় কলকাতায় এসেছেন গিরিশ কারনাড, মোহন রাকেশরা। ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ ওঁদের এত ভাল লেগে গেল যে, তৎক্ষণাৎ প্রতিভা আগরওয়ালের সঙ্গে যোগাযোগ করে নাটকটা হিন্দিতে অনুবাদ করার সিদ্ধান্ত হল। তার পর সত্যদেব দুবে হিন্দিতে (মুম্বই), অরবিন্দ দেশপাণ্ডে মরাঠিতে, গিরিশ কারনাড ও বিভি করন্থ কন্নড়ে, রাজিন্দর নাথ হিন্দিতে (দিল্লি) নাটকটা করলেন। সেই শুরু। ভারতের প্রথম সারির নাট্যপরিচালক যাঁরা বাদলের নাটক করেছেন, তার মধ্যে আছেন— সত্যদেব দুবে (‘এবং ইন্দ্রজিৎ’, ‘পাগলা ঘোড়া’, ‘বল্লভপুরের রূপকথা’), গিরিশ কারনাড, বিভি করন্থ ও রোহিণী হাত্তাঙ্গাড়ি (‘এবং ইন্দ্রজিৎ’), এমকে রায়না (‘এবং ইন্দ্রজিৎ’, ‘মিছিল’, ‘স্পার্টাকুস’), অমল পালেকর (‘বল্লভপুরের রূপকথা’, ‘মিছিল’, ‘পাগলা ঘোড়া’), অমরীশ পুরী (‘সারা রাত্তির’), রামগোপাল বজাজ (‘শেষ নেই’), ইব্রাহিম আলকাজি (‘ত্রিংশ শতাব্দী’), শ্যামানন্দ জালান (‘এবং ইন্দ্রজিৎ’, ‘পাগলা ঘোড়া’)। এর মধ্যে অমরীশ পুরী মুম্বইয়ে ‘পাগলা ঘোড়া’ আর ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’-এ অভিনয় করেছেন একাধিক বার। ‘বল্লভপুর...’-এর মরাঠি সংস্করণ দিয়েই অমল পালেকরের নাট্যপরিচালনা শুরু।
সিনেমায় বাদল
পঞ্চাশের দশক থেকেই বাদলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন বারীন সাহা। ১৯৫৯ সালে তৈরি তাঁর ছবি ‘তেরো নদীর পারে’ মুক্তি পায়নি দীর্ঘ দিন। ষাটের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে সুযোগ এল ছবিটা বাণিজ্যিক ভাবে রিলিজ করানোর। কিন্তু দৈর্ঘ্য কম, তাই ঠিক হল একটা ছোট ছবির সঙ্গে দেওয়া হবে। বাদলের ‘শনিবার’ নাটকটা বেছে নিলেন বারীন। মূল চরিত্রে দিব্যেন্দুর ভূমিকায় অভিনয়ের দায়িত্ব পড়ল বাদলেরই। মায়ের ভূমিকায় বাদলের স্ত্রী পুতুল। টেকনিশিয়ানস স্টুডিয়োয় চার দিনের শুটিংয়ে তৈরি হল সেই ছবি। এর পর ‘বল্লভপুরের রূপকথা’ অবলম্বনে হিন্দি ছবির কাজ অনেকটাই সেরে ফেলেন বাসু ভট্টাচার্য। কিন্তু সে ছবি আলো দেখেনি। ‘সারা রাত্তির’ থেকে অপর্ণা সেনের ছবি হিন্দিতে যখন হল, তখন বাদল প্রয়াত। তবে অপর্ণার পরিচালনায় ‘ক্যালকাটা আনডাইং সিটি’ টিভি সিরিজ়ে অভিনয় করেছিলেন বাদল। এ ছাড়া অমিতাভ চক্রবর্তীর ‘কাল অভিরতি’ ছবিতেও অভিনয় করেন। বাংলায় ২০২২ সালে খুবই জনপ্রিয় হয় অনির্বাণ ভট্টাচার্য পরিচালিত ‘বল্লভপুরের রূপকথা’। বর্তমানে ‘পাগলা ঘোড়া’ অবলম্বনে ছবি করছেন শেখর দাস। এ ছাড়া বড়-ছোট পর্দা মিলিয়ে হিন্দিতে ‘বাকি ইতিহাস’, ‘পাগলা ঘোড়া’, ‘বল্লভপুরের রূপকথা’ দেখার সুযোগ পেয়েছেন দর্শক।
বুড়ো শতাব্দী আজও
নব্বইয়ের দশক থেকে থার্ড থিয়েটার অনেকাংশে গতি হারায়। জীবনের টানাপড়েন, দলীয় সমস্যা ইত্যাদি তো ছিলই। সময়টাও বাঁক নিচ্ছিল অন্য দিকে। বাদলও কিছু দিন ধরেই বলছিলেন, নিয়মিত অভিনয়ের চেয়ে ঘুরে ঘুরে কর্মশালা করাতেই বেশি ভাল লাগছে। এরই মধ্যে ৬৪ বছর বয়সে যাদবপুরে তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে পড়তে ঢুকলেন। ক্লাসরুমে এক প্রবীণকে আবিষ্কার করে ছাত্রছাত্রীরা বেজায় অবাক। তার পর অবশ্য সহজ হয়ে এল অনেকটাই। নবনীতা দেবসেন আর শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়ের পড়ানো সবচেয়ে ভাল লেগেছিল বলে লিখেছেন নিজেই।
২০১১ সালের ১৩ মে। ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনের অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গে জিতল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল। ওই দিনই বাদলের প্রয়াণ। তবে তাঁর শতাব্দী মরেনি। মরেনি থার্ড থিয়েটারও।
তথ্যসূত্র:
বাদল সরকার: এবং ইন্দ্রজিৎ থেকে থার্ড থিয়েটার শমীক বন্দ্যোপাধ্যায় (সম্পা.)
পুরোনো কাসুন্দি বাদল সরকার
নাট্যচিন্তা থার্ড থিয়েটার বাদল সরকার
থার্ড থিয়েটার: অন্য স্বর, অন্য নির্মাণ বিশাখা রায়
বাদল সরকার ও থার্ড থিয়েটার দলের ইতিহাস শুভঙ্কর দে
বাদল সরকার: সার্চ ফর আ ল্যাঙ্গুয়েজ অব থিয়েটার কীর্তি জৈন (সম্পা.)
শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে প্রতিবেদকের সাক্ষাৎকার